
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠ এখন সরগরম। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর্ব শেষে প্রার্থীদের হলফনামা থেকে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক চমকপ্রদ তথ্য। সম্পদের পাহাড়, মামলার ভার, শিক্ষাগত যোগ্যতার বিশাল ব্যবধান আর ঋণের দায়—সব মিলিয়ে পটিয়ার ১১ প্রার্থীর চিত্র যেন সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। একদিকে বিএনপির প্রার্থী এনামুল হক এনামের ঘাড়ে ১২১ কোটি টাকার বিশাল ঋণের বোঝা ও ৩২টি মামলা, অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থীর স্ত্রীর বিপুল সম্পদ ও ১০ ভরি সোনা। আবার জাতীয় পার্টি-জেপির প্রার্থীর হাতে রয়েছে রিভলবার, তো স্ত্রীর হাতে বন্দুক। এলডিপির প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘স্বাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন’ হলেও তার ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ২২ কোটি টাকা।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পটিয়া আসনে ১৮ জন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত জমা দিয়েছেন ১১ জন। এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, এলডিপি, ইসলামী ফ্রন্ট, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন ও ইনসানিয়াত বিপ্লবের প্রার্থীদের পাশাপাশি রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও। ব্যবসায়ী, চিকিৎসক ও শিক্ষক—মূলত এই তিন পেশার লোকজনই এবার পটিয়ায় ভোটের মাঠে লড়ছেন।
এই আসনের সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থী হলেন বিএনপির এনামুল হক এনাম। ৫৭ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ী শিক্ষাগত যোগ্যতায় এইচএসসি পাস হলেও তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা সর্বাধিক ৩২টি। এর মধ্যে ২১টিই অর্থ সংক্রান্ত। ফৌজদারি ১১টি মামলা থেকে খালাস বা প্রত্যাহার পেলেও অর্থের মামলাগুলো আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ে বিচারাধীন। সম্পদের চেয়ে তার দায়ের পাল্লা অনেক ভারী। কৃষি, বাড়ি ভাড়া ও ব্যবসা থেকে তার বার্ষিক আয় এবং স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে প্রায় ৪৫ কোটি টাকার সম্পদ থাকলেও, তার বিপরীতে ওয়ান ব্যাংক ও মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ঋণের পরিমাণ ১২১ কোটি টাকা। তিনি চলতি ২০২৫-২৬ করবর্ষে ২৪ লাখ ২২ হাজার টাকা আয়কর দিয়েছেন।
বিপরীত চিত্র দেখা যায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. ফরিদুল আলমের হলফনামায়। ৬৯ বছর বয়সী এমবিবিএস পাস এই চিকিৎসকের কোনো ব্যাংক ঋণ বা ফৌজদারি মামলা নেই। তার আয়ের বড় অংশ আসে শেয়ার, বন্ড ও সঞ্চয়পত্র থেকে। নিজের ১০ ভরি স্বর্ণ, একটি প্রাইভেট কারসহ তার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ৭ কোটি ১৫ লাখ টাকার এবং স্থাবর সম্পদ ৫ কোটি টাকার। তার স্ত্রী সুলতানা বাদশাজাদীও কোটিপতি; তার নামে ২০ ভরি স্বর্ণ ও বিপুল বিনিয়োগ থাকলেও কোনো স্থাবর সম্পত্তি নেই। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নিয়মিত মোটা অংকের আয়কর প্রদান করেন।
অস্ত্র ও ক্ষমতার স্মৃতি নিয়ে ভোটের মাঠে আছেন জাতীয় পার্টি-জেপির প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ৭০ বছর বয়সী এই প্রার্থীর নিজের নামে একটি রিভলবার এবং স্ত্রীর নামে একটি বন্দুক রয়েছে। এমকম পাস সিরাজুল ইসলামের স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে সম্পদ প্রায় আড়াই কোটি টাকার। তবে নিজের ও সন্তানের নামে তার কোটি টাকার দায় রয়েছে। ধানমন্ডিতে অ্যাপার্টমেন্ট ও রাবার বাগানসহ বেশ কিছু সম্পত্তির মালিক তিনি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছেন এলডিপির প্রার্থী এম এয়াকুব আলী। ৫৬ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ী হলফনামায় নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘স্বাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন’ বলে উল্লেখ করেছেন। অথচ তার বিরুদ্ধেই রয়েছে ৯টি অর্থঋণ মামলা। আয়ের তুলনায় তার দায়ের পরিমাণ আকাশচুম্বী। ৪টি ব্যাংকে তার মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ২২ কোটি টাকা, যার মধ্যে কেবল ইউসিবি ব্যাংকেই রয়েছে ২১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। তবে তার স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে ৭ কোটি ৮১ লাখ টাকার।
শিক্ষাগত যোগ্যতায় সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী এস এম বেলাল নুর। তিনি পিএইচডি ডিগ্রিধারী এবং পেশায় শিক্ষক। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। শিক্ষকতা থেকে বাৎসরিক আয় সীমিত হলেও কৃষি ও অকৃষি জমির পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ফেনীতে তার ১১টি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মোট মূল্য ৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
পটিয়া আসনে বয়সের দিক থেকে সবচেয়ে তরুণ প্রার্থী হলেন গণঅধিকার পরিষদের ডা. এমদাদুল হাসান (৩৭)। এমবিবিএস পাস এই চিকিৎসকের কোনো মামলা না থাকলেও ৩৬ লাখ টাকার দায় রয়েছে। তার কোটি টাকার বেশি অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। অন্যদিকে এ আসনে সবচেয়ে প্রবীণ প্রার্থী জাতীয় পার্টির ৭৩ বছর বয়সী ফরিদ আহমদ চৌধুরী। এইচএসসি পাস এই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে একটি মামলা থাকলেও তিনি জামিনে রয়েছেন। তার স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে প্রায় এক কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে।
অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে ইনসানিয়াত বিপ্লবের মোহাম্মদ আবু তালেব হেলালী কামিল পাস এবং একমাত্র প্রার্থী যিনি রেমিট্যান্স খাত থেকে আয় দেখিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে তিনটি ফৌজদারি মামলা ছিল, যার একটি থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী ছৈয়দ এয়ার মোহাম্মদ পেয়ারু একজন চাকরিজীবী এবং কামিল পাস। তার সম্পদ সীমিত এবং কোনো মামলা নেই। স্বতন্ত্র প্রার্থী ও হোমিও চিকিৎসক মুহাম্মদ শাখাওয়াত হোসাইনের সম্পদ নামমাত্র। আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যবসায়ী সৈয়দ সাদাত আহমদের ব্যবসায়িক আয় এবং নগদ টাকা থাকলেও তার কোনো স্থাবর সম্পত্তি বা দায় নেই।
পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার ফারহানুর রহমান জানিয়েছেন, জমা দেওয়া ১১টি মনোনয়নপত্র ৩ জানুয়ারি যাচাই-বাছাই করা হবে। নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি সন্তোষজনক বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, পটিয়া আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৫৩ জন, নারী ১ লাখ ৬৮ হাজার ৮৪২ জন এবং একজন হিজড়া ভোটার রয়েছেন। এই বিপুল সংখ্যক ভোটারদের অনেকেই এখন প্রার্থীদের যোগ্যতা, সম্পদ আর মামলার খতিয়ান মিলিয়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থী নির্বাচনে ব্যস্ত সময় পার করছেন।