শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

জন্মদিন, জন্মপরিচয় সঙ্কটে বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলা

| প্রকাশিতঃ ১৯ মার্চ ২০২০ | ১:২৫ অপরাহ্ন

ঢাকা : জাতির জনকের জন্মদিনকে শিশু-কিশোরদের মাঝে চির জাগরুক, উৎসবের দিন-ক্ষণে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৮৮ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলার আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে বঙ্গবন্ধুপ্রেমী হারুন অর রশিদ আজাদের হাত ধরে।

এই উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু ভবন, ৩২ ধানমন্ডিতে আয়োজন করা হয় জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপ উপাচার্য ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন উদ্বোধনী অতিথি। রাজধানীর টিপু সুলতান রোডের ওয়ারি মহিলা সমিতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১০ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের সমাপনীতে প্রধান অতিথি ছিলেন সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ ও স্বদেশ খবর-এর সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান।

উদ্যোক্তা হয়েও সেই সংগঠনের নেতৃত্বে আসেননি হারুন অর রশিদ আজাদ। অ্যাডভোকেট জেবুন্নেছা আকতার খাতুন মুন্নীকে সভানেত্রী ও হাবিবুর রহমান বাদলকে মহাসচিব করে বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলার আত্মপ্রকাশ ঘটে। নেপথ্যে থেকে  সংগঠনটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন হারুন অর রশিদ আজাদ। কিন্তু অকস্মাৎ এক রাজনৈতিক মামলায় জড়িয়ে ১৯৮৮ সালের শেষের দিকে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমান তিনি।

তার অনুপস্থিতিতে সংগঠনটি টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন সভাপতি-সেক্রেটারি। অস্ট্রেলিয়া গিয়েও ভোলেননি নিজের গড়া সংগঠনকে। সাধ্যমত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপরও কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড। আর তখনই বিমান ভট্টাচার্য নামের একজন সংগঠনটির সভাপতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ হন।

এরপর ১৯৯৩ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনের সভাপতি পদে আসেন মহিউদ্দিন মানু ও সাধারণ সম্পাদক হন মিয়া মনসফ। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন। ১৯৯৭ সালে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে নেতাকর্মীরা মহিউদ্দিন মানুকে সভাপতি পদে ফের চাইলেও মিয়া মনসফ সেটা হতে দেননি। তিনি নিজেই নিজেকে সভাপতি ঘোষণা দেন। শুধু তাই নয়, ১৯৯০ সালের ৩ আগস্ট সংগঠনটি তিনিই প্রতিষ্ঠা করেছেন দাবি করে সর্বত্র প্রচার করতে থাকেন। সারাদেশে জাহির করেন তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির আবেগের জায়গা। সেই আবেগের টানে সারাদেশে গড়ে ওঠে এর শাখা-প্রশাখা। বর্তমানে সারাদেশে এই সংগঠনটির ১৪ হাজার নেতাকর্মী রয়েছে। আছে ৬৪ জেলায় সাংগঠনিক কমিটি। সেই ১৯৯৭ সাল থেকে সভাপতি পদে বহাল আছেন মিয়া মনসফ। তার পছন্দ-অপছন্দের গ্যাড়াকলে পড়ে বদল হয় কেবল সাধারণ সম্পাদক। বছরের পর বছর প্রধান পৃষ্ঠপোষক করে রেখেছেন মিয়া মনসফ যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, সেই প্রতিষ্ঠানের (মোহাম্মদীয়া হাউজিং) চেয়াম্যান মীর মোশাররফ হোসেন পাকবীর। নিজেই প্রতিষ্ঠাতা, নিজেই সভাপতি, নিজের পছন্দের মানুষ প্রধান পৃষ্ঠপোষক, নিজের পছন্দের মানুষ সাধারণ সম্পাদক-এভাবেই সংগঠনটিকে গিলে খাওয়ার বিষয়টি জনসমক্ষে চলে এলে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বছরে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার যে রেওয়াজ তৈরি হয়েছিল, ২০১০ সাল থেকে তিনি সংগঠনটির অনুষ্ঠান বর্জন শুরু করেন।

এদিকে, সংগঠনটির এগিয়ে যাওয়া দেখে খুশি সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা হারুন অর রশীদ। কিন্তু তাঁর ক্ষোভ আর কষ্ট অন্য জায়গায় – তার হাতে গড়া সংগঠনটির মিয়া মনসফের প্রতিষ্ঠাতা সেজে বসা। তার আকুলতা, কষ্ট আরো বড় হয় যখন তার জন্ম দেওয়া সন্তানের জন্মতারিখ পাল্টে দেওয়া হয়। অস্ট্রেলিয়া থেকে সংগঠনটির জন্য একাধিকবার অর্থ সাহায্য পাঠিয়ে কেবল জন্মতারিখটা ঠিক রাখার আবেদন জানান তিনি। কিন্তু মিয়া মনসফ বিষয়টি এড়িয়ে যান সবসময়। তিনি স্বীকারই করতে চান না সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা হারুন অর রশীদ আজাদ।

কষ্টের কারণ বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন সংঠন-দখলে নেওয়া নেতৃবৃন্দকে। বলেছেন, ‘জাতির জনকের ৬৮ তম জন্মদিনকে প্রধান স্মারক ধরে সংগঠনটি আমি প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। কিন্তু যারা সংগঠনটির নেতৃত্বে বসে আছেন তারা স্রেফ নিজেদের আত্মপ্রচার, আত্মপ্রতিষ্ঠাতা ভাবার জন্য বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর মাস জাতীয় শোকের সময় সংগঠনটির জন্ম হয়েছে দাবি করে সংগঠনটির আবেগ, আবেদন ও যথার্থতাকে ম্লান করে দেওয়ার এক উদগ্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।’

বিষয়টি একুশে পত্রিকার কাছে উপস্থাপন করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হারুন অর রশীদ আজাদ বলেন, ‘২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে সরাসরি আমি বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলার সভাপতি মিয়া মনসফ ও সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন মোহাম্মদের সাথে দেখা করি। সাধারণ সম্পাদক বিষয়টির গুরুত্ব ও বাস্তবতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেও মিয়া মনসফ বিষয়টি বারবার এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে আমাকে প্রস্তাব দেন আমি নাকি ঘোষণা দিয়ে বলতাম সংগঠনটি তিনি আর আমি যৌথভাবে গড়ে তুলেছি। আমি জবাব দিই, এমন মিথ্যা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমি সংগঠনের মালিকানা কিংবা কোনো পদ-পদবি দাবি করতে আসিনি। সংগঠন আপনারাই চালান, আপনারাই থাকুন। আমি কেবল চাইছি, সংগঠনটি তার প্রকৃত জন্মদিন ফিরে পাক। বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিনের মতো বিভ্রান্তি তৈরি করে, প্রশ্নবোধক চিহ্ন একে দিয়ে শিশু-কিশোরদের বিভ্রান্তি করবেন না দয়া করে ।’

আর এটি বলার পর থেকেই মিয়া মনসফ আমাকে এড়িয়ে চলছেন। শুধুমাত্র নিজের কদর্য বাসনার জন্য সংগঠনটিকে তার প্রকৃত জন্মদিন ফিরিয়ে দিচ্ছেন না।- বলেন হারুন অর রশীদ আজাদ।

বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলার জন্মসঙ্কট ঘোচাতে ধর্না দিচ্ছেন মিয়া মনসফের কাছে

এ ব্যাপারে অসংখ্যবার ফোন করেও মিয়া মনসফের কোনো বক্তব্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। তিনি কোনোভাবেই ফোন রিসিভ করছেন না। তবে সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন মোহাম্মদ বলেন, আমি সংগঠনে যুক্ত হই ১৯৯০ সালের পর। তখন থেকে জেনে আসছি এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা বর্তমান সভাপতি মিয়া মনসফ, এবং তার হাত ধরেই ১৯৯০ সালের ৩ আগস্ট সংগঠনটির জন্ম হয় বলে আমাদের কাছে প্রচার করা হয়।

কিন্তু পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত হারুন অর রশিদ আজাদের সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলাপসূত্রে সংগঠনটির জন্মের মূল ঘটনা ও তারিখ জানতে পারি। প্রতিষ্ঠালগ্নে ১০ দিন ব্যাপী কর্মসূচির আবেদনপত্র, প্রথম কমিটি এবং পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের কাটিংসহ নানা তথ্য-প্রমাণ হাতে আসার পর বুঝতে পারি হারুন অর রশিদ আজাদের গড়া জন্ম তারিখটিই সঠিক। বিষয়টি ইতোমধ্যে সংগঠনটির সভাপতিকে জানালেও তিনি কোনো সদুত্তর দেননি। তাই আমরা অচিরেই এ ব্যাপারে বিশেষ সভা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করি এরপর জন্মতারিখ নিয়ে সৃষ্ট সঙ্কট ও জটিলতা দূর হবে।

বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলার কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য সাইফুল ইসলাম বলেন, জন্ম-সংকটটি নিয়ে আশা করি কারো দ্বিমত হওয়ার কথা নয় আর। কারণ ১৯৮৮ সালের ১৮ মার্চের ইত্তেফাক পত্রিকায় সংগঠনের আত্মপ্রকাশ বিষয়ে নিউজ এসেছে। কেন্দ্রীয় কমিটির আগামী সভায় এটা নিয়ে আলোচনার পর ঘোষণার মাধ্যমে সঠিক ইতিহাস সবাই জানবে।