
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্ব পালনকালে আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর হাসান মোহাম্মদকে ধাওয়া দিয়ে শারীরিক হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সামনে চাকসুর চার নেতার নেতৃত্বে ওই শিক্ষককে পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে তাড়া করে টেনেহিঁচড়ে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অবরুদ্ধ অবস্থায় তাঁর মুঠোফোনেও তল্লাশি চালানো হয়।
হেনস্তার শিকার হাসান মোহাম্মদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী ও বামপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন হলুদ দলের একাংশের সঙ্গে যুক্ত। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরের দিকে চাকসু নেতাদের তোপের মুখে তিনি কেন্দ্র থেকে পালানোর চেষ্টা করলে তাঁকে ধাওয়া করা হয়। ঘটনার একটি ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ১ মিনিট ৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ছাত্র শিক্ষক হাসান মোহাম্মদকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং একজন তাঁকে পেছন থেকে জাপটে ধরে রেখেছেন।
ভিডিওতে চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি ও নির্বাহী সদস্য সোহানুর রহমানকে দেখা গেছে। এ সময় শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ চিৎকার করছিলেন। পরে ওই অবস্থায় তাঁকে একটি অটোরিকশায় তুলে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রক্টর অফিসে অবরুদ্ধ অবস্থায় ঘটনার বিবরণ দিয়ে সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ বলেন, পরীক্ষার কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করার সময় শিক্ষক ও কর্মচারীরা তাঁকে জানান যে পরিস্থিতি ভালো নয়। এরপর তিনি কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসেন। তখন চাকসু নেতারা চিৎকার-চেঁচামেচি করলে তিনি ভয়ে দৌড় দেন। এরপরও তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি এবং তাঁর বিরুদ্ধে ‘মব’ তৈরি করা হয়েছে। তিনি জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা করার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আমি এক দিনের জন্যও বের হইনি, কোনো দায়িত্বেও ছিলাম না। এমনকি শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করে এমন কোনো বোর্ডের সদস্যও ছিলাম না। সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আমি কাউকে মামলাও দিইনি।
তবে শিক্ষকের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন চাকসু নেতারা। চাকসুর আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি শিক্ষককে হেনস্তার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, হাসান মোহাম্মদ সহকারী প্রক্টরের দায়িত্বে থাকাকালীন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও তিনি সরাসরি গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনের তদন্ত চলছিল। তদন্ত চলাকালে কেন একজন অভিযুক্ত শিক্ষক পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন করছেন—এ বিষয়ে জানতে আমরা আইন অনুষদের ডিনের সঙ্গে কথা বলতে যাই। আমাদের উপস্থিতির খবর পেয়ে ওই শিক্ষক পালানোর চেষ্টা করেন এবং গাছের গুঁড়িতে আঘাত পেয়ে পড়ে যান।
একই দাবি করেন চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান। তিনি বলেন, তাঁকে কোনোভাবেই মারা হয়নি। তিনি আইন অনুষদের গ্যালারির পেছন দিয়ে দৌড়ানোর সময় ব্যথা পেয়েছেন।
এদিকে অভিযুক্ত শিক্ষকের পরীক্ষার দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার সমন্বয়কারী মো. ইকবাল শাহীন খান বলেন, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা তদন্ত চলাকালীন তিনি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। যতক্ষণ পর্যন্ত সিন্ডিকেট থেকে শিক্ষককে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি আমাদের কাছে শিক্ষক। এ কারণেই তাঁকে পরীক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
বিপরীত বক্তব্য দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী তাঁর বেতনও বন্ধ রয়েছে। এই অবস্থায় কীভাবে তিনি পরীক্ষার দায়িত্ব পেলেন, তা আমি বলতে পারছি না।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, হট্টগোলের খবর শুনে আমরা তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে গিয়েছি। আমরা এই মুহূর্তে শিক্ষক হাসান মোহাম্মদের মুঠোফোন তল্লাশি করছি এবং সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখছি। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।