
নির্বাচনি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের হলফনামা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করার উদ্যোগ নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রার্থীদের ঘোষিত সম্পদ ও দায়দেনার হিসাব মিলিয়ে দেখে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
হলফনামায় প্রার্থীরা নিজেদের এবং দেশে-বিদেশে থাকা তাদের নির্ভরশীলদের সম্পদ ও দায়ের বিস্তারিত তথ্য দিয়ে থাকেন। দীর্ঘ বছর ধরে এসব ঘোষণা কেবল রুটিন কাজ বা কাগজের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই গণ্য হতো, জবাবদিহিতার হাতিয়ার হিসেবে খুব একটা ব্যবহার করা হতো না। তবে এবার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) সাম্প্রতিক সংশোধনীর ফলে দুদকের এই উদ্যোগ বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সংশোধিত আইন অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী ভুল বা মিথ্যা তথ্য দিলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারবে। এমনকি নির্বাচনের পর সংসদ সদস্য হিসেবে পাঁচ বছরের মেয়াদের যে কোনো সময়ে হলফনামায় মিথ্যা তথ্য প্রমাণিত হলে ইসি শুনানির মাধ্যমে তাঁর সদস্যপদ বাতিল করতে পারবে।
দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) ও মুখপাত্র মো. আক্তার হোসেন জানান, কমিশন ইতিমধ্যে প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু করেছে। তিনি বলেন, কোনো হলফনামায় ভুল বা মিথ্যা তথ্য পাওয়া গেলে আমরা দুদক আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। দুদকের গোয়েন্দা ইউনিট বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে এবং প্রার্থীদের হলফনামা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদগুলোও আমরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছি।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, মিথ্যা তথ্য প্রদানকারী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হতে পারে। দুদক আইন-২০০৪ এর ২৭(১) ধারা অনুযায়ী, ঘোষিত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আদালতে সম্পদের উৎস ব্যাখ্যা করতে হবে। এতে ব্যর্থ হলে তিন থেকে দশ বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মকর্তা জানান, দুদকের কোনো সুপারিশ পেলে ইসি তার আইনি এখতিয়ার, অভিযোগের ধরন এবং বিষয়টি আইনের আওতায় পড়ে কিনা তা যাচাই করে বিবেচনা করবে। তবে ইসি স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনো আপত্তি বা অভিযোগ না উঠলে তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হলফনামা যাচাই করবে না। ২০০৮ সালে হলফনামা ব্যবস্থা চালুর পর থেকে এই অবস্থানেই অটল রয়েছে ইসি। হাইকোর্টের নির্দেশনায় ২০০৮ সাল থেকে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় শিক্ষাগত যোগ্যতা, মামলার রেকর্ড এবং নিজেদের ও নির্ভরশীলদের সম্পদ, আয় ও দায়ের বিস্তারিত হলফনামা আকারে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। গত নভেম্বরে আরপিও সংশোধনের মাধ্যমে প্রার্থীদের বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্যও প্রকাশের বিধান যুক্ত করা হয়।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও বর্তমানে বিলুপ্ত নির্বাচনী সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. আব্দুল আলিম বলেন, ২০০৮ সালের পর থেকে ইসি বা দুদক কেউই হলফনামা যাচাই করেনি। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের কমিশনগুলোর এটি এগিয়ে নেওয়ার মতো নেতৃত্ব বা মানসিকতা ছিল না। সত্যি বলতে, নির্বাচন কমিশনের কখনোই এই সাহস ছিল না। তাদের পরিকল্পনায় এমন চিন্তাও ছিল না।
সাবেক একজন নির্বাচন কমিশনারও একই মত পোষণ করে বলেন, ভোটের আগে অল্প সময়ে সম্পদ বিবরণী যাচাই করার সক্ষমতা ইসির নেই, বিশেষ করে বিদেশে থাকা সম্পদের ক্ষেত্রে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর কোনো সরকারি সংস্থা হলফনামা যাচাই করেছে বলে তাঁর জানা নেই।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দুদকের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। তবে এর সুফল সঠিক বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে। তিনি বলেন, যদি ভয়ভীতি বা পক্ষপাতহীনভাবে এটি করা যায়, তবে তা নির্বাচনি রাজনীতির দীর্ঘদিনের অনিয়ম রোধ এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে সহায়তা করবে। তিনি আরও বলেন, তদন্তকারীদের উচিত দাখিলকৃত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা, ঘোষিত আয়ের সঙ্গে প্রকৃত সম্পদের অসামঞ্জস্য খোঁজা এবং প্রয়োজনে সরেজমিনে তদন্ত করা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই কাজে দুদক, ইসি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এনবিআরকে আয়করের তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে হবে যাতে অর্থবহ তুলনা করা যায়। ইসির কাছে এটি প্রার্থীতার বৈধতার প্রশ্ন, এনবিআরের কাছে এটি কর পরিপালনের বিষয় এবং দুদকের কাছে এটি অবৈধ সম্পদের ইস্যু।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের জন্য ২ হাজার ৫৬৯ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে ২ হাজার ৯১ জন দলীয় এবং ৪৭৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। রিটার্নিং কর্মকর্তারা ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত এসব মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করবেন।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাসুদ জানান, ইসি স্বউদ্যোগে হলফনামার তথ্য দুদক বা এনবিআরকে পাঠাবে না, তবে ওই সংস্থাগুলো স্বাধীনভাবে নথি পরীক্ষা করতে পারে। ইসির পক্ষ থেকে এতে কোনো আপত্তি নেই।
দুদকের সুপারিশের বিষয়ে তিনি বলেন, কমিশন প্রথমে নিজেদের আইনি এখতিয়ার ও অভিযোগের ধরন বিবেচনা করবে এবং বিষয়টি আইনের মধ্যে পড়লে ব্যবস্থা নেবে। ইসি কেন নিজে যাচাই করে না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সময়ের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, হাতে মাত্র কয়েকটা দিন সময় থাকে। কোনো আপত্তি না থাকলে তথ্য সঠিক বলে ধরে নেওয়া হয়। প্রার্থীরা যেহেতু জনপ্রতিনিধি হতে চাইছেন, তাই তাঁরা জেনেশুনে সত্য তথ্য দিচ্ছেন বলেই ইসি বিশ্বাস করে, যতক্ষণ না এর বিপরীতে কোনো প্রমাণ মেলে।