
জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই রাজনীতির মাঠে সহিংসতার কালোছায়া দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ গোষ্ঠী চোরাগোপ্তা হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং জনমনে ভীতি সঞ্চারের নীল নকশা বাস্তবায়ন করতে পারে—এমন সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্র এবং সীমান্ত গলে অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে ‘ফ্যাসিস্ট টেররিস্ট’ দমনে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তফসিল ঘোষণার পরদিনই ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে গুলিবর্ষণের ঘটনাকে সরকার কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছে না, বরং একে ‘অশনিসংকেত’ হিসেবে বিবেচনা করছে। ওই ঘটনার পরপরই রাজধানীর বাড্ডায় বাসে আগুন, লক্ষ্মীপুর জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ এবং শান্তিনগর-মৌচাক-মিরপুর এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো একই সূত্রে গাঁথা বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আসা তথ্যমতে, নির্বাচন বানচালপ্রত্যাশী একটি গোষ্ঠী অনলাইনে যোগাযোগ অ্যাপের মাধ্যমে গোপন শলাপরামর্শ করছে। তাদের আলোচনায় ঢাকা ও চট্টগ্রামকে প্রধান ‘টার্গেট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি কমানো এবং নির্বাচনী কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটানোই তাদের মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে তারা যানবাহন ও নির্বাচনী স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে আতঙ্ক তৈরির পরিকল্পনা করেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকে শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলাকে নির্বাচন ভণ্ডুল করার অপপ্রয়াস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো চেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আইজিপি দেশের সব রেঞ্জ ডিআইজি ও মহানগর পুলিশ কমিশনারদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন। সিদ্ধান্ত হয়েছে, কোথাও বড় ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটলে এবং তাতে পুলিশের গাফিলতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার (ক্লোজ) করা হবে। এছাড়া তাৎক্ষণিক সহায়তা নিশ্চিতে চালু করা হচ্ছে বিশেষ হটলাইন নম্বর।
নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি থামানোই এখন পুলিশের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া পুলিশের ১ হাজার ৩৩৭টি অস্ত্র এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, যার মধ্যে প্রায় ৪০০টি পিস্তল রয়েছে। এই অস্ত্রগুলো পেশাদার অপরাধীদের হাতে গিয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, সীমান্ত দিয়ে যেন নতুন করে কোনো অস্ত্র ঢুকতে না পারে এবং কোনো অপরাধী দেশত্যাগ করতে না পারে, সেজন্য নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অবৈধ অস্ত্রের রুট ও নাশকতার অর্থের জোগানদাতাদের চিহ্নিত করতে মাঠে নেমেছে। জুলাই অভ্যুত্থানে যারা ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালিয়েছিল, তাদের গ্রেপ্তারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখা ব্যক্তিরা সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের প্রার্থী ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, “নির্বাচন বানচালের কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হতে দেওয়া হবে না। ভোটার ও প্রার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম চালাতে পারেন, সেজন্য পুলিশ সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে মাঠে থাকবে।”