
চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউট (টিআইসি) থেকে বের হয়ে আসেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রধান সমন্বয়কারী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। তাদের দেখে মনোনয়ন-বঞ্চিত বিদ্রোহী নারী কাউন্সিলর প্রার্থী ও তাদের সমর্থকেরা ‘চট্টগ্রামের হাওয়া ভবন বন্ধ করো’, ‘মনোনয়ন-বাণিজ্য বন্ধ করো’ স্লোগান দিতে থাকেন।
এসময় চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের পিয়ন ও নগর মহিলা আওয়ামী লীগ সভাপতি হাসিনা মহিউদ্দিনের প্রেস উইংয়ের সমন্বয়কারী হিসেবে পরিচিত আমীর আলী স্লোগানধারীদের দিকে তেড়ে এসে স্লোগান বন্ধ করতে বলেন। একপর্যায়ে তুই তুকারি করেন এবং বেয়াদবসহ নানা অশ্লীল বাক্যে আক্রমণ করেন নারীকর্মীদের।
নারীকর্মীরা আমীর আলীর এই আচরণের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানান এবং একপর্যায়ে তাকে জুতাপেটা করতেও উদ্যত হন। এরপর আমীর আলী চুপ হয়ে গেলে একপর্যায়ে পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক হয়। বৃহস্পতিবার (৫মার্চ) দুপুরে থিয়েটার ইনস্টিটিউটের সামনে ঘটনাটি ঘটলেও জানাজানি হয় শনিবার বিকেলে এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার পর।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) থিয়েটার ইনস্টিটিউটে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের ডেকে নির্বাচন সমন্বয়কারী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে আহ্বান জানান। অন্যথায় দল মনোনীত প্রার্থীদের জিতিয়ে আনতে যা যা করার সবই করবেন বলে জানানোর পর থিয়েটার ইনস্টিটিউটের ভেতরে এবং বাইরে অপেক্ষমান কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এক পর্যায়ে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন মিটিং শেষে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই মনোনয়ন-বঞ্চিত বিদ্রোহী নারীপ্রার্থীরা ‘মনোনয়ন-বাণিজ্য আর নয়, চট্টগ্রামের হাওয়া ভবন বন্ধ করো’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। দুই নেতা বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করে গাড়িতে ওঠে যান। কিন্তু চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ অফিসের পিয়নের পাশাপাশি হাসিনা মহিউদ্দিনের প্রেস সমন্বয়ে যুক্ত থাকা আমীর আলী স্লোগানধারী নারীদের দিকে তেড়ে আসেন এবং তাদের গালমন্দ করেন। আর সেটি মানতে পারেননি নারীকর্মীরা। তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং অশালীন আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানান।
ভিডিওটিতে দেখা যায়, উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ড মহিলা লীগ ‘এ’ ইউনিটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আয়েশা খাতুন মারমুখী হয়ে আমীর আলীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। এক পর্যায়ে আমীর আলীকে জুতাপেটা করার কথাও উচ্চস্বরে বলতে শোনা যায় তাকে। ঘটনার আকস্মিকতায় আমীর আলী চুপ হয়ে যান এবং নীরবতা পালনের মধ্যদিয়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সক্ষম হন।
ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা মনোনয়নবঞ্চিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থী ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি নাদিরা সুলতানা হেলেন শনিবার রাতে একুশে পত্রিকাকে বলেন, মিটিংয়ের শেষদিকে বাইরে মনোনয়নবঞ্চিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থী ও তাদের সমর্থকেরা চট্টগ্রামের হাওয়া ভবন বন্ধ করো, করতে হবে মর্মে স্লোগান দিতে থাকলে আওয়ামী লীগ অফিসের পিয়ন আমীর আলী নারীদের সাথে অশালীন আচরণ শুরু করে। নারীকর্মীরা তাৎক্ষণিকভাবে এই ঘটনার প্রতিবাদ করেন। এসময় সংরক্ষিত আসনের কমিশনার আঞ্জুমানা আরা, আবিদা আজাদ, জেসমিন পারভিন জেসিসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। আমরা সবাই যে যার মতো করে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলছিলাম, তখনই এই ঘটনা ঘটে।-বলেন নাদিরা সুলতানা।

এছাড়াও নিজের ফেসবুকে ভিডিওটি শেয়ার দিয়ে নাদিরা সুলতানা হেলেন লিখেন, অতীতেও সে (আমীর আলী) এই ধরনের কাজ করেছে, কোন অজানা শক্তিতে তার বিচার কেউ করতে পারে না। শুনেছি ঐদিন সে বিদ্রোহী প্রার্থীদেরকে গালি দিচ্ছিল। মহানগরের লিডারদের কাছে বিনীত জিজ্ঞাসা এই লোক কী পারে কোন নারীর সাথে এই ধরনের আচরণ করতে?
সেদিন কী হয়েছিল জানতে চাইলে আমীর আলীর অশালীন আচরণের প্রতিবাদকারী আয়েশা বেগম একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমরা স্লোগান দিচ্ছিলাম। কেউ কিছু বললেন না, অতি উৎসাহী আমির আলী এসে স্লোগান বন্ধ করতে বলে এবং একপর্যায়ে আমাদেরকে তুই তুকারি করা শুরু করে, বেয়াদব ডাকে।
আমীর কেন স্লোগান বন্ধ করতে বলবেন, এই স্লোগানে তার সমস্যাই বা কী- এমন প্রশ্নে আয়েশা বেগম বলেন, স্লোগানগুলো ছিল মূলত হাসিনা মহিউদ্দিন ও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে ইঙ্গিত করে। আমির আলী হচ্ছে হাসিনা মহিউদ্দিনের পিএস। এই কারণে সে আমাদেরকে অশ্লীল কথা বলে থামাতে চেয়েছে।
আয়েশা বেগম বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে মহিলা লীগের কর্মী। আমার নেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী আমার নেতা। সেই সুবাদে তার স্ত্রী হাসিনা মহিউদ্দিনকে আমরা ভালোবাসতাম, এখনো বাসি’। তবুও স্লোগান কেন-জবাবে তিনি বলেন, তিনি মনোনয়নের নামে যা করেছেন তা আমরা মেনে নিতে পারছি না। কোনোদিন রাজনীতি করেনি, সংগঠন করেনি এমন নারীকেও মনোনয়ন পেতে হাসিনা মহিউদ্দিন সুপারিশ করেছেন, সহযোগিতা করেছেন। যারা দীর্ঘদিন মাঠে থাকলো, দলের জন্য ঘাম ঝরালো, শ্রম দিলো তাদের কি কোনো মূল্য নেই? তাই এই ইস্যুতে প্রতিবাদ করছি, করবো।
সেদিনের বাকবিতণ্ডা শেষে আমীর আলী তাদেরকে মহানগর অফিসে আসলে দেখিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করেন আয়েশা বেগম ও নাদিরা সুলতানা হেলেন।
এদিকে, নারীকর্মীদের সাথে অশ্লীল আচরণ করেননি দাবি করে আমীর আলী একুশে পত্রিকাকে বলেন, অহেতুক স্লোগান দিয়ে তারা পরিবেশটাকে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল। আমি তাদের স্লোগান না দিতে অনুরোধ করেছি কেবল। তাতেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে তারা। পার্টির ক্ষতি হবে এজন্য আমি চুপ থেকে, নিরবতা পালন করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছি। যেসব নারী স্লোগান দিয়েছেন, বিতণ্ডায় জড়িয়েছেন তারা ভিত্তিহীন, দলের কেউ নয় বলেও দাবি করেন আমির আলী।
এক পর্যায়ে এ বিষয়ে নেগেটিভ কোনো নিউজ না করতে একুশে পত্রিকার প্রতিবেদকের কাছে অনুরোধ জানান তিনি। হাসিনা মহিউদ্দিনের পিএস এর দায়িত্ব পালন করেন না, শুধু আওয়ামী লীগ অফিসেই তার কাজ বলে দাবি আমির আলীর।
https://www.facebook.com/494759127367978/posts/1441598289350719/