শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২

বাংলাদেশের একটি পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়!

একুশে প্রতিবেদক | প্রকাশিতঃ ১৬ জানুয়ারী ২০২৬ | ৯:১১ অপরাহ্ন


চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) যেন এখন এক ‘পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়’। উপাচার্য, উপ-উপাচার্য থেকে শুরু করে ডিন-প্রভোস্ট—প্রভাবশালী পদে থাকলেই নিজের সন্তান, ভাই-বোন বা নিকটাত্মীয়কে চাকরি দেওয়া এক অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে এখানে। যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক, ‘গায়ের জোরে’ বা নিয়ম শিথিল করে স্বজনদের পুনর্বাসনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

সম্প্রতি বর্তমান উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) শামীম উদ্দিন খানের কন্যা মাহিরা শামীমের নিয়োগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। যদিও নথিপত্রে দেখা গেছে, মাহিরা শামীমের অনার্স ও মাস্টার্সে সিজিপিএ যথাক্রমে ৩.৮০ ও ৩.৭৮, যা আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা (৩.৭৫) পূরণ করে। ফলে নিয়োগ বোর্ড তাকে সুপারিশ করে। কিন্তু অতীতের বিভিন্ন প্রশাসনের নিয়োগ পর্যালোচনায় দেখা যায়, উপাচার্যরা তাদের সন্তান, ভাইপো, শ্যালক, এমনকি নাতি-পুতিদেরও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়েছেন।

উপাচার্য আরিফের ‘শাসনকাল’ ও আত্মীয়করণের রেকর্ড

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিম আরিফের মেয়াদে ব্যাপক আত্মীয়করণের অভিযোগ রয়েছে। তার ছেলে ইফতেখার আরিফকে প্রথমে কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই চবি স্কুল অ্যান্ড কলেজে অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইইআর) চালু করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, শুরুতে ইউজিসিকে এই ইনস্টিটিউটে বাড়তি লোকবল ও বাজেটের প্রয়োজন নেই জানানো হলেও, পরে নিজের ছেলেসহ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১৭ জন শিক্ষককে সেখানে আত্তীকরণ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত করে এবং পরবর্তীতে ওই ১৭ শিক্ষককে স্কুলে ফেরত পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পরবর্তী সময়ে উপাচার্য ড. শিরীণ আখতারের প্রশাসনের সময় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইফতেখার আরিফ নিজের পদ ফিরে পান এবং বর্তমানে তিনি অধ্যাপক পদে কর্মরত। ওই ইনস্টিটিউটে ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. জহুরুল আলমের স্ত্রী নাসিমা পারভিন এবং তৎকালীন শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আবুল মনসুরের স্ত্রী ও ভাগনিকেও নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়াও আনোয়ারুল আজিম আরিফ তার তিন শ্যালিকা—ইশরাত শামীম, ইশরাত জাহান, শাহনাজ পারভীন এবং ছেলের বউ ডালিয়া চৌধুরীকে সরাসরি সেকশন অফিসার পদে নিয়োগ দেন, যারা বর্তমানে ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে কর্মরত। তার ভাইয়ের ছেলে আতাউর রহমান গণিত বিভাগের সেকশন অফিসার এবং নাতি একে আজাদুল হকও সেকশন অফিসার হিসেবে নিয়োগ পান।

তার মেয়াদে সমাজবিজ্ঞান অনুষদে এক সিন্ডিকেটেই ৪৭ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আবেদনের যোগ্যতা কমিয়ে (সিজিপিএ ৩.০০) তাদের নিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া হয়, যা পরবর্তী সিন্ডিকেটেই আবার বাড়িয়ে ৩.৫৫ করা হয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে আনোয়ারুল আজিম আরিফ দাবি করেন যে—যোগ্য কর্মকর্তার সংকট এবং প্রশাসনিক বিশ্বস্ততার প্রয়োজনেই এসব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

অন্যান্য উপাচার্যদের সময়কার চিত্র

সাবেক উপাচার্য ড. আলাউদ্দিনের মাত্র এক বছরের মেয়াদেও আত্মীয়করণের নজির দেখা যায়। তার জামাতা সাইদুল ইসলাম সোহেল বর্তমানে বায়োক্যামিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজির প্রফেসর। এছাড়া তার ভাইয়ের দুই ছেলে মজনু মিয়া ও নজরুল ইসলাম, বড় ছেলের স্ত্রী সোনিয়া ইসলাম লিজা (উপ-হিসাব নিয়ামক), শ্যালক হাফিজুর রহমান (স্পোর্টস সায়েন্স) এবং দুই ভাগিনাকে (ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি ও একাডেমিক শাখায়) চাকরি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর সময়ে স্থানীয় এবং দলীয় বিবেচনায় শতাধিক কর্মচারী অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ পায়। তার সময়ে সাবেক সহকর্মীদের সন্তানদের নিয়োগের বিষয়টিও আলোচনায় ছিল। রসায়ন বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মনির উদ্দিনের মেয়ে ও জামাতাকে যথাক্রমে ফার্মেসি এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. নিজামুদ্দিনের মেয়ে নিশাত আফরোজ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে নিয়োগ পান। যদিও তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন, সিন্ডিকেট ও ইউজিসির অনুমোদনের বাইরে কোনো নিয়োগ তার সময়ে হয়নি। একইসঙ্গে, নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং তা প্রমাণের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর পর উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারের ‘শাসনামলে’ও নিয়োগ নিয়ে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। স্থায়ী পদের তোয়াক্কা না করে তিনি দৈনিক ভিত্তিতে শত শত লোক নিয়োগ দেন, যা কার্যত বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি ‘নিয়োগের হাটে’ পরিণত করেছিল বলে সমালোচকরা মনে করেন। এই প্রক্রিয়ায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মী থেকে শুরু করে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের স্বজনদের পুনর্বাসিত করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ওই সময়ে সহকারী প্রক্টরের দায়িত্বে থাকা মোরশেদুল ইসলামের ভাই এবং প্রক্টর নুরুল আজিম শিকদারের ভাগিনাকে চাকরি দেওয়ার বিষয়টি তখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তবে অপরিকল্পিতভাবে নিয়োগ পাওয়া এই কর্মীদের বড় একটি অংশ উপাচার্যের বিদায়ের পর কর্মহীন হয়ে পড়েন।

এর আগে সাবেক উপাচার্য ড. বদিউল আলমের সময়েও তার আত্মীয়দের একটি বড় অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পায়। তার ভাইপো ইমতিয়াজ আলম ও মোরশেদ আলম বর্তমানে ডেপুটি রেজিস্ট্রার। উপ-উপাচার্য থাকাকালীন তিনি তার ভাই মাহবুব হারুণকে চাকরি দেন। এছাড়া তার একাধিক ভাগিনা ও শ্যালিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত। তার জামাতা আফজাল হোসেন মনোবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান।

সাবেক উপাচার্য ড. আবু ইউসুফ এবং ড. আব্দুল করিমের সময়েও তাদের ভাগিনা ও আত্মীয়দের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ড. আব্দুল করিমের ভাগিনা সিদ্দিক আহমদ চৌধুরী রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর, তার আত্মীয়রাও পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পান।

শিক্ষকদের আত্মীয়করণের চিত্র

উপাচার্যদের বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের সন্তানদের নিয়োগের তালিকা বেশ দীর্ঘ। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিক আহমেদের দুই কন্যা—ড. সালমা বিনতে শফিক (ইতিহাস) ও ড. আসমা বিনতে শফিক (আইন) শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোক্তারের পুত্রবধূ ও তার বোন যথাক্রমে ফার্মেসি ও প্রাণরসায়ন বিভাগে কর্মরত।

এছাড়া ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেনের স্ত্রী ও ভাই, দর্শন বিভাগের শফিকুল ইসলামের তিন কন্যা, পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নুরুল ইসলামের দুই কন্যা এবং রসায়ন বিভাগের সাবেক সভাপতির জামাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ড. হাসান মোহাম্মদের সন্তান এবং সাবেক উপাচার্য ড. এজেএম নুরুদ্দিন চৌধুরীর ভাগনিও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

এসব নিয়োগের অনেকগুলোতে প্রার্থীদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকলেও, দীর্ঘদিনের এই চর্চা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ করছে কি না, তা নিয়ে শিক্ষাবিদ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েই গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদক চট্টগ্রামের এক সহকারী পরিচালক বলেন, ‘চবিতে নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম বহু বছর ধরে চলে আসছে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’