শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

বিএনপির ‘গৃহদাহে’ সুবিধায় জামায়াত

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:৫৪ অপরাহ্ন

bnp jamaat
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে বিএনপির দুর্গ পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন এখন চরম অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির মনোনয়ন পাওয়াকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনে প্রকাশ্য বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে। কোথাও সড়ক অবরোধ, কোথাও মশাল মিছিল, আবার কোথাও কেন্দ্রের কাছে গণস্বাক্ষর দিয়ে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানানো হচ্ছে। বিএনপির এই ছন্নছাড়া অবস্থার বিপরীতে সুসংহত সাংগঠনিক শক্তি ও একক প্রার্থী নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মাঠ ফাঁকা থাকলেও নিজেদের বিবাদ না মেটাতে পারলে বড় মাসুল দিতে হতে পারে বিএনপিকে।

চট্টগ্রামের উত্তর প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসনটি একসময় বিএনপির শক্ত ঘাঁটি ছিল। তবে আসন্ন নির্বাচনে এই আসনটি পুনরুদ্ধারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। এখানে ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়েছেন উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল আমিন। কিন্তু তার মনোনয়ন মেনে নিতে পারেননি দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। নুরুল আমিনের মনোনয়ন পরিবর্তন চেয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে লিখিত চিঠি দিয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও ১১ জন জ্যেষ্ঠ নেতা।

মনোনয়নবঞ্চিত ও ক্ষুব্ধ নেতাদের অভিযোগ, অতীতে বহিষ্কৃত এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়ায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা হতাশ। উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক শাহীদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দল তিনটি কমিটি দিয়ে তদন্ত করে যাকে বহিষ্কার করেছিল, তাকেই আবার প্রার্থী করা হয়েছে। এতে জনগণের কাছে ভোট চাইতে গিয়ে আমরা প্রশ্নের মুখে পড়ব।

অন্যদিকে বিএনপির এই বিভক্তিকে কাজে লাগিয়ে জয়ের বন্দরে পৌঁছাতে চায় জামায়াতে ইসলামী। প্রায় এক বছর ধরে এখানে এককভাবে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন জামায়াতের প্রার্থী, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমান। বিএনপির কোন্দলে দলটির ভোটব্যাংকে ধস নেমেছে দাবি করে সাইফুর রহমান বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে বিএনপির দলীয় কোন্দলে এখানে ১২টি খুন হয়েছে। মানুষ এখন হানাহানি চায় না, তাই তারা জামায়াতকেই বেছে নেবে।

চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনেও বিএনপির চিত্র ভিন্ন নয়। এখানে ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়েছেন উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সরওয়ার আলমগীর। কিন্তু তার নাম ঘোষণার পরপরই ফুঁসে উঠেছেন অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। বিশেষ করে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. আজিম উল্লাহ বাহারের অনুসারীরা প্রকাশ্যে মশাল মিছিল করে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। স্থানীয় বিএনপি বর্তমানে চারটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

বিএনপি প্রার্থী সরওয়ার আলমগীর দাবি করেছেন, মশাল মিছিলটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং দলের সবাই ঐক্যবদ্ধ আছেন। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বিএনপির এই নড়বড়ে অবস্থার বিপরীতে ফটিকছড়িতেও জামায়াতে ইসলামী বেশ শক্তিশালী অবস্থানে। এখানে জামায়াতের প্রার্থী চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সেক্রেটারি নুরুল আমিন।

ফটিকছড়ির রাজনীতিতে হেফাজতে ইসলামের প্রভাব বা ‘কওমি ভোটব্যাংক’ জয়-পরাজয়ের বড় নিয়ামক। হেফাজতের বর্তমান আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর মাদ্রাসা ও তাদের বিশাল সমর্থন এখানে ফ্যাক্টর। বিএনপি প্রার্থী সরওয়ার আলমগীর হেফাজতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করলেও জামায়াত প্রার্থী নুরুল আমিন মনে করেন, আকীদাগত পার্থক্য থাকলেও ভোটের মাঠে হেফাজতের সমর্থন তাদের দিকেই থাকবে।

মনোনয়ন নিয়ে সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে। এখানে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য ও লোহাগাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক নাজমুল মোস্তফা আমিনকে। এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মজিবুর রহমানকে প্রার্থী করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছেন তার অনুসারীরা।

সাম্প্রতিক সময়ে সাতকানিয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক একাধিকবার অবরোধ করে মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ করেন মজিবুর রহমানের সমর্থকেরা। এই অবরোধে মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়, যা পরে পুলিশি হস্তক্ষেপে স্বাভাবিক হয়। বিদ্রোহী প্রার্থী মজিবুর রহমান বলেন, নেতাকর্মীরা মনে করছেন সব দিক বিবেচনায় আমিই যোগ্য। তাই তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তবে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারা দেশেই বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে তোলপাড় চলছে। বেশ কিছু আসনে বিএনপির হেভিওয়েট নেতারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। দলের হাইকমান্ড আশঙ্কা করছে, অন্তত অর্ধশত আসনে এমন বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়িয়ে যেতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করলে বহিষ্কারের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে দল। একক প্রার্থীর বিষয়টি নিশ্চিত করতে শীঘ্রই কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হবে।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৮ দলীয় জোট ‘ওয়ান বক্স পলিসি’ বা একক প্রার্থীর কৌশলে এগোচ্ছে। তারা ৩০০ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করলেও জোটের স্বার্থে বড় ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখাচ্ছে, যা বিএনপির জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।

বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম অবশ্য আশাবাদী। তিনি বলেন, বড় দল হিসেবে অনেক যোগ্য লোক প্রার্থী হতে চেয়েছেন, তাই প্রতিযোগিতা আছে। তবে নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসবে, বিভাজন ততই কমে আসবে। শেষ পর্যন্ত ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করতে সবাই এক হয়েই কাজ করবে।