
বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে গড়িয়ে আসা মাতামুহুরী নদীর পলিমাটি যেন আশীর্বাদ হয়ে ধরা দেয় কক্সবাজারের চকরিয়ার কৃষকদের কাছে। এই পলিমাটির জাদুতে এখানকার জমির উর্বরতা শক্তি বেড়ে যায় বহুগুণ, যেখানে বছরে দুই থেকে তিনবার ফসল ফলানো কোনো বিস্ময় নয়। ধান আর রকমারি সবজির জন্য খ্যাত এই জনপদে একসময় তরমুজ চাষের বেশ নামডাক ছিল। কিন্তু আবহাওয়ার বৈরী আচরণ আর ভেজাল বীজের দাপটে সেই ঐতিহ্য প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। কৃষকরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন অনিশ্চিত এই আবাদ থেকে। তবে হতাশার সেই মেঘ কেটে এখন চকরিয়ার মাঠে মাঠে ফের সবুজের সমারোহ, আর সেই সবুজের আড়ালে উঁকি দিচ্ছে কৃষকের লালরঙা স্বপ্ন।
দীর্ঘদিন পর চকরিয়ার উর্বর মাটিতে তরমুজ চাষে নতুন বিপ্লব ঘটিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। আর এই ফিরে আসার গল্পে নেপথ্য নায়ক হিসেবে কাজ করছে সরকারি নিবন্ধনভুক্ত বীজ বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান ‘শহীদ এগ্রো সীড্ ফার্ম’। তাদের বাজারজাত করা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বীজ গবেষণা ইনস্টিটিউট স্বীকৃত হাইব্রিড জাতের তরমুজ ‘এশিয়াপ্লাস’ কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। মাত্র ৬৫ দিনের ব্যবধানে একেকটি তরমুজ ৬ থেকে ৮ কেজি ওজনের হওয়ায় কৃষকের মুখে এখন চওড়া হাসি।
চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের কামালউদ্দিন মাস্টারঘাটা এলাকায় মাতামুহুরী নদী লাগোয়া জমিতে গিয়ে দেখা যায় এক আশাজাগানিয়া দৃশ্য। সেখানে ৬ কানি জমিতে এশিয়াপ্লাস জাতের তরমুজ চাষ করেছেন কৃষক নুরুল কবির। তিনি জানান, নভেম্বর মাসের শুরুতে তিনি চারা রোপণ করেছিলেন। জমি লাগিয়ত, সেচ খরচ ও শ্রমিক মজুরি মিলিয়ে তাঁর প্রায় এক লাখ টাকার মতো খরচ হবে। বর্তমানে তিনি ক্ষেতের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। নুরুল কবির আশাবাদী কণ্ঠে বলেন, আর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই ফলন পাওয়া শুরু হবে। মৌসুম শেষে এই জমি থেকে তিনি ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন।
নুরুল কবিরের এই সাফল্য দেখে উৎসাহিত হয়েছেন আশপাশের অনেকেই। শুধু সমতল নয়, পাহাড়ি জনপদেও ছড়িয়ে পড়েছে এই চাষ। পাশের উপজেলা লামার ইয়াংছা এলাকায় দুই কানি পাহাড়ি জমিতে এশিয়াপ্লাস জাতের তরমুজ চাষ করেছেন চাষি আবদুস সালাম মেম্বার। তিনি জানান, অক্টোবর মাসে চারা রোপণের পর মাত্র তিন মাসের মাথায় প্রতিটি গাছে এখন ভালো ফলন দেখা যাচ্ছে।
একই চিত্র দেখা গেছে নাইক্ষংছড়ি সীমান্তের কুতুপালং এলাকাতেও। সেখানকার চাষি মাহাবুব আলম জানান, তিনি অক্টোবর মাসের শুরুতে তিন কানি জমিতে ১৭৫০টি এশিয়াপ্লাস জাতের তরমুজ চারা রোপণ করেছিলেন, যার মধ্যে ১৭০০ চারা সুস্থভাবে বেড়ে উঠেছে। শুরু থেকে এ পর্যন্ত তাঁর খরচ হয়েছে ৮০ হাজার টাকা, যা মৌসুম শেষে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় দাঁড়াতে পারে। প্রতিটি গাছে তিন থেকে চারটি করে ফলন এসেছে। মাহাবুব আলম আশা করছেন, ক্ষেতের তরমুজ বিক্রি করে তিনি সাড়ে ৩ লাখ টাকার বেশি আয় করতে পারবেন, যা তাঁর জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক সাফল্য।
শহীদ এগ্রোসীড ফার্মের চকরিয়া উপজেলা ব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান বলেন, চকরিয়ার কৃষকরা হাইব্রিড জাতের এশিয়াপ্লাস তরমুজ চাষ করে ভালো ফলন পেতে শুরু করায় এখন লামার ইয়াংছা ও নাইক্ষংছড়ির মতো এলাকাগুলোতেও এই চাষ ছড়িয়ে পড়েছে। কৃষকদের এই আগ্রহ আমাদের অনুপ্রাণিত করছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম জানান, এশিয়াপ্লাস একটি উন্নত জাতের তরমুজ, যা রোগ সহনশীল এবং যেকোনো আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। তিনি বলেন, আমরা কৃষকদের স্বার্থ ও ভালো ফলনের বিষয়টিকে সবসময় অগ্রাধিকার দিই। দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় ধরে আমরা প্রান্তিক কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করছি। এশিয়াপ্লাস জাতের তরমুজ আকারে বড়, স্বাদে মিষ্টি এবং ৬৫ দিনেই ফলন আসে বলে এটি কৃষকদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক। ভালো বীজ আর কৃষকের পরিশ্রমে যে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়, চকরিয়ার তরমুজ বিপ্লব তার প্রমাণ।
মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের তদারকিও এই সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখছে। চকরিয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি অফিসার (হিসাব ও উন্নয়ন) মো. আরিফুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলার কয়েকটি এলাকায় প্রায় ১৯ একর বা সাড়ে সাত হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। কোনো ধরনের অসঙ্গতি দেখা দিলে তাঁরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
সার্বিক বিষয়ে চকরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহনাজ ফেরদৌসী বলেন, চলতি মৌসুমে সাড়ে সাত হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে এবং শুরু থেকেই কৃষি বিভাগ চাষিদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করছেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এ বছর ভালো ফলন ও লাভ দেখে আগামীতে চকরিয়া উপজেলায় তরমুজ চাষের পরিধি আরও অনেক বাড়বে। মাতামুহুরীর তীরে এভাবেই কৃষকের শ্রমে আর আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ফের প্রাণ ফিরে পাচ্ছে একসময়ের হারিয়ে যাওয়া তরমুজ চাষ।