
একসময় কর্ণফুলী নদী পারাপার মানেই ছিল এক চরম ভোগান্তি। নড়বড়ে কাঠের পাটাতনই ছিল ভরসা, আর তার ওপর দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পার হতেন পটিয়াসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের আট উপজেলার মানুষ। শুধু স্থানীয়রাই নন, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে যেতে চাওয়া লাখো পর্যটককেও পোহাতে হতো অসহনীয় যানজট আর দীর্ঘ অপেক্ষার যন্ত্রণা। সেই দুর্ভোগের চিত্র আজ ইতিহাস।
খরস্রোতা কর্ণফুলীর বুকে এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ‘শাহ আমানত সেতু’, যা তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু নামেই অধিক পরিচিত। আর এই সেতুর প্রতিটি পিলারে, প্রতিটি লেনে মিশে আছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাম। দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের হৃদয়ে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন এই একটি কারণে—শত বিরোধিতা ও রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেও তিনি এই সেতুর স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং তা বাস্তবায়নের পথ দেখিয়েছিলেন।
গল্পটা শুরু হয়েছিল ২০০১ সালে। দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বেগম খালেদা জিয়া দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের যাতায়াত সহজ করতে একটি স্থায়ী কংক্রিট সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেন। কিন্তু পথটা মসৃণ ছিল না। সে সময় চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও তৎকালীন সিটি মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী এই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেন।
২০০৬ সালে যখন সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিনক্ষণ ঠিক হয়, তখন আওয়ামী লীগ চট্টগ্রামে হরতালের ডাক দেয়। কিন্তু শত বাধা, হরতাল আর রাজনৈতিক উত্তাপ উপেক্ষা করে বেগম খালেদা জিয়া তাঁর সিদ্ধান্তে ছিলেন অটল। কুয়েত সরকারের যৌথ অর্থায়নে ২০০৬ সালের আগস্ট মাসে তিনি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের স্বপ্নের দুয়ার খুলে দেন।
সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে চীনের মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। যদিও কথা ছিল ২০০৯ সালে কাজ শেষ হবে, কিন্তু সংযোগ সড়কের কাজ শেষ করতে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। ২০১০ সালের শেষের দিকে যখন এই সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়, তখন পাল্টে যায় পুরো অঞ্চলের চিত্র। পর্যটন শহর কক্সবাজার আর পার্বত্য জেলা বান্দরবানের সঙ্গে যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
তবে রাজনৈতিক পালাবদলের সাক্ষীও হয় এই সেতু। ২০১০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেতুটি উদ্বোধন করতে এলে ভিত্তিপ্রস্তরের সেই ফলকটি খুলে সেতুর নিচে ফেলে দেওয়া হয়। দীর্ঘ দেড় দশক পর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১ নভেম্বর ফের সেই ফলক সগৌরবে ফিরে পায় তার হারানো স্থান। সেতুর দক্ষিণ মুখে টোল বক্সসংলগ্ন স্থানে বেগম খালেদা জিয়ার নামফলকটি পুনঃস্থাপন যেন ইতিহাসের এক নির্মম সত্যের ফিরে আসা।
এই সেতু ও বেগম খালেদা জিয়ার অবদান নিয়ে আবেগঘন মন্তব্য করেছেন স্থানীয় নেতারা। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ইদ্রিস মিয়া বলেন, মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের চরম বিরোধিতা সত্ত্বেও জনগণের কথা ভেবে বেগম খালেদা জিয়া সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। কুয়েত সরকারের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তিনি এই সেতু উপহার দিয়েছেন। দক্ষিণ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানের মানুষ আজীবন তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।
একই সুরে কথা বলেছেন পটিয়া পৌরসভা যুবদলের আহ্বায়ক আবছার উদ্দীন সোহেল। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া সবসময় জনগণের জন্য রাজনীতি করেছেন, যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই সেতু। আওয়ামী লীগের বিরোধিতার মুখেও তিনি পিছু হটেননি। চট্টগ্রামের উন্নয়নে তিনি ছিলেন এক পরিপূরক শক্তি।
সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক ও সাবেক চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জানান, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিন তাঁরা কর্ণফুলী তৃতীয় সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের ব্যানারে হাজারো নেতাকর্মী নিয়ে মাঠে ছিলেন। সাধারণ মানুষের চাওয়াকে গুরুত্ব দিয়েই বেগম খালেদা জিয়া এই বিশাল কর্মযজ্ঞে হাত দিয়েছিলেন এবং সফলও হয়েছিলেন।
সেতুটি নির্মাণের ফলে মানুষের ভোগান্তি কমলেও টোল আদায় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তৎকালীন কর্ণফুলী থানা বিএনপি ও কর্ণফুলী নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এস এম ফোরকান।
তিনি বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ এই সেতু। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিন বিএনপি সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগের হরতাল প্রতিহত করেছিল।
তবে তিনি অভিযোগ করেন, ৫৯৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেতু থেকে গত ১৫ বছরে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা টোল আদায় হয়েছে। তাই এখন বাণিজ্যিক যানবাহন ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ির টোল মওকুফ করা উচিত।
সদ্য প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া আজ নেই, কিন্তু কর্ণফুলীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই সেতুটি তাঁর দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রতীক হয়ে আছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ যখনই এই সেতু পার হবেন, তখনই অজান্তে একবার হলেও মনে করবেন সেই নেত্রীর কথা, যিনি কাঠের পাটাতন সরিয়ে কংক্রিটের মজবুত ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন।