শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

এমপি হতে বড় দলে যোগদানের হিড়িক

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ৪:১৫ অপরাহ্ন


নির্বাচন কমিশনের ভোটের হুইসেল বাজার সঙ্গে সঙ্গেই রাজনীতির মাঠে শুরু হয়েছে নানান সমীকরণ। আসন প্রাপ্তির নিশ্চয়তা ও জয়ের সম্ভাবনা বাড়াতে ছোট দলগুলোর শীর্ষ নেতারা নিজেদের দল বিলুপ্ত করে, আবার কেউ শীর্ষ পদ ছেড়ে বড় দলে যোগ দিচ্ছেন। বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে ‘ক্ষমতার দৌড়ে টিকে থাকার অভিনব পন্থা’ বললেও যোগ দেওয়া নেতারা একে দেখছেন ভোটের কৌশল হিসেবে।

সম্প্রতি তিনটি অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রধান নিজেদের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তাঁরা হলেন বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা এবং এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। এছাড়া এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ এবং এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। সর্বশেষ শনিবার বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান।

ভোটের রাজনীতিতে এতদিন জোটের ছোট দলের প্রার্থীরা বড় দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতেন। কিন্তু আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করেছে নির্বাচন কমিশন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, অন্য দলের সঙ্গে জোট করলেও প্রার্থীকে নিজ দলের প্রতীকেই নির্বাচন করতে হবে। বিএনপিসহ শরিকরা পুরনো সুযোগ বহাল রাখার আবেদন করলেও ইসি অনড় অবস্থানে থাকে। ফলে ছাড় দেওয়া আসনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক না থাকলে বিরোধীদের জয়ের শঙ্কা থাকায় বিএনপিও শরিকদের ছাড় দিতে অনমনীয়। এই পরিস্থিতিতে আসন নিশ্চিত করতে এবং ধানের শীষ প্রতীক পেতেই ছোট দলের নেতারা বিএনপিতে যোগ দিচ্ছেন।

দল বিলুপ্ত করে অন্য দলে যোগদানকে ‘অভিনব’ বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, এটা তো অভিনব। তোরা যে যা বলিস ভাই, আমাদের এমপি হওয়া চাই। যেকোনো মূল্যে, যেকোনো শর্তে। কারণ এমপি হওয়ার সঙ্গে মধু যুক্ত আছে। ক্ষমতার সঙ্গে জাদুর কাঠি যুক্ত।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বিষয়টিকে নিন্দনীয় বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, জনগণের কাছে তাঁদের যে একটা অঙ্গীকার বা মতাদর্শ ছিল, সেগুলোকে উপেক্ষা করে তাঁরা এমনটা করছেন। তাঁদের সাংগঠনিক দৃঢ়তার অভাবেই এমনটা হতে পারে। আবার একধরনের জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন বলেই এ ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন, যা জনগণ পছন্দ করবে না।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এসব ঘটনায় অবাক হওয়ার মতো কিছু দেখি না। আমাদের রাজনীতিতে রাজনৈতিক দর্শন বা মতাদর্শ কখনো কাগুজে ফাঁকা বুলির ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি।

তবে দলবদলকারী নেতারা এর পেছনে ভিন্ন যুক্তি দেখাচ্ছেন। এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ বলেন, নতুন বা ছোট দলের জন্য নিজস্ব প্রতীক পরিচিত করার সময় কম থাকায় ধানের শীষে নির্বাচন করলে জয়ের সম্ভাবনা বাড়ে। পাশাপাশি নির্বাচনের পর পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠনের ক্ষেত্রে ন্যূনতম পাঁচ শতাংশ ভোটের শর্ত থাকায় এক বা দুই আসনে নির্বাচন করা দলগুলোর সেই সুযোগ পাওয়া কঠিন।

জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা দাবি করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন। তিনি বলেন, আমার রাজনীতি শুরু বিএনপি থেকে। এখন ঘরের ছেলে ঘরেই ফিরে এলাম। মাঝখানে কিছুটা দিন আমি বাবার দলটা করেছি।

বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিমের ভাষ্য, নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেই তিনি দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন, নেতাকর্মীরা বলছেন আমি বিএনপিতে যোগ দিলে তাঁরাও দেবেন। সবাই আগ্রহ প্রকাশ করায় এবং দলে বিকল্প নেতৃত্ব না থাকায় দল বিলুপ্ত করেছি।

অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের ছয়টি আসনে ছাড় দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। সেখানে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, জাতীয় পার্টি (জেপি) নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। কেবল রাশেদ খান মেনন ও জাসদের রেজাউল করিম তানসেন বিজয়ী হতে পেরেছিলেন। গত চারটি জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকলেও এসব দল সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হতে পারেনি।