রবিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

রেমিটেন্স প্রবাহ হ্রাস ও নগদ লেনদেনের চাপ, প্রবাসী পরিবারগুলোতে অস্থিরতা

| প্রকাশিতঃ ২ মে ২০২০ | ৭:২৬ অপরাহ্ন

একুশে প্রতিবেদক : সারাদেশে করোনাভাইরাসের কারণে সাধারণ ছুটি ও লকডাউন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ রয়েছে। সারা বিশ্বে লকডাউন চলমান থাকায় বাংলাদেশি প্রবাসীদের অনেকের স্বাভাবিক কর্মজীবনেও ব্যাঘাত ঘটছে।

গত দুই মাসে দেশে রেমিটেন্সের প্রবাহ কম থাকায় এমনিতে সংকটে রয়েছে প্রবাসীদের পরিবারগুলো। সংকটকালীন সময়ে ভোগ্যপণ্যসহ সব ধরনের ব্যবসায় নগদে লেনদেনের চাপ থাকায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

২৫ মার্চ থেকে সারাদেশে সাধারণ ছুটির পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত, শপিংমলসহ স্বাভাবিক কাজকর্ম সীমিত করেছে সরকার। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার স্বার্থে গণপরিবহনও বন্ধ রাখা হয়েছে প্রায় এক মাস ধরে।

শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দোকান, কাঁচাবাজার ও ওষুধের দোকান খোলা রাখা হয়েছে। কিছুদিন পূর্বে নিত্যপণ্যের এসব দোকানও বিকাল ৫টার পর বন্ধ করার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। ব্যাংকিং কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় ব্যবসায়ীরা নগদেই পণ্য বিক্রি করছেন। প্রবাসীদের পরিবারগুলো বিদেশ থেকে রেমিটেন্স আসার উপর নির্ভর করে স্থানীয় মুদি দোকান বা ওষুধের দোকান থেকে বাকিতে পণ্য ক্রয় করলেও রেমিটেন্স না আসায় নিত্যপণ্য সংগ্রহে সমস্যার মধ্যে পড়েছে।

চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রবাসী অধ্যুষিত উপজেলার ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে ব্যাংকিং কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে। এতে করে পাইকারি বাজার ও দেশের বিভিন্ন নিত্যপণ্য সরবরাহকারী কনজ্যুমার কোম্পানিও ডিওতে (বাকিতে পণ্য বিক্রি) পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে খুচরা মুদি ব্যবসায়ীরাও এখন আর আগের মতো বাকিতে পণ্য বিক্রি করছেন না। পণ্য সংগ্রহে বাকিতে লেনদেন প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খুচরা ক্রেতাদের কাছেও বাকিতে পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দেয়ায় গ্রামের প্রবাসী পরিবারগুলো সংকটে পড়েছে বলে স্বীকার করেছেন তারা।

দেশের প্রবাসী অধ্যুষিত উপজেলাগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ। মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ ও আমেরিকায় দ্বীপ উপজেলাটির কয়েক লাখ বাসিন্দা রয়েছে। গত কয়েকমাস ধরে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঘটায় চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকেই প্রবাসীদের অর্থ পাঠানো কমতে থাকে। তবে বাংলাদেশে এর প্রকোপ কিছুটা দেরিতে আসায় এতদিন বাকিতে পণ্যক্রয় করে সংসারের ব্যয়ভার নির্বাহ করছিল প্রবাসী পরিবারগুলো। কিন্তু বাংলাদেশে মার্চের ৮ তারিখে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর ভোগ্যপণ্যের বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি দামও বেড়ে যেতে থাকে অস্বাভাবিক হারে।

এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্যজট ছাড়াও ভোগ্যপণ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় স্থানভেদে নিত্যপণ্যের সাময়িক সংকটে ব্যবসায়ীরা বাকিতে পণ্যবিক্রি কার্যত বন্ধ করে দেয়। কয়েক মাস ধরে বাকিতে পণ্য বিক্রির পর বকেয়া অর্থ ফেরত না পাওয়ায় এখন আর বাকিতে পণ্য বিক্রি করতে চাইছেন না ব্যবসায়ীরা। এ কারণে রমজানের চাহিদা মেটাতে অস্থির সময় পাড় করছেন প্রবাসীদের পরিবারগুলো।

জানতে চাইলে সন্দ্বীপের শিবেরহাট বাজারের ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ী কাজী আমিন মাসুম বলেন, বড় পাইকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আমরা বাকিতে পণ্য কিনে বিক্রি করি। করোনাভাইরাসের কারণে নগদ টাকা ছাড়া ভোগ্যপণ্য সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। এ কারণে প্রবাসীদের পরিবারগুলোকেও বাকিতে পণ্য দিতে পারছি না। রোজার কারণে কিছু কিছু ক্রেতাকে রোজার পণ্য সরবরাহ করলেও দীর্ঘমেয়াদে বাকিতে আর পণ্য বিক্রি করা সম্ভব নয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের পরিবারগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্র্ইে বাকিতে পণ্য ক্রয় করে স্থানীয় বাজার ও পাড়ার মুদি দোকান থেকে। এরপর কয়েক মাস পর বা প্রতি মাসে বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ পরিশোধ সাপেক্ষে ফের পণ্য সংগ্রহ করে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মাসের বকেয়া জমলেও এককালীন পাওয়ার আশায় দোকানিরাও বাকিতে পণ্য দেয় এসব পরিবারকে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে রেমিটেন্স আসার পরিমাণ কমে যাওয়ায় বাকিতে পণ্য বিক্রিতে মূলধন হারানোর শঙ্কায় রয়েছে ব্যবসায়ীরা। ফলে নগদে কিনে বাকিতে পণ্য বিক্রি করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে বাকিতে পণ্য দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন গ্রামাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও ইস্টডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ সিকান্দার খান বলেন, দেশের প্রবাসী জনগোষ্ঠীর পরিবারগুলো গুচ্ছকারে বসবাস করে। বিভিন্ন জেলার উপজেলাগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের পরিবারগুলো শুধুমাত্র রেমিটেন্সের উপর নির্ভর করে জীবন নির্বাহ করে। মধ্যপ্রাচ্যের পর বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের সংকট শুরু হওয়ায় দেশের সংকটে থাকা শ্রেণীর মধ্যে রয়েছে এই গোষ্ঠীটিও। যা আগে ছিল না। সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় এসব পরিবারেও অভাবের তাড়না ভর করেছে। সংকটকালীন এই সময়ে অপরাপর জনগোষ্ঠীর মতোন এদের শ্রেণীবদ্ধ না করে সরকারের উচিত রেশন কার্ডে জরুরি ভিত্তিতে প্রবাসী পরিবারগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা। অথবা স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা বা ঋণের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া না গেলে অন্য কোনো আয়ের উপর নির্ভরশীল না থাকা পরিবারগুলোর সিংহভাগ নতুন করে দারিদ্রের কষাঘাতে পিষ্ট হবে বলে জানান তিনি।

দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ। গত এক মাস ধরে এখানকার প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে। দেশের স্থলসীমান্ত বন্দরগুলো বন্ধ থাকার পাশাপাশি বন্দর নিয়ে পণ্য খালাসে জটিলতা ছাড়াও পণ্য পরিবহনে সংকটের কারণে পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ চেইন ভেঙে যায়।

এ কারণে বেশ কিছুদিন ধরে পাইকারি বাজারের ক্রেতারা বাকিতে পণ্য বিক্রি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। সীমিত ব্যাংকিং কার্যক্রমের কারণে নগদ অর্থ প্রবাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্বাসের ভিত্তিতে বাকিতে পণ্য বিক্রির পরিমাণও কমছে এই বাজারে। ফলে সারাদেশের সাথে বাকিতে বা সপ্তাহ বা মাসিক ভিত্তিতে বাকিতে পণ্য বিক্রি নিরুৎসাহিত করছেন এখানকার ব্যবসায়ীরা। যার প্রভাব পড়েছে দেশের প্রত্যন্ত এলাকার ভোগ্যপণ্য বিক্রিকারী দোকানগুলোতে।

প্রাক্তন ব্যাংকার ও চট্টগ্রাম জুুনিয়র চেম্বারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক টিপু সুলতান সিকদার একুশে পত্রিকাকে জানান, দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিলার বা পরিবেশকরা আগে খুচরা ও পাইকারি বাজারে এক মাস বা দুই মাসের নগদ চেকের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ করতো। কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে বেচাকেনা সীমিত হয়ে আসায় বাকিতে পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। এসব কারণে গ্রামাঞ্চল ও পাড়া-মহল্লায় খুচরা বিক্রেতাদের কাছেও মূলধন সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। যার ফলে এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্রেতারাও বাকিতে পণ্য ক্রয়ে বাধাগ্রস্থ হচ্ছেন বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, আনোয়ারা এলাকার একাধিক প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে টাকা না পাঠানোয় সমস্যার মধ্যে রয়েছেন তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারি মাস থেকে টাকা না আসায় রাঙ্গুনিয়ার একটি পরিবারের ওই সদস্য ব্যাংকার বন্ধুর কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ধার নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। দীর্ঘ সময় এ সংকট থাকলে পরিবারপরিজন নিয়ে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।