শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

কে জানত, ফেরার পথই হবে তাদের শেষ যাত্রা?

এস এম আক্কাছ | প্রকাশিতঃ ১০ জানুয়ারী ২০২৬ | ৮:৫৫ অপরাহ্ন


প্রবাসজীবনের হাড়ভাঙা খাটুনির মাঝে খানিকটা স্বস্তির খোঁজেই সপরিবারে ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন তারা। গন্তব্য ছিল পাহাড় আর সাগরের মেলবন্ধন—সালালাহ। জিয়ারত ও ভ্রমণ শেষে প্রশান্ত মন নিয়ে ফিরছিলেন আপন নীড়ে। কিন্তু কে জানত, সেই ফেরার পথই হবে তাদের অনন্তকালের যাত্রা?

ওমানের তপ্ত মরুভূমির পিচঢালা পথেই ঝরল একটি পরিবারের তিনটি তাজা প্রাণ। শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত সাড়ে আটটার দিকে সালালাহ থেকে মাস্কাট ফেরার পথে থামরাইত এলাকায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার বাসিন্দা মা, ছেলে ও জামাতা। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন পরিবারের আরও তিন সদস্য।

নিহতরা হলেন—ফটিকছড়ি উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের ছোট ছিলোনিয়া গ্রামের ওমানপ্রবাসী মো. শফিউর আলমের স্ত্রী বিলকিস আক্তার, তাঁদের একমাত্র ছেলে মুহাম্মদ সাকিবুল হাসান (সবুজ) এবং বিলকিস আক্তারের মেয়ের জামাই হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা মুহাম্মদ দিদার।

জানা যায়, নিহত সাকিবুল হাসান সবুজ তিন দিন আগে মা, স্ত্রী, সন্তান ও বোন-জামাইকে নিয়ে মাস্কাট থেকে সালালাহ ভ্রমণে গিয়েছিলেন। আনন্দ ভ্রমণ শেষে শুক্রবার ফেরার পথে হঠাৎ করেই তাদের চলন্ত গাড়ির সামনে চলে আসে বিশাল আকৃতির একটি উট। চালকের আসনে থাকা সবুজ কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়িটি উটের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং সড়ক থেকে ছিটকে পড়ে। মুহূর্তেই দুমড়ে-মুচড়ে যায় গাড়িটি, আর সেই সঙ্গে চুরমার হয়ে যায় একটি সাজানো সংসার। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান মা, ছেলে ও জামাতা।

মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় সবুজের স্ত্রী রিতা আক্তারসহ তাঁর সন্তান ও বোন গুরুতর আহত হলেও বর্তমানে তারা শঙ্কামুক্ত। শরীরের ক্ষত হয়তো শুকিয়ে যাবে, কিন্তু চোখের সামনে প্রিয়জনদের হারানোর যে ক্ষত হৃদয়ে তৈরি হলো, তা কি কোনোদিন মুছবে?

সবুজের বন্ধু ওমানপ্রবাসী রবিউল হোসাইন পারভেজ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ওমানের হামেরিয়াতে বাবা শফিউর আলমের সঙ্গে সপরিবারে বসবাস করছিলেন সবুজ। ফটিকছড়ির এই পরিবারটি ওমানপ্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় ছিল। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ওমানজুড়ে প্রবাসীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মরদেহগুলো বর্তমানে সালালাহর একটি হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।’

নিহতের স্বজনরা জানান, মরুর দেশের এই মরীচিকা যে এভাবে একটি সাজানো বাগান তছনছ করে দেবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। ওমানের দীর্ঘ ও নির্জন সড়কে উটের অবাধ বিচরণ অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। ফটিকছড়ির এই পরিবারটি যেন সেই নিষ্ঠুর বাস্তবতারই সর্বশেষ শিকার।

বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দেশে আনার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু কফিনে মোড়ানো দেহগুলো যখন ফিরবে, তখন কি আর সেই হাসিমুখগুলো দেখা যাবে? সালালাহর পথে সেই উটের ধাক্কা কেবল একটি গাড়িকেই চুরমার করেনি, ধ্বংস করে দিয়েছে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, রেখে গেছে শুধুই দীর্ঘশ্বাস।