শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

ডান হাত অবশ, বাম হাতেই লিখলেন ৪টি বই!

| প্রকাশিতঃ ৩১ জানুয়ারী ২০২০ | ১০:৩৩ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম : ২০০২ সালে প্যারালাইজডে আক্রান্ত হন তিনি। ডানপাশ অবশ। যে হাত বহু সৃষ্টিকর্মের স্রষ্টা, সেই ডানহাতটাও চলে না। তাতে কী! মনটা তো সচল, সপ্রতিভ। মনের জোরেই অসাধ্যকে সাধন, অজেয়কে জয়। বাম হাত দিয়েই শুরু করলেন বর্ণমালা সাজানোর কাজ। দিন, মাস, বছর পেরিয় বাম হাতেই রপ্ত করলেন ‘হ্যান্ড-রাইটিং’। আর সেই বাম হাত দিয়ে একে একে লিখে ফেললেন চারটি বই। ইচ্ছেশক্তি আর সাধনা থাকলে অসম্ভবকে সম্ভব, অসাধ্যকে সাধন যে করা যায় তা আরেকবার দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি।

বলা হচ্ছিল, চট্টগ্রাম আদালতের সিনিয়র আইনজীবী, অধ্যাপক কামরুন নাহার বেগমের কথা।  যিনি ২০০২ সালে প্যারালাইজডে আক্রান্ত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই অনেকে ধরে নিয়েছিলেন সৃষ্টিকর্ম দূরের কথা, তাঁর স্বাভাবিক চলাফেরাও থমকে যাবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি আরো বেশি শক্তিশালী, দুর্দমনীয় হয়ে ওঠলেন। রোজ তিনি আদালতে যান। সামাজিক-রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। লেখালেখি করেন। রাষ্ট্র থেকে পেয়েছেন ‘জয়িতা’ স্বীকৃতি।

শুক্রবার হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুরের নিভৃত, মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠা ব্যতিক্রমী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইডেন ইংলিশ স্কুলের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করতে এসেছিলেন মহিয়সী এ নারী। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয়পর্বে প্রতিষ্ঠান-চেয়ারম্যান সন্তানের মুখে মায়ের এই কীর্তির কিঞ্চিত বর্ণনায় নড়েচড়ে উঠে পুরো অডিয়েন্স। কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে আসে পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে। মুহূর্তেই সকলের কৌতূহল ও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন কামরুন নাহার বেগম।  

তাঁর তৃতীয় সন্তান প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. খালেদ মাহমুদ মা-র উৎসর্গের চরম পরাকাষ্টার কথা শোনাতে গিয়ে সবাইকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছিলেন। তিনি বলেন, আমার মা ধৈর্যের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একজন মানুষ। ২০০২ সালে থেকে তিনি প্যারালাইজডে আক্রান্ত। কথা বলতে পারতেন না, চোখে ভালো মতো দেখতে পেতেন না। সে পরিস্থিতিতেও প্রতিটি কাজ সম্পাদন করতেন চরম ধৈর্য আর একাগ্রতায়। সুস্থতার জন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চাইলে তিনি রাজি হন না। বিল্ডিংয়ের এক তলা থেকে চার তলা পর্যন্ত নিজে নিজে উঠানামা করেন। ডান হাত অবশের কারণে লিখতে পারতেন না। বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে বাম হাতে লেখা প্র্যাকটিস করেই নানা শ্রেণীপেশার মানুষের দু:খ-দুর্দশা নিয়েই লিখে ফেললেন চারটা বই।

খালেদ মাহমুদ বলেন, আজকের যিনি উদ্বোধক আমার মা উনার সেবায় যদি প্রতিনিয়ত থাকতে পারি তাহলে মনে হয় সন্তান হিসেবে কিছুটা দায়িত্ব পালিত হয়েছে। উনি এমন একজন মা, একটু আগে শুনেছেন উনি জয়িতা হয়েছিলন। জয়িতা শব্দের অর্থ অনেকে বুঝে, অনেকে বুঝে না। সমাজের সবদিক থেকে সব ক্ষেত্রকে যিনি জয় করতে পেরেছেন আমি বুঝি তিনিই জয়িতা। আপনারা হয়তো জানেন, উনি নিজে একাধারে অ্যাডভোকেট, প্রফেসর ছিলেন।

আমার মা সংসার জীবনের অনেক বিচিত্র, কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে আজকের এই অবস্থানে এসেছেন। মা যখন মেট্রিক পাশ করেছিলেন তখন উনার বিয়ে হয়েছিলো। স্বামীর ঘরে এসে উনি ইন্টামিডিয়েট পাশ করেছেন, বিএ পাশ করেছেন, এমএ পাশ করেছেন, বিএড  করেছেন, এলএলবি পাশ করেছেন। একটার পর একটা সার্টিফিকেট নিয়ে তিনি অ্যাডভোকেট হয়েছেন। কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। চট্টগ্রাম আদালতের প্রথম মহিলা এপিপি তিনি। এখনো ছোট্ট একটা কাজের মানুষের হাত ধরে প্রতিদিন তিনি কোর্টে চলে যান। যোগ করেন খালেদ মাহমুদ।

জানা গেলো, এই জয়ীতা, রত্নাগর্ভা নারীর ৫ ছেলে ৩ মেয়ের সবাই উচ্চশিক্ষিত, স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে ড. হাছান মাহমুদ বাংলাদেশের আলোচিত রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী। মেজ ছেলো উদ্যোক্তা-প্রকৃতি ও মৎস্যপ্রেমী; জাতীয়ভাবে নির্বাচিত হয়েছেন সেরা মৎস্যখামারী। তৃতীয় ছেলে শিক্ষানুরাগী, সমাজসংস্কারক। ৪র্থ ছেলে বেলজিয়াম প্রবাসী আর ছোটছেলে পর্যটন-ব্যবসায়ী। তিনবোনের একজন চিকিৎসক, অন্য দুইজন ব্যারিস্টার, ইঞ্জিনিয়ার-সবাই যোগ্য বাবা-মার সন্তান হিসেবে সমাজে, রাষ্ট্রে আলো ছড়াচ্ছেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধে এ নারীর অসামান্য অবদানের কথাও জানা  গেলো অনুষ্ঠানে। মু্ক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীদের রান্না করে খাওয়াতেন তিনি। একপর্যায়ে লঙ্গরখানায় পরিণত হয় তাঁর বাড়ি। সে কারণে পাকবাহিনী পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে দেয় বাড়ি। এরপর সন্তানসম্ভবা কামরুন নাহার বেগম আশ্রয় নেন পাহাড়ে। পাহাড়ের গুহাতেই জন্ম হয় ডাক্তারকন্যার। ওইসময় মুখে, হাতে, পায়ে কালি মেখে থাকতেন তিনি।  

খালেদ মাহমুদ বলেন, আমরা তার অথর্ব সন্তান। তাঁর যে প্রাপ্য, সেটা আমরা যথাযথ দিতে পারি না। একজন মা সন্তানের কাছ থেকে কিছু আশা করে না। কিন্তু মায়ের যখন বয়স হয়ে যায় অনেক কিছুই সন্তানদের কাছ থেকে আশা করে। আমরা তেমন কিছুই দিতে পারি না। আল্লাহর রহমত আপনাদের সবার দোয়া আছে এবং সবচাইতে বড় জিনিস, মাকে নিয়ে আমরা গর্ববোধ করি। উনি যে কাজটা যখন করবেন মনে করেন সেটা করে ফেলেন। কিছুদিন আগে আমি নিজে ঢাকায় ঢুকতে পারিনি। অথচ সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে আওয়ামী লীগের সন্মেলনে তিনি একা একা চলে গিয়েছিলেন। আমরা সবাই আশ্চর্য হয়েছি।

একুশে/এআর/জেএইচ/এটি