
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনে এখন টানটান উত্তেজনা। এই আসনে ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অন্যদিকে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক।
রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি এই দুই প্রার্থীর আর্থিক বিবরণীতেও রয়েছে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সালাহউদ্দিন আহমদের বার্ষিক আয় যেখানে ৬ কোটি টাকার ওপরে, সেখানে আবদুল্লাহ আল ফারুকের মোট সম্পদের পরিমাণই প্রায় ৬০ লাখ টাকার কোঠায়।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ারের কাছে গত ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর প্রার্থীরা তাঁদের মনোনয়নপত্র ও হলফনামা জমা দেন। হলফনামায় দেওয়া তথ্যে দুই প্রার্থীর আর্থিক সক্ষমতার এই বিশাল ফারাক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সালাহউদ্দিন আহমদের বিত্তবৈভব ও আয়ের উৎস
বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর হলফনামায় নিজেকে একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ২০২৫-২৬ করবর্ষের আয়-ব্যয়ের বিবরণী (ফরম-২১) অনুযায়ী, তাঁর বার্ষিক আয় ৬ কোটি ২১ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৭ টাকা। এই বিশাল আয়ের বড় একটি অংশ এসেছে জমি বিক্রি বা মূলধনী আয় থেকে, যার পরিমাণ ৫ কোটি ৮০ লাখ ২৭ হাজার ৩১১ টাকা।
এছাড়া কোম্পানির পরিচালক হিসেবে তিনি সম্মানি পেয়েছেন ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। কৃষি খাত থেকে তাঁর আয় ৬ লাখ টাকা, স্থাবর সম্পত্তির ভাড়া বাবদ ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘পেকুয়া লাইভষ্টক ফিশারীজ ফার্ম’ থেকে আয় দেখিয়েছেন ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। আয়ের বিপরীতে তিনি বার্ষিক ব্যয় দেখিয়েছেন ৩৬ লাখ ৬৮ হাজার ৫৫৯ টাকা।
সম্পদের দিক থেকেও বেশ এগিয়ে সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী। সালাহউদ্দিন আহমদের হাতে নগদ অর্থ রয়েছে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৫২ হাজার ৬৭ টাকা। ব্যাংকে জমা আছে ৩৯ লাখ ৪৯ হাজার ৯৯২ টাকা। তাঁর স্থাবর সম্পদের তালিকায় রয়েছে ২৪ দশমিক ৩৬ একর কৃষিজমি এবং ৯ দশমিক ৪৩ একর অকৃষি জমি। তিনি পেকুয়ায় ১২ হাজার ২০৮ বর্গফুটের তিনতলা বিশিষ্ট নিজস্ব বাসভবন, কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে ১৮ হাজার ১৫০ বর্গফুটের ৬ তলা ভবন এবং ঢাকার গুলশানে ৪ হাজার ১৯ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের মালিক। পরিবহনের জন্য তাঁর রয়েছে একটি কার ও দুটি জিপ, যার মোট মূল্য প্রায় ৫৭ লাখ টাকা। স্বর্ণালংকারের ক্ষেত্রে তিনি উপহার হিসেবে পাওয়া ১২ দশমিক ৩ তোলা স্বর্ণের মালিক, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ৮০ হাজার টাকা।
সালাহউদ্দিন আহমদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দায় রয়েছে ৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা, তবে তিনি অন্যদের ঋণ দিয়েছেন ৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য হাসিনা আহমদের সম্পদের বিবরণও হলফনামায় উঠে এসেছে। হাসিনা আহমদের হাতে নগদ রয়েছে ৬ লাখ ৭৯ হাজার ১২৭ টাকা এবং ব্যাংকে জমা ২৬ লাখ ৫ হাজার ৪৩৫ টাকা। শেয়ার বাজারে তাঁর বিনিয়োগের অর্জনকালীন মূল্য ২ কোটি ৫৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৩৭ টাকা, যার বর্তমান বাজারমূল্য ১ কোটি ১০ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এছাড়া তাঁর ব্যবহৃত একটি কার ও একটি জিপের মূল্য প্রায় সাড়ে ৬৫ লাখ টাকা।
আবদুল্লাহ আল ফারুকের আর্থিক চিত্র
অন্যদিকে, সালাহউদ্দিন আহমদের বিপরীতে ভোটযুদ্ধে নামা জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুকের হলফনামায় বেশ সাধারণ আর্থিক চিত্র ফুটে উঠেছে। চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের বাসিন্দা ও কক্সবাজার শহর জামায়াতের আমির আবদুল্লাহ আল ফারুক পেশায় একজন ব্যবসায়ী। প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া এই নেতার মোট সম্পদের পরিমাণ সালাহউদ্দিনের বার্ষিক আয়ের চেয়েও কম।
হলফনামা অনুযায়ী, আবদুল্লাহ আল ফারুকের হাতে নগদ আছে ১০ লাখ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তাঁর জমার পরিমাণ ৭০ হাজার ১৭১ টাকা। এছাড়া ডিপিএসে রয়েছে ১৯ লাখ ২ হাজার ৮৫২ টাকা এবং কোম্পানির শেয়ার রয়েছে ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার। ব্যবসার মূলধন হিসেবে তাঁর বিনিয়োগ ১২ লাখ ৪৮ হাজার ৫৯২ টাকা এবং অংশীদারি ব্যবসায় মূলধন ৪ লাখ ১০ হাজার ৭০৮ টাকা।
স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রে ফারুকের বিবরণ বেশ সীমিত। তাঁর ব্যবহৃত একটি প্রাইভেটকারের দাম দেখানো হয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া ইলেকট্রনিকস ও আসবাবপত্রের মূল্য ধরা হয়েছে ৪০ হাজার টাকা এবং স্বর্ণ রয়েছে ৩ দশমিক ২৭ তোলা, যার মূল্য ৮ হাজার ৭২০ টাকা। সালাহউদ্দিন আহমদের মতো তাঁর কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নেই।
ভোটের মাঠে অভিজ্ঞ বনাম নবীন
অর্থবিত্তের মতো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায়ও সালাহউদ্দিন আহমদ অনেক এগিয়ে। তিনি ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে কক্সবাজার-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমদও এই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অপরদিকে আবদুল্লাহ আল ফারুক এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন।
আগামী দিনের ভোটের রাজনীতিতে এই দুই প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও দলীয় শক্তির পাশাপাশি তাঁদের হলফনামায় উঠে আসা এই আর্থিক চিত্র ভোটারদের মধ্যে কেমন প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।