
সবুজে ঘেরা অরণ্যে এখন নতুন প্রাণের স্পন্দন। মায়ের আঁচল ধরে হাঁটছে জলহস্তীর ছানা, জেব্রা পরিবারে চলছে নতুন সদস্যদের খুনসুটি। নীলগাই আর গয়ালের সংসারেও এখন খুশির ঝিলিক। গত এক বছরে শতাধিক নতুন অতিথির আগমনে কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক যেন ফিরে পেয়েছে তার হারানো জৌলুস। একদিকে প্রকৃতির কোলে নতুন প্রাণের সঞ্চার, অন্যদিকে নান্দনিক উন্নয়নযজ্ঞ—সব মিলিয়ে এক বদলে যাওয়া সাফারি পার্কের গল্প এখন পর্যটকদের মুখে মুখে।
পার্কের নীরবতা ভেঙে গত বারো মাসে শতাধিক প্রাণীর সংসারে এসেছে নতুন অতিথি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে জেব্রা, জলহস্তী ও নীলগাই পরিবার। পার্ক কর্তৃপক্ষ জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুকূল পরিবেশ আর নিবিড় পরিচর্যার ফলেই এই অভাবনীয় সাফল্য এসেছে।
পার্কের বিশাল বেষ্টনীতে আগে থেকেই ছিল ৬টি জেব্রা, নতুন করে জন্ম নিয়েছে আরও দুটি। এখন আট সদস্যের জেব্রা পরিবারে আনন্দের কমতি নেই। একইভাবে ১০টি জলহস্তীর পরিবারে যুক্ত হয়েছে নতুন এক সদস্য। তিন মাস বয়সী ছোট্ট জলহস্তীটি এখন মায়ের সঙ্গে বেষ্টনীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিরল প্রজাতির নীলগাই দম্পতিও উপহার দিয়েছে একটি পুরুষ শাবক, যার বয়স এখন দুই মাস।
তৃণভোজী প্রাণী গয়ালের সংসারেও এসেছে চারটি নতুন শাবক। এছাড়া ওয়াইল্ডবিস্ট পরিবারে দুটি এবং চিত্রা হরিণের পালে যুক্ত হয়েছে ৬টি নতুন অতিথি। বন মোরগ, ময়ূর আর কালিমপাখির ঘরেও এসেছে নতুন প্রাণের বার্তা।
হঠাৎ কেন এই প্রজনন বৃদ্ধি? এর রহস্য জানালেন পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (রেঞ্জ অফিসার) মো. মনজুরুল আলম। তিনি জানান, সন্তানসম্ভবা প্রাণীগুলোকে লোকচক্ষু ও কোলাহল থেকে দূরে রাখাটাই ছিল গেম চেঞ্জার। মাতৃত্বকালীন সময়ে মা প্রাণীদের ‘কোয়ারেন্টাইনে’ রেখে নিবিড় পরিচর্যা করা হয়।

পার্কের ভেটেরিনারি হাসপাতালের সার্জন হাতেম সাজ্জাদ জুলকারনাইন বলেন, “আমরা চেষ্টা করি কোলাহলমুক্ত পরিবেশে মা প্রাণীদের রাখতে। চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক তদারকি আর শান্ত পরিবেশের কারণেই এবার রেকর্ড সংখ্যক প্রাণীর জন্ম হয়েছে।”
নতুন জন্ম নেওয়া প্রাণীদের পাশাপাশি পার্কের জৌলুস বাড়াতে সুদূর আফ্রিকা থেকেও আনা হয়েছে অতিথি। কার্গো বিমানে করে আনা হয়েছে তিনটি রাজকীয় বাঘ। ১৫ থেকে ১৮ মাস বয়সী এই বাঘগুলোকে ২১ দিন কোয়ারেন্টাইনে রাখার পর অবমুক্ত করা হয়েছে। ফলে পার্কে এখন বাঘের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতে।
শুধু প্রাণী বৃদ্ধিই নয়, অবকাঠামোগত উন্নয়নেও বদলে যাচ্ছে পার্কের চেহারা। ১২৬ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের আওতায় চলছে সৌন্দর্যবর্ধন ও সংস্কার কাজ। যদিও প্রকল্পের কিছু বরাদ্দ বাতিল হয়েছে, তবুও চলমান কাজগুলো শেষ হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এটি উন্নত বিশ্বের আদলে একটি পূর্ণাঙ্গ সাফারি পার্কে রূপ নেবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ বলেন, “প্রজনন মৌসুমে জন্ম নেওয়া প্রাণীদের সুস্থ রাখতে আমাদের ভেটেরিনারি টিম দিনরাত কাজ করছে। পর্যটন স্পটগুলোর উন্নয়ন শেষ হলে এই পার্ক হবে দেশের অন্যতম সেরা বিনোদন কেন্দ্র।”
১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সাফারি পার্কটি নিছক বিনোদন কেন্দ্র নয়, বরং বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও প্রজননের এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। নতুন অতিথিদের কলকাকলি আর আধুনিকায়নের ছোঁয়ায় ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক এখন পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে।