শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

আনোয়ারায় সরকারি টাকা লুটের ‘খোলামেলা’ স্বীকারোক্তি

উন্নয়নের ‘এক-তৃতীয়াংশ’ গিলে খেলেন সচিব ও মেম্বাররা
জিন্নাত আয়ুব | প্রকাশিতঃ ১১ জানুয়ারী ২০২৬ | ৮:০০ অপরাহ্ন

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার বরাদ্দ দেয়, কিন্তু সেই অর্থের কতটুকু শেষ পর্যন্ত মাটিতে গড়ায়— তা নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। এবার চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বরুমচড়া ইউনিয়ন পরিষদে সেই প্রশ্নের উত্তর মিলল বেশ নগ্নভাবে। সেখানে ‘ওয়ান পার্সেন্ট’ বরাদ্দের ছয় লাখ টাকার দুটি প্রকল্প থেকে এক-তৃতীয়াংশ অর্থ অর্থাৎ দুই লাখ টাকাই প্রকাশ্য ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ইউপি সচিব ও তিন সদস্যের বিরুদ্ধে। মজার বিষয় হলো, অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিরা দুর্নীতির বিষয়টি অস্বীকার না করে বরং একে ‘মিটমাট’ এবং ‘বাকি টাকা ভাগ করে নেওয়ার’ কথা অকপটে স্বীকারও করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বরুমচড়া ইউনিয়নে সম্প্রতি দুটি পৃথক প্রকল্পের জন্য তিন লাখ টাকা করে মোট ছয় লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে একটি প্রকল্পের সভাপতি ইউপি সদস্য মোহাম্মদ শরীফ এবং অপরটির সভাপতি সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য রুমা আকতার। অভিযোগ উঠেছে, ব্যাংকের চেক ভাঙানোর সঙ্গে সঙ্গেই ইউপি সচিব পরিতোষ সেন গুপ্ত ‘অফিস খরচ’ ও ‘বিবিধ ব্যয়ের’ অজুহাতে প্রতিটি প্রকল্প থেকে নগদ এক লাখ টাকা করে মোট দুই লাখ টাকা কেটে রেখে দেন। অর্থাৎ, প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগেই বরাদ্দের ৩৩ শতাংশ অর্থ লোপাট হয়ে যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিষদেরই এক সদস্য জানান, ইউপি সদস্য মোহাম্মদ শরীফ রাস্তা নির্মাণের জন্য ৩ লাখ টাকার চেক উত্তোলন করতে গেলে প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) সেখান থেকে ১ লাখ টাকা রেখে দেন। একইভাবে নারী সদস্য রুমা আকতার পরিষদের আসবাবপত্র ক্রয়ের জন্য ৩ লাখ টাকা তুললে, সেখান থেকেও ১ লাখ টাকা কেটে রাখা হয়। আসবাবপত্র কেনার জন্য রুমা আকতার বাকি ২ লাখ টাকা তুলে দেন আরেক ইউপি সদস্য এরফান আলীর হাতে।

সরকারি টাকার এমন প্রকাশ্য লুটপাটের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্তরা বিস্ময়করভাবে তা স্বীকার করে নেন। সংরক্ষিত নারী সদস্য রুমা আকতার বলেন, আসবাবপত্র কেনার তিন লাখ টাকার প্রকল্পের মধ্যে আমি দুই লাখ টাকা কেনাকাটার জন্য এরফান মেম্বারকে দিয়েছি। বাকি এক লাখ টাকা সচিব রেখে দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে আমরা এটার হিসাব নেব এবং বাকি যা থাকে, তা আমরা ভাগ করে নেব।

অন্যদিকে ইউপি সদস্য মোহাম্মদ শরীফ দাবি করেন, তার তিন লাখ টাকার রাস্তার কাজ শেষ। সচিব টাকা কেটে রেখেছেন কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা কোনো সমস্যা নয়, আমরা নিজেদের মধ্যে ‘মিটমাট’ করে নিয়েছি। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানেন কি না প্রশ্ন করা হলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

আসবাবপত্র কেনাকাটার দায়িত্ব পাওয়া ইউপি সদস্য এরফান আলীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে দুর্নীতির বিষয়টি অস্বীকার করেন। তবে রুমা আকতারের প্রকল্প থেকে দুই লাখ টাকা নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি সুর নরম করেন। এরফান আলী তখন বলেন, আসলে এসব বিষয়ে আমি জানি না, আমাকে ডেকে দেওয়া হয়েছে। এখন কেন করছি…। একপর্যায়ে তিনি প্রতিবেদককে ‘ম্যানেজ’ করার সুরে বলেন, আপনাকে তো আমি চিনি, আমাদের একটু দেখতে হবে।

লুটপাটের অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা ইউপি সচিব পরিতোষ সেন গুপ্তের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, আপনাকে এসব বিষয় কে বলেছে? যেই দুই মেম্বারের প্রকল্প, তাদের কাছ থেকেই জিজ্ঞেস করেন। যখন তাকে জানানো হয় যে মেম্বাররা বিষয়টি স্বীকার করেছেন, তখন তিনি এখন আর কী করতে পারি বলে ফোন কেটে দেন।

সরকারি অর্থের এমন হরিলুটের বিষয়ে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আকতারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, অভিযোগটি যাচাই-বাছাই করা হবে। তদন্ত সাপেক্ষে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।