
অবশেষে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান হলো। নোয়াখালীর হাতিয়া নয়, ভাসানচর চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলারই অংশ। সন্দ্বীপ ও হাতিয়ার মধ্যে দীর্ঘ সীমানা বিরোধের পর ভূমি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভাসানচরের ছয়টি মৌজা সন্দ্বীপের অন্তর্গত।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের গঠিত কারিগরি কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ১৩ জানুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ শাখা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সন্দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির স্বীকৃতি মিলল।
বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের গঠিত কারিগরি কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন, ঐতিহাসিক দলিল মূল্যায়ন এবং ভূ-উপগ্রহের ধারণকৃত ছবি বা স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্বীপটির ছয়টি মৌজা ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে সন্দ্বীপের অংশ।
যেভাবে বিতর্কের সূত্রপাত
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯২ সালের দিকে সন্দ্বীপের ন্যায়ামস্তি ইউনিয়ন সাগরগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এর পরপরই সন্দ্বীপের দক্ষিণ উপকূলের কাছাকাছি, মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরে নতুন করে চর জাগতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশকে জেগে ওঠা এই ভূমি স্থানীয়ভাবে ‘ঠ্যাঙ্গারচর’ নামে পরিচিত ছিল। রোহিঙ্গা পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার সময় ২০১৭ সালে এর নাম হয় ভাসানচর।
ওই বছরই এক প্রজ্ঞাপনে সরকার ভাসানচরকে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত দেখায় এবং দিয়ারা জরিপ সম্পন্ন করে। এরপর ২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেখানে ‘ভাসানচর থানা’ গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করে, যেখানেও সেটিকে হাতিয়ার অংশ উল্লেখ করা হয়। সরকারের এসব সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সন্দ্বীপের ছাত্র, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাদের দাবি ছিল, সাগরে বিলীন হওয়া ন্যায়ামস্তি ইউনিয়নের জায়গায় জেগে ওঠা এই চর সন্দ্বীপের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সমাধানের প্রক্রিয়া
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নির্বাহী বিভাগ উচ্চ আদালতের নির্দেশ এবং জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে সীমানা জটিলতা নিরসনে ১৮ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। ‘চট্টগ্রাম-নোয়াখালী জেলার সীমানা জটিলতা নিরসন কমিটি’ নামে এই কমিটিতে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক, জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার এবং উভয় উপজেলার পেশাজীবী প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
গত ৯ মার্চ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সিএস ও আরএস জরিপ এবং স্যাটেলাইট ইমেজ পর্যালোচনার পর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখা ভাসানচরকে সন্দ্বীপের অন্তর্গত দেখিয়ে প্রতিবেদন দেয়। চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই শেষে ভূমি মন্ত্রণালয় সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করে।
সন্দ্বীপবাসীর উচ্ছ্বাস ও প্রতিক্রিয়া
সন্দ্বীপের ন্যায়ামস্তি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক বাসিন্দা ডিপটি সওদাগর বর্তমানে সারিকাইত ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ এলাকায় বসবাস করেন। সেখান থেকে ভাসানচর দেখা যায়। তিনি বলেন, ১৯৯৫ সালে আমরা সারিকাইতে চলে আসি। এটা বেশি দিন আগের কথা নয়। কিসের ভিত্তিতে ভাসানচরকে নোয়াখালীতে যুক্ত করা হয়েছিল, তার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি। শেষ পর্যন্ত ভাসানচরের মালিকানা ফেরত পাওয়ায় আমরা ভীষণ খুশি।
সন্দ্বীপের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মংচিংনু মারমা বলেন, ভাসানচর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সন্দ্বীপবাসী নাখোশ ছিলেন। এখন এমন সিদ্ধান্ত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই দ্বীপের মানুষ আনন্দিত।
হাতিয়ার দাবি ও পাল্টা অবস্থান
ভাসানচরকে সন্দ্বীপের অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে আসছিলেন নোয়াখালীর হাতিয়ার বাসিন্দারা। গত ৭ এপ্রিল এনসিপি নেতা আবদুল হান্নান মাসউদ ফেসবুকে ভাসানচরকে হাতিয়ার দাবি করে পোস্ট দেন।
এছাড়া ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন এবং চট্টগ্রামে মানববন্ধন করে হাতিয়া দ্বীপ সমিতি ভাসানচরকে নোয়াখালী থেকে বিচ্ছিন্ন করার ‘ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ তুলেছিল।
তবে সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ভূমি মন্ত্রণালয় শেষ পর্যন্ত সন্দ্বীপের পক্ষেই রায় দিল।