
শরীফুল রুকন : চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) সদস্যদের মধ্যে গত ১৩ এপ্রিল প্রথম একজনের করোনা ধরা পড়ে। এরপর এক এক করে আরও পুলিশ সদস্য সংক্রমিত হওয়ার খবর আসতে শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত সিএমপির আটজন পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।
পুলিশের মধ্যে করোনাভাইরাসের বিস্তারে উদ্বিগ্ন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় এই রোগে আক্রান্ত কোনো অসুস্থ মানুষের সংস্পর্শে এলে সুস্থ মানুষটিও এতে আক্রান্ত হয়ে যান। তাই এই করোনার বিস্তার কমাতে ‘গ্যাপ কৌশল’ নির্ধারণ করেছে সিএমপি। সেটা হচ্ছে যতটা সম্ভব পুলিশ সদস্যদের একেক জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা। যাতে কোন একজনের করোনা ধরা পড়লে বেশি সংখ্যক পুলিশ সদস্যকে কোয়ারেন্টিনে পাঠাতে না হয়।
এর অংশ হিসেবে আজ সোমবার রাতে (২৭ এপ্রিল) চকবাজারের হোটেল ফ্রেশ ইনে সরিয়ে নেয়া হয়েছে দামপাড়া পুলিশ লাইন্সের ৩৩ জনকে। তারা সবাই ট্রাফিক উত্তর বিভাগে কর্মরত। এছাড়া সদরঘাট এলাকার একটা হোটেলে রাখা হয়েছে আরও ১০ জনকে; তারা ট্রাফিক উত্তর বিভাগের কার্যালয়ে কর্মরত আছেন।
এর আগে নগরের জিইসি কনভেনশন সেন্টারে সরিয়ে নেয়া হয় অন্তত ৭৩ জন পুলিশ সদস্যকে। এ পুলিশ সদস্যরা সিএমপির এমটি ও সিটি এসবি শাখায় কর্মরত। গত ১৬ এপ্রিল থেকে দামপাড়া পুলিশ লাইন্স ছেড়ে জিইসি কনভেনশনে থাকছেন এসব পুলিশ সদস্যরা। এছাড়া দামপাড়ার আরও কিছু সদস্যকে সরিয়ে নেয়া হয় মনসুরাবাদ পুলিশ লাইন্সে।
জানতে চাইলে সিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (জনসংযোগ) আবু বকর সিদ্দিক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পুলিশ লাইন্সের ব্যারাকগুলোতে ফোর্স রাখতে আগে থেকেই আবাসনের সমস্যা ছিল। এখন করোনাভাইরাসের কারণে স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য ব্যারাকগুলো থেকে কিছুটা ফ্রি করছি।’
তিনি বলেন, ‘দামপাড়ার নিকটবর্তী যে সব হোটেলগুলো আছে, তাদের সাথে আমরা কথা বলেছি, ইতিমধ্যে ট্রাফিক ব্যারাকে যেহেতু একের পর এক পেশেন্ট পাওয়া যাচ্ছে সেজন্য ট্রাফিক পুলিশের ৩৩ জনকে রাতে চকবাজারের হোটেল ফ্রেশ ইনে আমরা শিফট করেছি।’
এ বিষয়ে সিএমপির ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘কিছু কিছু সদস্যকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি। আলাদা করে ফেলছি। যাতে কেউ আক্রান্ত হলে সবাইকে কোয়ারেন্টাইন করতে না হয়। কৌশলগতভাবে আমরা গ্যাপ (ফাঁকা) করে দিচ্ছি। এক রুমে আগে বেশি ছিল, এখন কমিয়ে ফেলছি।’
তিনি বলেন, ‘আজকে চকবাজারের একটা হোটেলে ৩৩ জনকে নিয়ে গেছি। সদরঘাটে আমাদের অফিসে যে কয়জন কাজ করে, তাদেরকে আমাদের অফিসের পাশে একটা হোটেলে ১০ জন করে রাখছি। মূলত যাতে এক জায়গায় বেশি সদস্য না থাকে, সে চেষ্টা করছি আমরা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে না রাখলে সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে।’
এর আগে গত ১৩ এপ্রিল প্রথমবারের মত একজন ট্রাফিক কনস্টেবলের করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর তার বাসস্থান দামপাড়া পুলিশ লাইন্সের ট্রাফিক ব্যারাক লকডাউন করা হয়। এই ব্যারাকে অন্তত ২০০ জন ট্রাফিক সদস্য থাকেন। আক্রান্ত কনস্টেবলের রুমে ১২ জন থাকতেন। তাদের সবাইকে এবং তাকে চিকিৎসা দেওয়া পুলিশ হাসপাতালের তিনজন চিকিৎসক, তিনজন নার্স এবং সাতজন চিকিৎসা সহকারীসহ ২৫ জনকে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়।
এরপর ১৬ এপ্রিল নতুন করে দুই ট্রাফিক সদস্যের করোনা রোগ শনাক্ত হয়। তারা করোনায় আক্রান্ত প্রথমজনের সঙ্গে একই রুমে থাকতেন। ১৯ এপ্রিল দামপাড়া পুলিশ লাইনের ট্রাফিক ব্যারাকের বাসিন্দা আরেকজন কনস্টেবলের দেহে করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। এ পুলিশ সদস্য ব্যারাকে আগের তিনজনের কাছাকাছি থাকতেন বলে জানান নগর পুলিশের উপকমিশনার (বিশেষ শাখা) মো. আব্দুল ওয়ারিশ খান।
এরপর ২২ এপ্রিল পুলিশ লাইন্সের মেস ম্যানেজার নায়েকের করোনা ধরা পড়ে। তবে তথ্য গোপনের কারণে সংশ্লিষ্ট সব মহলে বিষয়টি জানাজানি হয় ২৩ এপ্রিল সকালে। গত ২৪ এপ্রিল ট্রাফিক পুলিশের একজন এটিএসআইয়ের করোনা শনাক্ত হয়। তিনিও দামপাড়া পুলিশ লাইনের ট্রাফিক ব্যারাকের বাসিন্দা এবং প্রথম আক্রান্ত পুলিশ সদস্যের কাছাকাছি থাকতেন।
এরপর ২৬ এপ্রিল ট্রাফিক বিভাগের বন্দর জোনে কর্মরত ৪৯ বছর বয়সী একজন পুলিশ কনস্টেবলের করোনা শনাক্ত হয়। তিনি দামপাড়া পুলিশ লাইনের ট্রাফিক ব্যারাকে থাকতেন। সর্বশেষ ২৭ এপ্রিল আরও একজন পুলিশ সদস্যের করোনা রোগ ধরা পড়ে।
সিএমপির পুলিশ সদস্যের মধ্যে আক্রান্তদের মধ্যে বেশিরভাগই ট্রাফিক পুলিশের সদস্য। ট্রাফিক সদস্যরা করোনায় বেশি আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে সিএমপির ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পুলিশের মধ্যে বেশি দৃশ্যমান ডিউটি ট্রাফিক পুলিশকেই করতে হয়। স্বাভাবিকভাবে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা লোকজনের সংস্পর্শে বেশি যাচ্ছে। তাই আক্রান্তও বেশি।’
এদিকে পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ বলছেন, এখন গাড়ির চাপ সেভাবে নেই। এ অবস্থায় ট্রাফিক সদস্যদের ডিউটি সীমিত করে দিলে সংক্রমণ হয়তো কম হতো।
এ বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশকে গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। চেকপোস্টেও ট্রাফিক পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। যে সব গাড়ি চলাচলে এখন নিষেধাজ্ঞা আছে, এই গাড়িগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান করানো, অহেতুক কোন লোকজন গাড়ি নিয়ে ঘোরাঘুরি করতেছে কিনা এটা এনফোর্সমেন্ট সম্পূর্ণটা ট্রাফিক পুলিশকেই করতে হচ্ছে।’
শহরকে নিরাপদ রাখতে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের এভাবে কঠিন ত্যাগ স্বীকার না করে উপায়ও নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।