শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

মেয়রের প্রশ্ন আপনি তো সিগারেট খান, মনে হয় মদও খান!

| প্রকাশিতঃ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১১:৩৩ অপরাহ্ন

আকমাল হোসেন : বৃহস্পতিবার। বিকাল পাঁচটা। চট্টগ্রাম সিটি মেয়র কার্যালয়ের বাইরে মানুষের জটলা। লোকজনের ভিড় ঠেলে কষ্টেসৃষ্টে মেয়র-কক্ষ পর্যন্ত যাওয়া গেলো বটে। কিন্তু সেখানেও মানুষের জটলা, দীর্ঘ লাইন।

কীরে ভাই-এখানে এত লোক কেন? প্রশ্নটা করতেই সিকিউরিটি অফিসার কামাল বললেন, ভাই এটা আর নতুন কী? প্রতিদিনই তো এমন দৃশ্য থাকে, মানুষ নিয়েই স্যারের কাজ। মেয়র-কক্ষে লাইন ধরেছেন সিটি কর্পোরেশনের ঠিকাদার, সেবক-সেবিকা, গরীব-প্রতিবন্ধী। সবাই মেয়রের কাছে এলেন নানা সমস্যা এবং সাহায্যের আবেদন নিয়ে।

একপর্যায়ে কক্ষভর্তি অভ্যাগতদের ম্রিয়মাণ, ফিসফাস শব্দ ছাপিয়ে হঠাৎ মেয়রের কণ্ঠটা স্পষ্ট হয়ে উঠলো। মেয়র মিষ্টিভাষায় বকছেন একজনকে। বলছেন, আপনি তো সিগারেট খান? দেখে তো মনে হচ্ছে মদও খান। সাহায্যপ্রার্থী লোকটি লজ্জায় লাল হওয়ার উপক্রম; তখনই মেয়র বলে উঠলেন সিগারেট না খেয়ে সে টাকা দিয়ে আপনার বাচ্চার স্কুলের বেতন দিলে আর আমার কাছে আসা লাগে না। মেয়র বলেন, আমি সিগারেট খাই না। আপনিও ছেড়ে দিন। লোকটি মূলত সিটি করপোরেশন পরিচালিত স্কুলে পড়ুয়া মেয়ের বেতন মওকুফের আর্জি নিয়ে এসেছিলেন মেয়রের কাছে।

এরপর এক ভদ্র মহিলা গেলেন মেয়রের কাছে। তার আবদার-‘বাবা আমার তো সেবিকা হিসেবে কাজ ছিলো করপোরেশনে। এখন আমি অবসরে। আমার মেয়ে কাজ করে ডোর টু ডোর প্রজেক্টে। শুনলাম আমাদের থাকার বাসাটা নাকি ছেড়ে দিতে হবে। ছেড়ে দিতে হলে মেয়ে, নাতি-নাতনি নিয়ে কোথায় যাবো- বলেই কেঁদে দিলেন মহিলা।

সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত সহকারী (পিত্র) সৈয়দকে তলব করেন মেয়র। বলেন, ওনার ব্যাপারটি কী আমাকে বোঝান। ডোর টু ডোর প্রজেক্টে যারা কাজ করেন তাদের জন্য বাসা বরাদ্দ নেই- জানান সৈয়দ।

ভদ্র মহিলাকে মেয়র বললেন, এখন তো আপনি বাসায় থাকছেন। জবাব দিলেন- হ্যাঁ, থাকছি। ঠিক আছে, নির্ভয়ে থাকুন। একটা আবেদন দিয়েন আমি দেখি কী করা যায়। এসময় বললেন, আপনাদের জন্য বড় বিল্ডিং বানাচ্ছি। তৈরি হয়ে গেলে থাকার কষ্ট আর থাকবে না।

মাগরিবের একটু আগে মেয়র গেলেন আছরের নামাজ পড়তে। এর মাঝেও অফিসে লোকের কমতি নেই। মেয়রের সামনের চেয়ার দখল করে আছেন কাউন্সিলর, দলীয় নেতাকর্মী, কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা। নামাজ শেষে চেয়ারে বসার পর নানা পদের ইফতারিতে ভরে গেলো মেয়রের টেবিল। ইফতারি মুখে দিয়ে রোজা ভাঙবেন মেয়র। সোম ও বৃহস্পতি রোজা রাখেন মেয়র। মাগরিবের আজান হলো। ইফতারি মুখে দেবার সময় ডেকে নিলেন সবাইকে। সামনে যাকেই দেখছেন বলছেন আসুন ইফতার করি। কয়েক জনের হাতে খেঁজুর তুলে দিলেন।

ইফতারের ফাঁকে ফাঁকে সাহায্য-প্রার্থীদের অ্যাটেন্ড করছেন মেয়র। এক চামচ ছোলা মুখে পুড়েন, আর কথা শোনেন একেকজনের। এক লোক আবদার করলেন তার বাচ্চার স্কুলফি কমিয়ে দিতে। মেয়র তাকে ফেরাননি। সঙ্গে কিন্তু ছবকও দিলেন। বললেন, আপনারা যদি এভাবে বাচ্চার স্কুলের বেতন, জড়িমানা মওকুফের জন্য আসেন তাহলে সিটি কর্পোরেশনের স্কুলগুলো চলবে কী করে? এমনিতেই আমরা ভর্তুকি দিয়ে স্কুল চালাই। তার মাঝেই ধরে রাখতে হয় শিক্ষার মান।

এরপর সন্ধ্যা ৭টা; মেয়রের হাতে এক আবেদন, যেখানে লেখা আমবাগানের এক প্রতিবন্ধি বৃদ্ধার জন্য টিউবওয়েল চাই। মেয়রের প্রশ্ন আপনি সে জায়গায় একা থাকেন? হ্যাঁবোধক উত্তর বৃদ্ধার। মেয়র বললেন, শুধু একজনের জন্য একটা টিউবওয়েল! কী বলেন, এটা কী করে সম্ভব! তাছাড়া ওয়াসা কাজ করছে, কিছুদিন পর ঘরে ঘরে পানি পৌঁছে যাবে।

এ নিয়ে মেয়র উপস্থিত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন; বলেন, এক ব্যক্তির জন্য একটা টিউবওয়েলের সুপারিশ করে কাউন্সিলর সাহেব আমার কাছে পাঠিয়েছেন এবং লিখেছেন গুরুত্বের সাথে বিষয়টা দেখবেন। মেয়রের এ কথার পর সবার মাঝে হাসির রোল পড়ে যায়।

এসময় বৃদ্ধার দিকে আরেকবার তাকালেন মেয়র; বলেন আপনাদের জন্য এলাকায় পানির ব্যবস্থা করা আছে। আমি কাউন্সিলরকে বলে দিচ্ছি আপনাকে যেন পানি নেয়ার সুবিধা করে দেয়।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়ও মানুষে ঠাসা মেয়র-কক্ষ। মেয়র ধৈর্য্য ধরে এক এক করে সবার কথা শুনছেন, সমাধানের চেষ্টা করছেন।

অফিসের একজনের কাছে জানতে চাওয়া- এখনো তো অনেক লোক। সবার সঙ্গেই কি মেয়র কথা বলবেন? মেয়র অফিস থেকে বের হবেনই বা কবে? তার উত্তর- যত লোক থাকুক, কাউকেই ফেরান না। সবাইকে অ্যাটেন্ড করতে গিয়ে কখনো কখনো রাত ১১টায়ও অফিস থেকে বের হওয়ার দৃষ্টান্ত আছে মেয়রের। নগরের সবকিছুর খবর রাখেন নগর ভবনে বসে। যোগ করেন ওই লোক।

একুশে/এএইচ/এটি