শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

আমেরিকায় করোনা-জয়ী এক বাংলাদেশি পরিবারের গল্প

| প্রকাশিতঃ ১২ এপ্রিল ২০২০ | ৭:০৫ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম :  করোনায় যখন থমকে গেছে বিশ্ব, পড়ছে লাশের স্তূপ, হচ্ছে গণকবর, মৃত্যুভয়ে জীবন্মৃত বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ, তখনই করোনায় আক্রান্ত হয়েও চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে নিজেদের চেষ্টায়, সচেতনতায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশি এক পরিবার।

সেই পরিবারটির শেকড় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায়। কাজী মুহাম্মদ জসীম উদ্দীন সেই পরিবারটির কর্তা। বেশ ক’বছর ধরে স্ত্রী, দুইসন্তান নিয়ে থাকেন আমেরিকায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রিধারী জসীম উদ্দীনের স্ত্রী রওশন আরা খাতুন রেখাও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর। দু্ই সন্তান রোজান, আজান নিয়ে রোমান্টিক এই প্রেমিক জুটির আমেরিকায় সুখের সংসার।

সেই সুখী গৃহকোণে হানা দেয় মরণঘাতি করোনাভাইরাস। প্রথমে জসীম, তারপর স্ত্রী এবং একে একে দুই সন্তানকেও ঘিরে ফেলে করোনা। অর্থাৎ পরিবারের চার সদস্যই করোনায় আক্রান্ত। দীর্ঘ প্রায় একমাস অদৃশ্য জীবাণু ঘাতক করোনার সাথে যুদ্ধ করে এখন চারজনই পুরোপুরি সুস্থ। তাদের কণ্ঠে এখন আত্মবিশ্বাসের সুর। রোজান, আজানের হৈ হুল্লোড়ে আবারও মুখরিত ভালোবাসার ছোট্ট নীড়টি। 

কীভাবে পরিবারটি করোনাকে জয় করেছেন সেই যুদ্ধ জয়ের গল্পটি রোববার (১২ এপ্রিল) বিকেলে ফেসবুকে তুলে ধরেছেন জসীম উদ্দীনের ভাতিজি সরকারি স্কুলশিক্ষক কাজী নাসরিন। ফেসবুক পোস্টে করোনা-আক্রান্ত হলে ভয় না পেয়ে বরং কীভাবে করোনা মোকাবিলা করতে হবে সে ব্যাপারে পরিবারটির উদ্ধৃতি দিয়ে নাসরিন তুলে ধরেছেন কিছু পরামর্শও।

কাজী নাসরিন লিখেছেন, আমার শ্রদ্ধেয় মেজ চাচা মুহাম্মদ জসীম উদ্দীন করোনা পরিস্থিতিতে কাউকে বাইরে না যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন শক্তভাবে। বলেছেন, প্রয়োজনে লবণ দিয়ে সেদ্ধ ভাত খেয়ে থাকবেন কিন্তু বাইরে যাবেন না। কেননা উনি গাড়িতে থেকেও রক্ষা পাননি। উনার মাধ্যমে স্ত্রী- সন্তান সবাই আক্রান্ত হয়েছিল।

বলেছেন , যদি কোনো কারণে আক্রান্ত হয়েই যান; ঘাবড়ে যাওয়া যাবে না। মনোবল শক্ত রাখতে হবে।
কৌশলী যুদ্ধে সেই জীবাণুকে মেরে ফেলতে হবে। আপনার ইমিউন সিস্টেম জীবাণুর সাথে যুদ্ধ করবে যা করোনার চেয়ে হাজার গুণ শক্তিশালী। কাজেই শরীরটাকে সব সময় ফিট রাখতে হবে। ছেলেদের শরীর উনার চেয়ে বেশি ফিট ছিল বিধায় উনাদের ১৫ দিন আগেই ছেলেরা সেরে উঠেছে।

জসীম উদ্দীনকে উদ্ধৃত করে কাজী নাসরিন লিখেন, যদি আক্রান্ত হয়েই যান সেটার কোনো চিকিৎসা নেই। কৌশলী যুদ্ধে ওদেরকে মেরে ফেলতে হবে। সে যুদ্ধে আপনার অস্ত্রগুলো হবে –

১.  গরম পানিতে লবণ দিয়ে গার্গেল করতে হবে নিয়মিত। অন্তত আধা ঘণ্টা পর পর। আদা-লেবু সম্ভব হলে মধু দিয়ে একটু পরে পরে লাল চা খেতে হবে। এতে আপনার শরীরের কষ্ট কমবে। গলাব্যথা ও শ্বাস কষ্ট কমবে। কাশিটা হালকা হবে। যেরকম চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলেন- করোনার টার্গেটই থাকে আপনার ফুসফুসে আক্রমণ করা। গরম লিকুইড পান করলে তা গলা দিয়ে পাকস্থলিতে যাওয়ার সাথে সাথে পাকস্থলিতে করোনার চেয়ে এক ধরনের শক্তিশালী ভাইরাস থাকে, যেগুলো করোনাকে মেরে ফেলে। গোসলও করতে হবে গরম পানিতে।

২. আপনার ক্ষুধামন্দা ও স্বাদগন্ধ নষ্ট হয়ে যাবে। এর পরেও শরীরটাকে সুস্থ রাখার জন্য স্যুপসহ অন্যান্য গরম খাবার খেতে হবে। ঠাণ্ডা পানি একদম খাওয়া যাবে না। ফল হিসেবে উনারা কমলা, আপেল ও আনারস খেয়েছেন।

৩. ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়া যাবে না। কারণ একেক জনের ইমিউন সিস্টেম একেক রকম। তবে জ্বর নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন মতো টায়লনেল বা Acetaminophen ট্যাবলেট খেতে বলেছেন ৬ ঘণ্টা পর পর। ডোজ হবে আপনার বয়স ও শরীরের ওজন অনুসারে।

করোনাজয়ী জসীম উদ্দীনের মতে, আপনি যদি সুস্থও থাকেন তাহলেও খাওয়াসহ এ অভ্যাসগুলো এখন থেকেই রপ্ত করা প্রয়োজন।

পোস্টের শেষভাগে কাজী নাসরিন লিখেন – অভিনন্দন করোনাবিজয়ী পরিবারকে। আশা করি আর একটি প্রাণেরও অপচয় হবে না। যারা অসুস্থ আছেন, সুস্থ হয়ে উঠবেন স্বল্প সময়ের মধ্যেই। অচিরেই করোনামুক্ত খোলা আকাশের নিচে বুক ভরে নিশ্বাস নেবো সবাই। বসন্তের এই প্রকৃতিও যেন তার সৌন্দর্যের ডালা মেলে বসে আছে মানুষকে বরণ করার জন্য।

এ প্রত্যাশা করোনাকে জয় করা যোদ্ধাদের। এ প্রত্যাশা আমি, আপনি, আমাদের সবার।