শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

ম্যাক্সের সেই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

| প্রকাশিতঃ ৮ জুলাই ২০১৮ | ৮:৪৪ অপরাহ্ন

নিউজ ডেস্ক : চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে শিশু রাইফার মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি যাদের অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে, সেই চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলকে (বিএমডিসি) নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা পরীক্ষিৎ চৌধুরী জানান, মন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে মন্ত্রী রোববার এই নির্দেশ দেন।

দৈনিক সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরোর সাংবাদিক রুবেল খানের আড়াই বছর বয়সী মেয়ে রাইফা গলায় ব্যথা নিয়ে গত ২৮ জুন বিকালে ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ২৯ জুন রাতে তার মৃত্যু হয়।

ভুল চিকিৎসায় তার মৃত্যু হয়েছে অভিযোগ করে বিক্ষোভ করেন সাংবাদিকরা। পরে ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি এ ঘটনার তদন্ত করে।

সিভিল সার্জনের নেতৃত্বাধীন কমিটি গত বৃহস্পতিবার রাতে তাদের প্রতিবেদন দেয়, যাতে কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা এবং গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

এই তিন চিকিৎসক হলেন- ডা. বিধান রায় চৌধুরী, ডা. দেবাশীষ সেন গুপ্ত এবং ডা. শুভ্র দেব।

তাদের মধ্যে দেবাশীষ ও শুভ্রকে ইতোমধ্যে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে ম্যাক্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

সিভিল সার্জনের কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘রাইফা যখন তীব্র খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয় তখন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের অনভিজ্ঞতা ও আন্তরিকতার অভাব পরিলক্ষিত হয় এবং ওই সময়ে থাকা সংশ্লিষ্ট নার্সদের আন্তরিকতার অভাব না থাকলেও এ রকম জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো দক্ষতা বা জ্ঞান কোনোটাই তাদের ছিল না।

‘শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বিধান রায় চৌধুরী শিশুটিকে যথেষ্ট সময় ও মনোযোগ সহকারে পরীক্ষা করে দেখেননি। ডা. দেবাশীষ সেন গুপ্ত ও ডা. শুভ্র দেব শিশুটির রোগ জটিলতার বিপদকালীন সময়ে আন্তরিকতার সাথে সেবা প্রদান করেননি বলে শিশুর পিতা-মাতা যে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন, যাহা এই তিন চিকিৎসকের বেলায় সত্য বলে প্রতীয়মান হয়।’

রোববার সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এ সংক্রান্ত এক সভায় তদন্ত কমিটির রিপোর্ট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় বলে জানান পরীক্ষিৎ চৌধুরী।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্তের সুপারিশ অনুযায়ী ম্যাক্স হাসপাতালের লাইসেন্স নিয়ে অনিয়ম আগামী ১৫ দিনের মধ্য দূর করার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ভুল চিকিৎসার অভিযোগ নিয়ে যে কোনো ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ পরিস্থিতি এড়াতে একটি হটলাইন চালু করা হবে। রোগী ও স্বজনরা সেখানে অভিযোগ জানাতে পারবেন। সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ওই হটলাইনের নম্বর সংবলিত সাইন বোর্ড থাকবে।

অন্যদের মধ্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ সচিব জি এম সালেহ উদ্দিন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ, বিএমডিসির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. সহিদুল্লা, স্বাচিপ সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সালান, বিএসএমএমইউর উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ, চট্টগ্রমের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী সভায় উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে বির্তকিত ম্যাক্স হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে নানা অনিয়মের দায়ে দশ লাখ টাকা জরিমানা করেছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। র‌্যব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে রোববার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে তিনটা পর্যন্ত ম্যাক্সে আর তিনটা থেকে ৬টা পর্যন্ত সিএসসিআরে চলা এই অভিযানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি হিসেবে ডা. দেওয়ান মাহমুদ মেহেদি হাসান, ওষুধ প্রশাসনের প্রতিনিধি গুলশান জাহানসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অভিযানে ম্যাক্সের বায়োকেমিস্ট্রি ল্যাবে ব্যবহৃত উপকরণ, ওষুধ এবং হাসপাতালের নথিপত্র ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগপত্র পরীক্ষা করে দেখা হয়। এসময় সাংবাদিকদের ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘ম্যাক্স হাসপাতালের প্যাথলজি ল্যাবে যথেষ্ট দক্ষ জনবল নেই। বায়োকেমিস্ট্রি ল্যাবে এইচএসসি পাস লোকজন চাকরি করছে। এখানে মিনিমাম স্নাতক ডিগ্রিধারী বা বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্নদের কাজ করার কথা। এখানে বায়োকেমিস্ট ও মাইক্রোবায়োলজিস্টও নেই। একটি হাসপাতাল চালাতে হলে নমুনা পরীক্ষার নিজস্ব ব্যবস্থা থাকার নিয়ম থাকলেও মাক্সে সে নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। রোগ নির্ণয়ে বিভিন্ন স্যাম্পল কালেকশন করে তারা চট্টগ্রাম ও দেশের বাইরের বিভিন্ন ল্যাবে পাঠিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নিজেদের নামে রিপোর্ট দেয়। অনেকটা কমিশন এজেন্টের মত তারা কাজ করে। ’

এসব অনিয়মের কারণে ম্যাক্স হাসপাতালকে দশ লাখ টাকা জরিমানা করার পাশাপাশি গাফিলতি সংশোধনের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ১৫ দিন সময় দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।