শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র: কঠোর নিরাপত্তার ভেতরেই বারবার আগুন, নেপথ্যে ‘চোর সিন্ডিকেট’?

ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ | প্রকাশিতঃ ১৩ জানুয়ারী ২০২৬ | ৫:২২ অপরাহ্ন


কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে ঘেরা দেশের বৃহত্তম মেগা প্রকল্প মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কেবল নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি প্রকল্পের নড়বড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে। গত ১২ জানুয়ারি রাতের এই অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসকর্মীদের প্রায় আট ঘণ্টা লড়াই করতে হয়েছে। তবে আগুনের লেলিহান শিখা নিভলেও ধোঁয়াশা কাটছে না আগুনের সূত্রপাত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে। কর্তৃপক্ষ দায় চাপাচ্ছে ‘চোরদের’ ওপর, আর স্থানীয় ও সংশ্লিষ্টরা দুষছেন খোদ নিরাপত্তা কর্মীদের।

ঘটনার সূত্রপাত সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ৯টার দিকে প্রকল্পের টাউনশিপ এলাকার স্ক্র্যাব ইয়ার্ডে। খবর পেয়ে চকরিয়া ও মহেশখালী থেকে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, দীর্ঘ আট ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর চেষ্টার পর সোমবার সকালের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তিনি নিজে উপস্থিত থেকে পুরো অভিযান পর্যবেক্ষণ করেছেন।

কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনায় কীভাবে আগুন লাগল, তা নিয়ে খোদ প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যাই সন্দেহের উদ্রেক করেছে। কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেডের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, স্থানীয় চোর চক্রের সদস্যরা স্ক্র্যাব ইয়ার্ডে আগুন দিয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে এই দাবি ধোপে টিকছে না।

মহেশখালীর বাসিন্দা মুহাম্মদ মুরশেদ প্রশ্ন তোলেন, যেখানে প্রকল্পে প্রবেশ করতে একজন সাধারণ মানুষকে দুই থেকে তিন স্তরের কড়া নিরাপত্তা চেক পেরোতে হয়, সেখানে চোর কীভাবে অনায়াসে ভেতরে ঢুকে আগুন লাগাতে পারে? তাঁর মতে, দেশের এমন একটি স্পর্শকাতর স্থাপনায় নিয়মিত চুরির ঘটনা এবং বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ প্রমাণ করে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ।

স্থানীয় সূত্র ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রকল্পের একাধিক কর্মীর অভিযোগ আরও গুরুতর। তাঁদের দাবি, প্রকল্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের একটি বড় অংশই স্থানীয় চোরাই সিন্ডিকেটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সোমবার রাতে যখন আগুনের সূত্রপাত হয়, তখন নিরাপত্তা কর্মীরা চোরাই কাজে ব্যস্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যে কারণে আগুনের বিষয়টি তাঁরা শুরুতে টের পাননি। স্থানীয়দের ভাষায়, প্রকল্পের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের নিরাপত্তা কর্মী—অনেকের বিরুদ্ধে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করা দমকল কর্মীরাও কর্তৃপক্ষের ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। মহেশখালী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তা সালাহ উদ্দীন জানান, কোল পাওয়ার কর্তৃপক্ষ চোরদের দায়ী করলেও ঘটনাস্থলে বহিরাগতদের আগুন দেওয়ার মতো কোনো আলামত তারা পাননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক দমকল কর্মী বলেন, যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় যে বাইরের লোক আগুন দিয়েছে, তবে প্রশ্ন জাগে—ভেতরের নিরাপত্তা কর্মীরা তখন কী করছিলেন? তাঁর মতে, নিরাপত্তা রক্ষীদের যোগসাজশ ছাড়া এত কঠোর নিরাপত্তা ভেদ করা অসম্ভব।

এটি মাতারবাড়ী প্রকল্পে প্রথম অগ্নিকাণ্ড নয়। এর আগে ২০২৩ সালের ৮ জুলাই একই স্থানে ভয়াবহ আগুন লেগেছিল, যা নেভাতে ১৪ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। সেই ঘটনায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তা নিয়ে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড আজও কোনো স্পষ্ট তথ্য দেয়নি। এবারও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটি কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি। বরং তারা দাবি করছে, এ ধরনের ঘটনা মাঝে মধ্যেই ঘটে এবং এতে তাদের কোনো ক্ষতি হয়নি। কর্তৃপক্ষের এমন নির্লিপ্ত বক্তব্যকে ‘দায় এড়ানোর কৌশল’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

দমকল কর্মীদের শঙ্কা, এবার আগুন পরিত্যক্ত স্ক্র্যাব মালামালে সীমাবদ্ধ থাকলেও, তা যদি প্রকল্পের মূল প্লান্টে ছড়িয়ে পড়ত, তবে পুরো মহেশখালীসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ত। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন এবং কর্মকর্তা সালাহ উদ্দীন উভয়ের কথাতেই উঠে এসেছে কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতা ও অস্পষ্টতার চিত্র।

সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নীরবতা। ঘটনার পর থেকে প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী মুহাম্মদ সাইফুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম এই স্তম্ভে বারবার আগুন, নিয়মিত চুরির অভিযোগ এবং কর্তৃপক্ষের এমন রহস্যজনক নীরবতা পুরো প্রকল্পের সুরক্ষা ব্যবস্থাকেই এখন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।