
সাধারণত সাগরের নোনা পানি জমিতে আটকে লবণ উৎপাদন করা হয়। তবে চট্টগ্রামের পটিয়ায় প্রচলিত এই পদ্ধতির বাইরে গিয়ে এক ভিন্ন নজির স্থাপন করেছেন ভ্রাম্যমাণ লবণ চাষিরা। উপজেলার ইন্দ্রপুল শিল্প এলাকায় লবণ কারখানার পরিত্যক্ত বা বর্জ্য পানি ব্যবহার করে তারা উৎপাদন করছেন হাজার হাজার টন লবণ।
গত এক যুগ ধরে ইন্দ্রপুল এলাকার প্রায় ১০০ একর জমিতে এই পদ্ধতিতে লবণ চাষ হচ্ছে। পলিথিন ট্রে ব্যবহার করে কারখানার পরিত্যক্ত ও খালের মিষ্টি পানির মিশ্রণে বছরে এখানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার টন লবণ। যার বাজারমূল্য কোটি টাকার উপরে।
এই লবণ খাওয়ার উপযোগী না হলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হ্যাচারি, শিল্পকারখানা, মাছ ও চামড়া সংরক্ষণে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই গড়ে ওঠা এই খাত স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পটিয়া ইন্দ্রপুল এলাকায় প্রায় অর্ধশতাধিক লবণ মিল রয়েছে। মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও টেকনাফ থেকে অপরিশোধিত লবণ এনে এখানে ভোজ্য লবণ উৎপাদন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় মিলগুলো থেকে প্রচুর লোনা পানি নির্গত হয়। ভ্রাম্যমাণ চাষিরা এই পরিত্যক্ত পানি একটি পুকুরে জমা করেন। এরপর খালের মিষ্টি পানির সঙ্গে মিশিয়ে খোলা জমিতে পলিথিন ট্রেতে শুকিয়ে লবণ উৎপাদন করেন। বছরের কার্তিক থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত—এই সাত-আট মাস চলে উৎপাদন।

মো. জাহাঙ্গীর নামের এক ভ্রাম্যমাণ লবণ চাষি জানান, তিনি ২০ বছর ধরে লবণ মিলে চাকরির পাশাপাশি এই পদ্ধতিতে লবণ চাষ করছেন। এবার তিনি ১৬ বিঘা জমিতে চাষ করেছেন। তিনি বলেন, “প্রতি একর জমিতে একশ মণ লবণ উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে আমরা লবণ সংগ্রহ করি। শ্রমিকদের বেতন বেশি হওয়ায় লাভ কিছুটা কম, তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।”
উৎপাদিত এই লবণের ব্যবহার সম্পর্কে পটিয়া লবণ মিল মালিক সমিতির (ভারপ্রাপ্ত) সভাপতি জসিম উদ্দীন বলেন, “পরিত্যক্ত পানি দিয়ে উৎপাদিত লবণ মূলত শিল্পকারখানা, মাছের খামার ও চামড়া সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। এটি পরিবেশের জন্যও উপকারী। কারণ, মিলের লোনা পানি সরাসরি খালে পড়লে পানি দূষিত হতো এবং জমি চাষাবাদের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ত। এখন সেই পানি কাজে লাগিয়ে লবণ উৎপাদন হওয়ায় পরিবেশ রক্ষা পাচ্ছে।”
তবে এই সম্ভাবনাময় খাতের কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মিল মালিক অভিযোগ করেন, “উৎপাদিত এই লবণ খাওয়ার উপযোগী নয়। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মিল মালিকদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ভোজ্য লবণের সঙ্গে এই লবণ মিশিয়ে বাজারজাত করছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।”
পটিয়া বিসিক শিল্প নগরীর কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র সানা বলেন, “ইন্দ্রপুল এলাকায় কারখানার পরিত্যক্ত পানি দিয়ে বছরে প্রায় ১০ হাজার টন লবণ উৎপাদন হচ্ছে, যা এই অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। খাবারের কাজে না লাগলেও শিল্পখাতে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। তবে এসব ভ্রাম্যমাণ চাষি এখনো সরকারি প্রশিক্ষণের আওতার বাইরে।”
সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং যথাযথ তদারকি থাকলে এই খাত থেকে লবণ উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।