
সম্প্রতি অনেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক ‘গজাতে’ নানা বয়ান ছুড়ে দিচ্ছেন। পাকিস্তানের সঙ্গে জাতি হিসেবে বাঙালি জাতির এবং নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশী নাগরিকদের সম্পর্কের বহুমাত্রিক রূপ থাকবে। এই পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এ মাটির মানুষের সঙ্গে কী আচরণ করেছিল, এ মাটির মানুষকে তারা কীভাবে ‘ডিল’ করতো সেসব বিষয় অবশ্যই ইতিহাস পর্যালোচনা করে আমাদের মানসপটে স্থির রাখতে হবে। আজও রাজনৈতিক বক্তব্যের ভেতর মানুষ প্রতিপক্ষকে ‘পাকিস্তানপন্থি’ বলে ‘ট্যাগ’ দিয়ে পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিক করে রাখার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। পাকিস্তান আমাদের রাজনৈতিক আঙিনায় আলোচনার কোনো বিষয়বস্তু হওয়ার বাস্তবতা ফুরিয়ে গেছে। ১৯৭১ পরবর্তী প্রজন্মকে এখনো দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তানপন্থি বলে ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে, যা অবান্তর ও অগ্রহণযোগ্য।
আমার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা। এক নম্বর সেক্টরের অধীনে চট্টগ্রাম শহরেই আমার বাবা যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। সিটি কলেজ পড়ুয়া আমার বাবা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযানে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। এই পাকিস্তানকে আমার বাবা আজীবনে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। কোনো মুক্তিযোদ্ধার পক্ষে এই রাষ্ট্রকে সম্মানের চোখে দেখা সম্ভব নয়।
এই পাকিস্তান আমার নিরীহ, নিরস্ত্র, অধিকারবঞ্চিত জাতির উপর বর্বরতা চালিয়েছে। নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, নিষ্পেষণের রক্তাক্ত সেই স্মৃতি আজও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বহন করে চলেছে হতভাগ্য এই জাতি।
আজকে দেখছি, কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কিছু পুরনো রিপোর্ট হাজির করছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ। ওইসব রিপোর্টের মূল মেসেজ হলো, পাকিস্তান কেন আমাদের এখন বন্ধু হতে পারে, পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের অর্ধশত বছর আগেই ‘হিসেব চুকেছে’। এসব রিপোর্টের মধ্যে আমি বিবিসি’র একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি দেখে যারপরনাই বিস্মিত হলাম। তারা ওই রিপোর্টে তুলে ধরতে চেয়েছে, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সফরে আসা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক’ যোগাযোগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের এই রাষ্ট্রের উপর চালানো নারকীয় গণহত্যার অভিযোগ ‘প্রত্যাহার’ হয়ে গেছে।
আজ আমাদের অহংকার মহান মুক্তিযুদ্ধ ও পাকিস্তান ইস্যুকে নিয়ে নতুন করে সত্য জানতে হবে অবশ্যই। কোনো রাজনৈতিক দলের বয়ানকে অন্তিম সত্য হিসেবে বিশ্বাস না করে, আমাদের নানামুখী গবেষণাগুলো অধ্যয়ন করতে হবে।
বিবিসিতে প্রকাশিত এক সংবাদের আলোকে কিছু তথ্য আমি উপস্থাপন করতে চাইছি। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশনের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ ব্রুস রিডেল তার ‘ডেডলি এমব্রেস‘ বইতে লিখেছেন, পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম থেকেই “পাকিস্তানের কাছে বাংলার গুরুত্ব ছিল দ্বিতীয়“ এবং বাঙালিদের “দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক“ হিসাবে দেখা হতো।
সেনাবাহিনী এবং আমলাতন্ত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য কায়েম হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নের দিকে প্রাধান্য দেয়। পূর্ব পাকিস্তানকে একরকম উপনিবেশ হিসাবে দেখতে শুরু করে। পাকিস্তানের স্বাধীনতার পরের ২৫ বছর সেই প্রভু-সুলভ মনোভাবের প্রতিফলন দেখা গেছে পদে পদে।
পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা পশ্চিমের চেয়ে বেশি হওয়া সত্ত্বেও সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্য কতটা পাহাড়সমান ছিল! পাকিস্তানের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৫০-৫৫), কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দের মাত্র ২০ শতাংশ পেয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান। তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৬৫-৭০) সেই বরাদ্দ বাড়লেও তা হয়েছিল ৩৬ শতাংশ। একে তো বরাদ্দ অনেক কম দেওয়া হতো, তারপরও পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রকাশ্যে এবং গোপনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে তহবিল নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জটিল সব কর ব্যবস্থায় আড়ালে নানা খরচ দেখিয়ে এই তহবিল নিয়ে যাওয়া হতো। এক হিসাবে ২৫ বছরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে পাচার এই টাকার পরিমাণ ছিল ২৬০ কোটি ডলার।
বছরের পর বছর বরাদ্দে এই বৈষম্যের শিকার হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের অবকাঠামো, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা। ভারত ভাগের সময় পাকিস্তানের দুই অংশে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা ছিল প্রায় সমান। কিন্তু ১৯৭১ সালে এসে পূর্ব পাকিস্তানে ২৪ বছরের আগের তুলনায় প্রাইমারি স্কুলের সংখ্যা কমে যায়। অথচ পশ্চিমে ১৯৬০ এর দশকে এসেই প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা তিনগুণ বেশি হয়ে যায়। ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে গ্রাজুয়েটের সংখ্যা ছিল ৪১,০০০ আর পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল ৪৫,০০০।
কিন্তু দশ বছর পর ১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে গ্রাজুয়েট তৈরি হয় আটাশ হাজার, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানে সেই সংখ্যা চুয়ান্ন হাজার!
অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা শেষ করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেখানে পূর্ব পাকিস্তানে ঐ দশ বছরে ৩২ শতাংশ কমে গিয়েছিল, পশ্চিমে বেড়েছিল ২১ শতাংশ। সরকারি বৃত্তি, অনুদান প্রধানত পেয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের শিক্ষার্থীরা, কারণ বিজ্ঞাপন যখন পূর্ব পাকিস্তানে প্রকাশিত হতো তখন আবেদনের সময় থাকতো না।
পূর্ব পাকিস্তান হয়ে উঠেছিল পশ্চিম পাকিস্তানের কল-কারখানার কাঁচামালের যোগানদাতা এবং তাদের উৎপাদিত পণ্যের প্রধান ক্রেতা।
সরকারি উঁচু পদের নিয়োগে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে। ১৯৫০ সালে, ২০ শতাংশ মেধা-ভিত্তিক নিয়োগের পর ৮০ শতাংশ সরকারি চাকরি দুই অংশের মধ্যে কোটা-ভিত্তিক নিয়োগের নীতি ঘোষণা করা হয়। কিন্ত গবেষক রিজওয়ান কোকাব বলছেন, পূর্ব পাকিস্তানে যোগ্য প্রার্থী নেই এই খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে কখনোই সে কোটা মানা হয়নি। ফলে, ১৯৬৬ সালে এসেও দেখা গেছে সরকারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব খুবই কম।
১৯৬৬ সালে প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের ৮১ শতাংশ ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের আর মাত্র ১৯ শতাংশ পূর্ব পাকিস্তানের। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এই অনুপাত ছিল ৬৪ এবং ৩৬ শতাংশ। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৯২ শতাংশ কর্মকর্তাই ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৭৮ শতাংশই ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি। ১৯৭১ সালে এসেও সেই চিত্র বদলায়নি। ঐ বছর সরকারি গেজেটেড কর্মকর্তাদের মধ্যে বাঙালির সংখ্যা ছিল ১৯৬, সেখানে এক পাঞ্জাব প্রদেশের কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল ১৯৯। অথচ জনসংখ্যার বিবেচনায় অনেক বেশিই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকের সংখ্যা।
সরকারি চাকরিতে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্যে কোনো রাখঢাক ছিল না। প্রচুর বিহারী (ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসা উর্দুভাষী) নিয়মিত বাঙালি কোটায় চাকরি দখল করেছে।
ভারত ভাগের সময় ভারতীয় সিভিল সার্ভিস এবং ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসের যে ৯৫ জন মুসলিম কর্মকর্তা পাকিস্তানে গিয়েছিলেন তাদের মাত্র দুইজন ছিলেন বাঙালি। এক-তৃতীয়াংশই ছিলেন পাঞ্জাবি। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানে জেলা বা মহকুমা পর্যায় পর্যন্তও প্রধান প্রশাসকরা ছিলেন অবাঙ্গালি। এই ব্যবধান থেকেই গিয়েছিল। একজন সচিব হতে বাঙালিদের ১৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। ১৯৬৪ সালে দুইজন বাঙালি সচিব হয়েছিলেন, তাও একজনের পোস্টিং ছিল ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি সেক্রেটারিয়েটে, অন্যজনের পরিকল্পনা বিভাগে। সংস্থাপন, অর্থ, প্রতিরক্ষার মত জায়গায় বড় পদে বাঙালি অফিসারদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হতো। বাঙালিদের এমন জায়গায় পোস্টিং দেওয়া হতো না যেখানে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সিদ্ধান্ত হয়।
১৯৭০-এ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ৬ হাজার অফিসারের মধ্যে বাঙালি ছিল মাত্র ৩০০ জন। সিংহভাগই নিম্নপদের কর্মকর্তা। একটি জায়গায় ২০ জন অফিসারের মধ্যে হয়তো একজন থাকতেন বাঙালি। যদি ২০০ ক্যাডেট অ্যাকাডেমিতে ঢুকতো, তার মধ্যে বড়জোর চার-পাঁচজন থাকতো বাঙালি। সেনাবাহিনীতে বাঙালি শুধু যে কম ছিল তা নয়, সামরিক সরঞ্জামের ৯৫ শতাংশই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ইস্টার্ন ফ্রন্টকে পাকিস্তান কখনোই গুরুত্ব দেয়নি।
সরকারি চাকরিতে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ এবং কম প্রতিনিধিত্ব – এই দুটো বিষয় বাঙালিদের প্রচণ্ড ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। নানা বৈষম্যের মধ্যে পার করা বাঙালি জাতি যখন ঐক্যবদ্ধ হলো, গণতান্ত্রিক পন্থায় জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে নিজেদের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করার দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিল, তখন সামরিক মারণাস্ত্র দিয়ে বাঙালিদের ‘ডিল’ করলো পাকিস্তান শাসকেরা।
এই মারণাস্ত্র দিয়ে ৩০ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করা হলো। লক্ষ লক্ষ মা-বোন নির্যাতিত হলো। লক্ষ লক্ষ মানুষ পঙ্গু, আহত হলো।
আজকের এই পর্যায়ে এসে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা মা-বোন আর লাখ লাখ জীবনবাজি রাখা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমাদের যদি ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত থাকে, তাহলে পাকিস্তানের সাথে আমাদের ‘শ্রদ্ধার’ সম্পর্ক স্থাপন হতে পারে না। যে সম্পর্ক হতে পারে, তা হতে পারে বাণিজ্যিক, তা হতে পারে কূটনৈতিক, যা হতে পারে শুধুই স্বার্থের।
হিরোশিমা-নাগাসাকিতে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পরও আমেরিকা এবং জাপানের মধ্যে যে সম্পর্ক চলছে, সে সম্পর্ক বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যেও চলতে পারে। পাকিস্তান কখনোই আমাদের ‘মনের বন্ধু’ হতে পারে না। তবে আমি পাকিস্তানকে এখন আর শত্রুও মনে করি না। কারণ সে দেশের সাথে আমার কোনো যুদ্ধ এখন নেই।
আমার পূর্ব-পুরুষ তাকে নিজেদের জীবন দিয়ে এ মাটি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তাকে ‘বেইজ্জত’ করে এখান থেকে হটিয়েছে। কাপুরুষের মতো মুচলেকা দিয়ে তারা পালিয়েছে এ দেশ থেকে। এই মনোবেদনা পাকিস্তান জাতি এখনো ভুলতে পারেনি। তাই পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে বিষোদ্গার করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রসঙ্গ টেনেছেন পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী। ইমরান খানকে শেখ মুজিবুর রহমানের ভক্ত হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।
৬ ডিসেম্বর ২০২৫ রাওয়ালপিন্ডিতে প্রায় দুই ঘণ্টা দীর্ঘ এক সংবাদ সম্মেলনে ইমরান খানের বিরুদ্ধে ‘সশস্ত্র বাহিনীবিরোধী প্রচারে’র অভিযোগ করেছেন পাকিস্তানের এই সেনা কর্মকর্তা। তিনি ইমরানকে ‘মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রচারিত বয়ান এখন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে।’
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘আপনাদের আরও একটা উদাহরণ দিই। তার (ইমরান খান) সোশ্যাল মিডিয়া টুইট দেখলে বুঝবেন, তিনি গাদ্দার শেখ মুজিবুর রহমানের কত ভক্ত, তার কারণে কত দুঃখ তার! বারবার তাকে কোট করে এবং তার উদাহরণ দেয়।’ অতএব পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনীর ক্ষোভ আজও রয়ে গেছে বাঙালি জাতির উপর। তারা আজও বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান কারিগর বঙ্গবন্ধু মুজিবকে ‘গাদ্দার’ বলে বেড়াচ্ছে!
বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের এতটুকু বুঝতে সমস্যা হয় না যে, পাকিস্তান দুনিয়ার বুকে এমন কিছুই হয়ে উঠেনি যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে টিকে থাকতে হলে পাকিস্তানের কোনো সহযোগিতা নিয়ে টিকে থাকতে হবে।
পাকিস্তানের বর্তমান জনসাধারণের প্রতি আমাদের কোনো ক্ষোভ নেই। তারা যদি ১৯৭১ এর গণহত্যা আর নিষ্পেষণকে সমর্থন না করে, আমরা বর্তমান পাকিস্তানি নাগরিকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবো। আর যদি পাকিস্তানের জনগণ আমাদের উপর চালানো গণহত্যাকে সমর্থন করে, তাহলে ধরে নেব পৃথিবীতে নিকৃষ্টতম জাতি এখনো পাকিস্তান।
আশার আলো হলো, স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে না থেকে পিন্ডির দাসত্ব মেনে নেওয়া জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান নেতৃত্ব আজ এসে স্বীকার করছে, মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল এ দেশের আপামর জনতার মুক্তি সোপান, একাত্তর ইস্যুতে তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। একাত্তর ইস্যুতে এই দলের পুরোনো নেতাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর ‘চুনকালি’ দিয়ে দলটির নতুন প্রজন্ম মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে যাচ্ছে। তাদের এই প্রজন্মের নেতা ও বুদ্ধিজীবী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির, যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মির্জা গালিবসহ বেশকিছু ব্যক্তিত্ব মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। যা অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও সমাদৃত।
আমরা চাই এই প্রজন্ম শুধুমাত্র ‘মুক্তিযুদ্ধপন্থি’ হয়েই থাকবে, কিন্তু যার যার রাজনৈতিক আদর্শের প্রচারণা এবং দেশ এগিয়ে নিতে তাদের পরিকল্পনা উপস্থাপন করে যাবে। রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে দ্বিমত থাকার পরও যারা মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিনাপ্রশ্নে অগাধ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করছে, তাদের প্রতি আমার সম্মান শ্রদ্ধা জারি করে গেলাম। বাংলাদেশের নতুন জেনারেশন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবে এটিই স্বাভাবিক এবং তা মুক্তিযুদ্ধকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম প্রাসঙ্গিক রাখবে। অবশ্যই এই দলের এই প্রজন্মের এই অবস্থানকে ইতিবাচকভাবেই দেখতে হবে।
যদিও এই দলের কিছু বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা ও বুদ্ধিজীবী এখনো ইনিয়ে-বিনিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মেনে নিতে পারে না। তারা এখনো মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করে বক্তৃতা শুরু করতে পারে না। এই দলের অনেকেই টেলিভিশন টকশো-তে এখনো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা বিতর্ক জিইয়ে রাখতে চায়। এই দলের কেউ কেউ এখনো বলে, ভারতের এ দেশে আধিপত্য বিস্তারের আশংকার যুক্তি দেখিয়ে দেশের স্বাধীনতা তারা চাননি। যদিও এই যুক্তি এ দেশের জনগণের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য তা জনগণই বিবেচনা করবে।
বিজয়ের মাসের এই মুহূর্তে এ মাটির সন্তানদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিতে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, জনতা, বীরাঙ্গনা- যারা জীবনবাজি রেখেছিলেন, যারা জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, স্বজন হারিয়েছেন, যারা বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা চালিয়েছেন, যারা মুক্তির নেশা জাগাতে মানুষকে কবিতা-গানে উদ্বুদ্ধ করেছেন, যারা মুক্তিবাহিনীকে সহযোগিতা করেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিডিআর, আনসার সদস্য যারা হানাদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছেন, প্রবাসী বাঙালি/বিদেশী নাগরিক যারা মুক্তিযুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে জনমত গঠন করেছেন, গ্রাম-বাংলার ঘরে ঘরে যে যুবক-বৃদ্ধ, মা-বোন, সন্তানেরা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে ন্যূনতম প্রার্থনা করেছেন তাদের প্রত্যেককে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ১ কোটি বাংলাদেশী শরণার্থীকে টানা ১ বছর খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তাসহ আশ্রয় প্রদানকারী, মুক্তিবাহিনীকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ প্রদানকারী এবং ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত মিত্রবাহিনী, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মুক্তিবাহিনীকে চূড়ান্ত সহায়তা প্রদানকারী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন তৎকালীন ভারত সরকার ও ভারতের তৎকালীন জনগণের সহযোগিতা ও সহমর্মিতার কথা শ্রদ্ধাভরে, কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি।
স্মরণ করছি স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতির রাখাল রাজা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ জাতীয় চার নেতা, মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী, চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার অন্যতম ঘোষণা প্রদানকারী ও এক নম্বর সেক্টর কমান্ডার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদানকারী সকল নেতাদের।
নরপিশাচ ইয়াহিয়া, ভুট্টোসহ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, তাদের দোসর ও সমর্থনকারীদের যারা আমার মাটির সন্তানদের উপর গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও মা-বোনদের শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছিল, তাদের প্রতি হৃদয়ের সবটুকু ঘৃণা জানিয়ে গেলাম। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে শেষবিচারের দিন এই জালিমদের তাঁর ঘোষিত বিধান অনুযায়ীই বিচার করার ফরিয়াদ করলাম।
চির অভিশপ্ত পাকিস্তানি হানাদার ইয়াহিয়াপন্থি কোনো সমর্থক কেউ যদি এখনো এ মাটিতে থেকে থাকেন, তাদের উচিত ইনিয়ে-বিনিয়ে এই স্বাধীন বাংলাদেশকে মেনে নেওয়া। আমি মনে করি, পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো পাকিস্তানের সাথে আমাদের ন্যূনতম যোগাযোগ থাকুক। তবে পাকিস্তান হাজারবার ক্ষমা চাইলেও, আমাদের আপামর জনতার উপর চালানো অত্যাচার, নির্যাতনকে আমরা ভুলতে পারবো না। যেকোনো ব্যক্তি, বুদ্ধিজীবী, গবেষক বা গণমাধ্যম পাকিস্তানের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা তৈরির প্রচেষ্টা কোনো কাজে আসবে না। কারণ ৩০ লাখ শহীদ, বীরাঙ্গনা আর বীর মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে, আমাদেরকে স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের এই লাল রক্তভেজা মাটির দিকেই ধাবিত রাখবে।
লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ও সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি।