শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

পাহাড়ের স্কুলে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ, উচ্ছ্বাসে ভাসছে শিশুরা

শংকর চৌধুরী | প্রকাশিতঃ ১ জানুয়ারী ২০২৬ | ৬:০৪ অপরাহ্ন


হাড়কাঁপানো শীতের সকাল, কিন্তু খাগড়াছড়ির শিক্ষাঙ্গনগুলোতে উষ্ণতার কোনো কমতি নেই। সেই উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়েছে নতুন ক্লাসে ওঠার আনন্দ আর নতুন বইয়ের গন্ধে। বছরের প্রথম দিন, বৃহস্পতিবার (০১ জানুয়ারি) সকাল থেকেই পাহাড়ি জনপদ খাগড়াছড়ির বিভিন্ন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ শিশুদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে। উদ্দেশ্য একটাই—বছরের প্রথম দিনেই নতুন বই হাতে বাড়ি ফেরা।

খাগড়াছড়ি শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও খাগড়াছড়ি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অ-আনুষ্ঠানিক উৎসবের আমেজে চলে এই বই বিতরণ। শিশুদের চোখে-মুখে ছিল বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস। মলাট উল্টে নতুন পাতার ঘ্রাণ নেওয়ার দৃশ্য যেন পুরো জনপদকেই এক আনন্দের বার্তায় রাঙিয়ে দিয়েছে।

খাগড়াছড়ি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনায় দেখা মিলল দুই খুদে শিক্ষার্থী শুভ্রংশু চাকমা ও মংসানু মারমার সঙ্গে। প্রথম শ্রেণি পেরিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ওঠার গর্ব তাদের চোখেমুখে। হাতে ধরা নতুন পাঠ্যবই।

সেই বইগুলো বুকের কাছে জড়িয়ে ধরেই শুভ্রংশু চাকমা ও মংসানু মারমা তাদের অনুভূতি প্রকাশ করে জানায়, ক্লাস ওয়ান থেকে প্রথম হয়ে টুতে ওঠার আনন্দ তো আছেই, তার সঙ্গে বছরের প্রথম দিনেই নতুন বই পাওয়ার আনন্দ একেবারেই আলাদা। তাদের মতো সহপাঠীরাও নতুন বই পেয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত।

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, সন্তানদের একগাল হাসিতে খুশি অভিভাবকরাও। সন্তানের হাতে নতুন বই দেখে তারাও সন্তোষ প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে বছরের শুরুতেই এমন আয়োজনের জন্য বর্তমান সরকার ও শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তারা। অভিভাবকদের মতে, এই উদ্যোগ শিশুদের পড়াশোনার প্রতি আরও বেশি আগ্রহী করে তুলবে।

শহরের খাগড়াছড়ি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, খাগড়াছড়ি টিএনটি গেইট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খাগড়াছড়ি শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং খাগড়াছড়ি মিউনিসিপ্যাল উচ্চ বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে উৎসবমুখর পরিবেশ। এবারের বই উৎসবে যোগ হয়েছে ভিন্ন এক মাত্রা। সাধারণ পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে তাদের নিজস্ব মাতৃভাষার বই।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় শতভাগ নতুন বই পৌঁছে গেছে বিদ্যালয়গুলোতে এবং অধিকাংশ শিক্ষার্থীর হাতেই তা তুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

বই বিতরণের এই কর্মযজ্ঞ নিয়ে কথা বলেন খাগড়াছড়ি শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহনাজ পারভিন।

তিনি জানান, এ বছর তাদের বিদ্যালয়ের জন্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের মাতৃভাষার বইসহ শতভাগ বই তারা বুঝে পেয়েছেন। বছরের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রায় ৮০ শতাংশ বই বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে।

শাহনাজ পারভিন আরও বলেন, বই পেয়ে শিক্ষার্থীদের আনন্দিত মুখগুলো দেখাই শিক্ষকদের জন্য বড় প্রাপ্তি।

রাষ্ট্র ও শিক্ষকদের এই প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য হলো, কোনো শিশুই যেন শিক্ষার অধিকার থেকে ঝরে না পড়ে। আজকের শিশুই আগামীর ভবিষ্যৎ—এই মন্ত্রে বিশ্বাসী সবাই।

শিক্ষকরা আশা করছেন, নতুন বইয়ের গন্ধে উজ্জীবিত হয়ে এই শিক্ষার্থীরাই একদিন দেশের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে এবং দেশগড়ার কারিগর হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে। পাহাড়ের কোলে বেড়ে ওঠা এই শিশুরাই একদিন শিক্ষার আলোয় আলোকিত করবে পুরো বাংলাদেশ।