শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

যেভাবে ‘আপসহীন’ হয়ে উঠেছিলেন খালেদা জিয়া

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১১:১২ পূর্বাহ্ন


জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন এক দৃঢ়চেতা ও সাহসী নেত্রী। দীর্ঘ ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে পেয়েছেন ‘আপসহীন নেত্রী’র খেতাব। আর শেষ জীবনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জাতির ‘ঐক্যের প্রতীক’।

১৯৮১ সালের ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে নিহত হলে বিএনপি গভীর সংকটে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপিতে যোগ দেন। তখন তাঁর বয়স ছিল চল্লিশের নিচে। প্রথমে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং শেষে চেয়ারপারসন হিসেবে দলের হাল ধরেন তিনি। শুরু হয় নতুন নেতৃত্বে বিএনপির পথচলা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মূলত স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদবিরোধী আন্দোলন খালেদা জিয়াকে একটি শক্ত ভিত্তি ও ব্যক্তিত্ব গড়ে দেয়। ১৯৮৩ সালে তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নামেন এবং তাঁর নেতৃত্বেই গঠিত হয় ৭–দলীয় ঐক্যজোট। দীর্ঘ ৯ বছরের আন্দোলনে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’র পরিচিতি পান। ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অভাবনীয় জনসমর্থন পেয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং খালেদা জিয়া দেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর ‘খালেদা’ গ্রন্থে লিখেছেন, বাস্তবিক অর্থে তিনি ছিলেন একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীন নির্বাচিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তাঁর এই কৃতিত্ব কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। প্রয়াত সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ তাঁর ‘বেগম খালেদা জিয়া: জীবন ও সংগ্রাম’ বইয়ের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, খালেদা জিয়া এমন একটি সময়ে স্বকীয় রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছেন, যখন পুরুষশাসিত সমাজের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে জোটের রাজনীতি এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৯৯ সালে জাতীয় পার্টির এইচ এম এরশাদ, জামায়াতের গোলাম আযম ও ইসলামী ঐক্যজোটের শায়খুল হাদিস আজিজুল হককে নিয়ে ৪–দলীয় জোট গঠন করেন তিনি। পরবর্তীতে এই জোট ২০–দলীয় জোটে রূপ নেয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, খালেদা জিয়ার চরিত্রের বড় একটি দিক হলো তিনি পরমতসহিষ্ণু ছিলেন। তিনি নিজে কম বলতেন, শুনতেন বেশি। প্রয়োজনে তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে এসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করেছিলেন।

তবে খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারের ওপর বড় ঝড় আসে ২০০৭ সালের এক-এগারোর সময়। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাঁকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নাই, এই দেশই আমার সব। ওই সময় তাঁর দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া নিজেও। তৎকালীন বিএনপি নেতা ব্রিগেডিয়ার আ স ম হান্নান শাহ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, খালেদা জিয়া যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে প্রস্তুত, তবু দেশ ছাড়বেন না।

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১০ সালে তাঁকে দীর্ঘ ২৮ বছরের স্মৃতিবিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। এরপর তিনি গুলশানের ‘ফিরোজা’ বাসভবনে ওঠেন। ২০১৫ সালে গুলশানের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় তিনি মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর সংবাদ পান। তখন এক সংবাদ সম্মেলনে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, আমি কম বয়সে স্বামী হারিয়েছি, কারাগারে মাকে হারিয়েছি, অবরুদ্ধ অবস্থায় সন্তান হারিয়েছি। আমার এই স্বজনহীন জীবনে দেশবাসীই আমার স্বজন।

বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়া ছিলেন একজন পরিস্থিতিবোদ্ধা নেতা। লেখক মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, হাসিনা সরকারের আমলে খালেদা জিয়া অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েও ধৈর্য হারাননি। নিজের ওপর তাঁর বিশ্বাস ছিল, যা একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন ব্যক্তি নন, নিজ কর্মগুণে নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মুক্তি পান খালেদা জিয়া। এরপর ৭ আগস্ট এক ভিডিও বার্তায় তিনি তরুণদের উদ্দেশে বলেন, আসুন, ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-জুলুম এবং শেষ সময়ে অভূতপূর্ব রাষ্ট্রীয় সম্মান—সব মিলিয়ে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক শক্তিশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন।