শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

খালেদা জিয়ার প্রয়াণ: বিদেশি গণমাধ্যমে ‘প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী’ ও ‘প্রতিরোধের প্রতীক’

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ৭:২৬ অপরাহ্ন


বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। প্রভাবশালী এসব সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম ও বর্ণনায় বিএনপির সদ্য প্রয়াত এই চেয়ারপারসনকে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে উঠে এসেছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার সঙ্গে লড়াই, ক্ষমতা ও প্রতিরোধের বর্ণাঢ্য এক জীবনের কথা।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনের শুরুতেই বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক যাত্রার কথা উল্লেখ করেছে। তাদের বর্ণনায় স্বাভাবিকভাবেই এসেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রসঙ্গও। পত্রিকাটি লিখেছে, নারী নেতৃত্বাধীন ভিন্ন মতাদর্শের দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার এই দশকে পর দশক ধরে চলা প্রতিদ্বন্দ্বিতা দক্ষিণ এশিয়ার এই বদ্বীপ রাষ্ট্রটির গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

জীবনের শেষ এক দশকে অসুস্থতায় ভোগা খালেদা জিয়াকে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা ধারাবাহিকভাবে চাপের মুখে রেখেছিল বলেও মন্তব্য করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, একের পর এক মামলা দায়ের হওয়ায় তাঁকে কখনো কারাগারে, আবার কখনো গৃহবন্দি অবস্থায় দিন কাটাতে হয়েছে। মৃত্যুর আগে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতার পাশাপাশি তিনি রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস এবং লিভারের গুরুতর সমস্যায় ভুগছিলেন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা তাদের প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ‘ব্যাটলিং বেগম’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের ভাষ্যমতে, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা বর্তমানে নির্বাসিত এবং মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা এক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।

‘অস্থির সময়ে উত্থান’ শিরোনামে আল জাজিরা লিখেছে, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক বিদ্রোহে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে বাংলাদেশ গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। একের পর এক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের পর যিনি দেশকে স্থিতিশীল করেছিলেন, সেই জিয়াউর রহমান রেখে যান একটি ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং হঠাৎ করেই প্রতিষ্ঠাতাবিহীন হয়ে পড়া বিএনপিকে। স্বামী রাষ্ট্রপতি থাকাকালে খালেদা জিয়া সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। কিন্তু জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির শীর্ষ নেতারা দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে এবং জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রাখতে খালেদাকেই একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে বেছে নেন।

সংবাদমাধ্যমটি আরও উল্লেখ করে, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর উপরাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯৮২ সালের মার্চে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন এবং সামরিক আইন জারি করেন। এই অস্থির প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলো যখন টিকে থাকার লড়াই করছে, ঠিক সে সময় খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি কঠোর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া এক নেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, স্বামীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার গ্রহণের পর সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া তাঁর আপসহীন অবস্থান ধরে রাখেন। এ কারণে দ্রুতই তাঁর একনিষ্ঠ সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি হয়। পত্রিকাটি উল্লেখ করে, ১৯৯১ সালে তিনি প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন এবং ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হলেও তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদ ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত, যা বিরোধীদের বর্জনের মুখে পড়েছিল এবং অল্প কিছুদিন পর তিনি পদত্যাগ করেন। গার্ডিয়ান আরও জানায়, ২০০১ সালে তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় বসেন খালেদা জিয়া। তবে এই মেয়াদে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ ওঠে এবং ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় গেলে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়।

আরেক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি লিখেছে, শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের শাসনামলে খালেদা জিয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীকে পরিণত হন। জাতীয় নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হলে খালেদা জিয়া ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেন। পরে দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাবন্দি হন। তবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং এগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছিলেন। বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছে, গত বছরের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশ যখন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন খালেদা জিয়ার জীবনাবসান হলো। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আসন্ন নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা শোনা যাচ্ছিল।

এছাড়া ভারত, পাকিস্তান, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রধান গণমাধ্যমগুলোতেও খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর এবং তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিশ্লেষণ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হয়েছে।