চট্টগ্রাম : চেম্বারভর্তি রোগী। চেম্বারের বাইরেও রোগী। সঙ্গে দলীয় লোকজনের জটলা। এর মাঝেই উদভ্রান্তের মতো সত্তরোর্ধ্ব এক লোক ঢুকে গেলেন দরজা ঠেলে। পরনে ময়লা পাঞ্জাবি, লুঙ্গিটাও অনেকদিনের পুরোনো।
হায় হায়, করে কী-বলেই লোকটাকে আটকানোর চেষ্টা করেন ডাক্তারের সহকারি। কিন্তু ততক্ষণে ওই লোক ডাক্তারের টেবিলের কাছে পৌঁছে গেছেন। সহকারি আর লোকটির চেঁচামেচিতে ডাক্তারের মনোযোগের ব্যত্যয় ঘটে। রোগী দেখার ফাঁকেই ডাক্তার নিজেই থামালেন সহকারিকে। বললেন- থাক, ওনাকে বসতে দাও।
সাথে সাথেই শুরু হলো লোকটির কান্না, আকুলি-বিকুলি- ‘ট্যাং দুনুগান যারগুই। এত অষুধ হাইর, কিছু নঅর, আঁরে তুই বাঁচঅ না বাজি (ব্যথায় পা দুটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। এত ওষুধ খাই, কিছুই হয় না। তুমি আমাকে বাঁচাও বাবা)। বলেই লোকটি পলিথিন মোড়ানো প্যাকেটের সব ওষুধ ঢেলে দিলেন ডাক্তারের টেবিলে।
ডাক্তার বললেন, ‘বেশি অষুধ হনদে এতাল্লাই অনঅর এ অবস্থা (বেশি ওষুধ খাচ্ছেন, তাই আপনার এ অবস্থা)।
লোকটির পা দুটি ফুলে ঢাউস সাইজ হয়েছে। ডাক্তার ধরে ধরে দেখলেন পা দুটি। তারপর প্রেসক্রিপশনে কলম বসালেন। এডিলস প্লাস-একটিমাত্র ওষুধ লিখে প্রেসক্রিপশনটা ধরিয়ে দিলেন লোকটির হাতে। সাথে দিলেন ৫শ’ টাকা। লোকটি এবার গো ধরলেন। না, ৫শ’ টাকায় হবে না। বাড়িয়ে দিতে হবে। শেষমেশ এক হাজার টাকাই দিলেন ডাক্তার সাহেব। ফিসের পরিবর্তে উল্টো ডাক্তারের কাছ থেকে একহাজার টাকা নিতে পেরে লোকটির চোখ খুশিতে টলমল।
গল্পটি চট্টগ্রামের খ্যাতিমান ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. শাহাদাত হোসেনের চেম্বারের। প্রতিদিনই এমন গল্পের প্লট তৈরি হয় কখনো তার চিকিৎসাপেশায়, কখনো বা রাজনীতিতে।
নগরের ট্রিটমেন্ট সেন্টারের দ্বিতীয়তলায় প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩০ জন রোগী দেখেন ডা. শাহাদাত হোসেন। এর মধ্যে অর্ধেক রোগীই বিনাপয়সার। এমনও সময় যায়-রোগীদের ওষুধ কেনার টাকাও দিতে হয় তাকে।
একুশে পত্রিকার অনুরোধে শনিবার দুপুরে নিজের চেম্বারে বসে এধরনের আরো কয়েকটি গল্পের অবতারণা করেন ডা. শাহাদাত। বলেন, কাল (শুক্রবার) রুবেল নামে বায়েজিদ থানা ছাত্রদলের এক নেতার বাসায় ঢুকে সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। রুবেলের মা বাধা দিলে সন্ত্রাসীদের আঘাতে তার হাতের কব্জি কেটে যায়। রাতে এ ঘটনা শুনার সাথে সাথে আমি সেখানে ছুটে যাই। রুবেলের মাকে নিজ উদ্যোগে রাতেই ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করি।
ডা. শাহাদাত বলেন, বিএনপি পরিবারের হাজার হাজার নেতাকর্মী এখন জেলে। তাদের মামলার ব্যয়ভার, কারাগারে দেখভালের পাশাপাশি অনেকের পরিবারের পাশে আমাকে দাঁড়াতে হয়। দেখা গেলো, পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি জেলে। তখন তার অনুপস্থিতিতে পরিবারে অন্ধকার নেমে আসে। তখন সেই পরিবারটির ভরণপোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করি। সিনিয়র নেতা খসরু ভাই, নোমান ভাইরা বেশিরভাগ সময় ঢাকায় থাকেন। ফলে নেতাকর্মীদের দুর্দিনে পাশে থাকা, আর্থিকভাবে সাহায্য করার সুযোগ তাদের খুব একটা থাকে না। আমি যেহেতু নগর বিএনপির সভাপতি, তাই এই বিষয়গুলো আমাকেই বেশিরভাগ দেখতে হয়। বলেন ডা. শাহাদাত হোসেন।
এতটা চাপ কীভাবে নেন, এত সামলানই বা কেমন করে? ডা. শাহাদাত বলেন, ডাক্তারি এবং রাজনীতি-দুটোই সেবার জায়গা। সেই সুযোগকে পুরোপুরি আমি কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। কাউকে ‘না’ করতে পারি না। সামর্থ অনুযায়ী অর্থ দিয়ে পারি, সেবা দিয়ে পারি, কথা দিয়ে পারি-যেভাবেই হোক প্রতিটা মানুষকে কমফোর্ট দেয়ার চেষ্টা করি। রাজনীতিতে সৎভাবে জীবনযাপন করে এতটা অর্থনৈতিক, মানিসক, শারীরিক চাপ নেয়া খুব কঠিন। সেই কঠিন কাজটি সৃষ্টিকর্তা আমাকে দিয়ে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আমি কৃতজ্ঞ, অশেষ শোকরিয়া জানাই আল্লাহর দরবারে। যোগ করেন ডা. শাহাদাত।
কথাগুলো শেষ না করতেই ফোন আসে চমেক হাসপাতালে থেকে। সেখানে চিকিৎসাধীন কয়েকদিন আগে ট্রেনে কাটা পড়ে দুইপা হারানো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল নেতা রবিউল। এ বিষয়ে সর্বশেষ অবস্থা জানার জন্য ৩টার মধ্যে সেখানে যাবার কথা ডা. শাহাদাতের। মূলত সেখান থেকেই ফোনে তাড়া আসছে বারবার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. শাহাদাত বলেন, মর্মান্তিক এই ঘটনার পর থেকে আমি রবিউলের পাশে দাঁড়িয়েছি। তার সবধরনের চিকিৎসার খোঁজখবর নিচ্ছি। তার দুটি কৃত্রিম পা সংযোজনের চিন্তা করছি জিয়া ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে। বলেই তড়িঘড়ি ছুটলেন মেডিকেলের দিকে।
একুশে/এটি