মহেশখালীর বিস্তীর্ণ দিগন্ত এখন যেন এক সোনালি ক্যানভাস। হেমন্তের মৃদু হাওয়ায় দুলতে থাকা ধানের শীষ জানান দিচ্ছে নবান্নের আগমনী বার্তা। মহেশখালীর শাপলাপুর থেকে কালারমারছড়া, মাতারবাড়ী—সবখানেই এখন পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ। মাঠভরা এই সোনালি ফসল কৃষকের মনে জাগিয়েছে নতুন আশার আলো, একই সঙ্গে হৃদয়ের কোণে উঁকি দিচ্ছে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা আর বাজারদরের পুরনো শঙ্কা।
মহেশখালী উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা মিলিয়ে প্রায় ৮ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে এবার আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রকৃতি অনুকূলে থাকায় কৃষকের মুখে ফুটে উঠেছে হাসি। রোদেলা দিনে ধান কাটা, মাড়াই আর শুকানোর ধুম পড়েছে প্রতিটি গৃহস্থের উঠোনে। আবহাওয়া স্থিতিশীল থাকলে ফলন আরও বাড়বে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঐতিহ্যের নবান্ন ও বদলে যাওয়া দৃশ্যপট
গ্রামবাংলায় নতুন ধান মানেই নবান্নের উৎসব। কৃষকের ঘরে ঘরে শুরু হয় পিঠা-পুলির আয়োজন। নতুন চালের পায়েস, ধপধপে সাদা ভাপা পিঠা কিংবা চিতইয়ের গন্ধে মুখর হয়ে ওঠে জনপদ। কিন্তু মহেশখালীর প্রবীণ কৃষকদের কণ্ঠে এই উৎসব নিয়ে কিছুটা আক্ষেপের সুর শোনা গেল।

শাপলাপুরের কৃষক আমান উল্লাহ অতীতের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আগে গ্রামে নবান্ন উৎসব হতো দলবেঁধে, সবার অংশগ্রহণে। এখন অনেকেই শহরের বাসিন্দা হওয়ায় সেই সমবেত আনন্দ আর দেখা যায় না। নতুন ধানের খাবার তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও আগের সেই প্রাণের টান যেন হারিয়ে গেছে।
একই সুর ধ্বনিত হলো কালারমারছড়ার কৃষক হারুন অর রশীদ-এর কণ্ঠেও। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ফলন ভালো হলেও উৎসবের আনন্দ এখন কেবলই স্মৃতির মতো। নতুন প্রজন্ম নবান্নের আসল রূপই চেনে না, তারা এই মাটির গন্ধ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা ও পরিসংখ্যান
মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সহায়তা দিতে তৎপর রয়েছে কৃষি বিভাগ। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা **মো. আব্দুল গফ্ফার** জানান, এই মৌসুমে দেড় হাজার কৃষককে বীজ ও সার প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর আমনের লক্ষ্যমাত্রা ২৬ হাজার ৫৬৮ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। গত বছর আমনের লক্ষ্যমাত্রা ২৫ হাজার ৬৮০ মেট্রিক টন থাকলেও বছরজুড়ে ঘাটতি পূরণ হয়েছিল ২৪ হাজার ৩১৫ মেট্রিক টন।
এবার বিআর-১০, ১১, ২২, ২৩, ধানী গোল্ড এবং বিনাধান ১১–২৩ সহ বিভিন্ন হাইব্রিড ও উফশী জাতের ধানের আবাদ হয়েছে, যা কৃষকদের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে।

আবহাওয়ার চোখরাঙানি ও বাজারদরের শঙ্কা
উৎসবের এই আমেজের মধ্যেই কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা। আবহাওয়াবিদদের মতে, সাগরপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। নভেম্বরে কক্সবাজার অঞ্চলের তাপমাত্রা সহনীয় থাকলেও রাতের আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় ধান শুকাতে বেগ পেতে হতে পারে, যা ফসলের গুণগত মানে প্রভাব ফেলার ঝুঁকি তৈরি করে।
অন্যদিকে, বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের আসল পরীক্ষা শুরু হয় ফসল ঘরে তোলার পর। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ভালো ফলনই যথেষ্ট নয়, বাজারমূল্য স্থিতিশীল না থাকলে লাভের বদলে লোকসানের ঝুঁকি থাকে। সংরক্ষণ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় পাকা ধানের ক্ষতির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই কৃষকদের এখন একটাই দাবি—ধান সংরক্ষণের আধুনিক সুবিধা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন।
মাঠের সোনালি ধান কেটে ঘরে তোলার এই ব্যস্ত সময়ে কৃষকের প্রত্যাশা, তাদের শ্রমের ঘাম যেন সঠিক মূল্যে মূল্যায়িত হয়। উৎসবের রঙ ফিকে হওয়ার আগেই যেন নবান্নের প্রকৃত খুশি ছুঁয়ে যায় প্রতিটি কৃষকের ঘর।