
বিপ্লব বড়ুয়া : গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়লের মতোই বিষফোঁড়া ‘করোনা’ আজ সবার ঘাড়ে চেঁপে বসেছে। বৈশ্বিক আমূল পরিবর্তনের অভিমুখে এমন একটি অলুক্ষুণে ভাইরাস সবার জীবনকে তছনছ করার পাশাপাশি তামাম দুনিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর প্রত্যেককে কোনঠাসা করে রেখেছে, সে কথা বাড়িয়ে বলার কোনো জো নেই!
চীনের সেই Wuhan সিটি থেকে যে আগ্নেয়গিরির উদগীরণ শুরু, তার স্ফুলিঙ্গ আজ পুরো বিশ্বালয়ের রূপ পাল্টিয়ে সকল স্তরের মানুষকে শিহরণের মধ্যে পতিত করে রেখেছে। নেই কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, নেই কোনো নির্দিষ্ট জনপদ, নেই কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা সমাজ, নেই কোনো নির্দিষ্ট বিধি-বিধান, নেই কোনো বয়সের সীমারেখা, নেই কোনো নির্দিষ্ট আলামত, নেই কোনো নির্দিষ্ট দাওয়াই, নেই কোনো নির্দিষ্ট মিরাকল যেথায় “করোনা” আধিপত্য বিস্তার না করে আছে। এই প্রাণঘাতি ভাইরাস আরো কত যে তাণ্ড চালাবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা আজো সুদূর পরাহত!
চলমান Pandemic “Covid – 19” সমগ্র মানবজাতির জন্য সন্দেহাতীত একটি চরম অভিসম্পাত! অভিশপ্ত এই ‘করোনা’র বিপরীতে আমাদের আবাসভূমির অদৃশ্য কিছু উন্নতিসাধন কিন্তু হয়েছে! যে পৃথিবীতে আমাদের বসবাস, সেটা কেমন জানি একধরনের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছিলো। প্রাকৃতিক নানান অসামঞ্জতা আজ সহজেই অনুমিত।
আবহাওয়ার বৈসাদৃশ্য, পরিবেশদূষণ, যান্ত্রিকতার বহুল ব্যবহার, বর্জ্যপদার্থের লাগামহীনতা ইত্যাদি বিবিধ অস্বাস্থ্যকর উপকরণে আমাদের অপরূপ পৃথিবী অনেকাংশে সুস্থতায় নিশ্বাস নিতে পারছিলো না। বিশ্বময় Lockdown এর অপরিহার্যতায় নিত্য সামাজিক অবক্ষয়ের অনাচার হতে অনেকে মুক্ত থেকেছে/আছে, কূটনৈতিক (দুনিয়াজোড়া) সম্পর্কের কুৎসিত কর্মকাণ্ড স্থবির ছিলো/আছে, হানাহানি-রক্তক্ষরণ অপেক্ষাকৃত নিম্নগামী ছিলো/আছে, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ অনেকাংশে কম ছিলো/আছে, আরো হাজারো প্রকৃতিগতভাবে আমাদের মানবকূলের কল্যাণ সাধিত হয়েছে বহুলাংশে।
বিশেষভাবে, Industrial sector-এর বেশিরভাগ কিছু সময়ের জন্য অনুৎপাদন বা সচল না রাখার ফলশ্রুতিতে আমাদের এই শ্যামল শিশিরে ভরা মায়াময় পৃথিবী কিছু সময়ের জন্য শীতল বাতায়ন গ্রহণ করেছে। তার যে অদেখা নানান উপকারিতা, সেটার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা আমার মতো আনাড়ির জন্য বামন হয়ে চাঁদ ধরার মতন বললেও খুব সামান্য বলা হবে। তবে, সাম্প্রতিক বা সমসাময়িক প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগ, মহামারী ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্লাবনের জোয়ার অনেক কিছুই আমাদের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।
আরো একটি লক্ষনীয় বিষয়, যেটা ‘করোনা’ আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে; সেটা হলো-নৈতিকতা। বেড়ে উঠার সাথে সাথে কিংবা স্কুল-কলেজে আমরা কতই না নিয়ম-নীতি, বিধি-বিধানসহ হাজারো মাঙ্গলিক শৃঙ্খলার কথা শিখি (moral codes)। পড়াশোনার পাঠ শেষ করে জীবন ও জীবিকার অদম্য স্রোতে নৈতিকতার কাছে আমরা কমবেশী সবাই হার মানি। আর নৈতিকতাকে উপহাসের খোরাক হিসাবে বিবেচনা করি!
আজ, এই বিধ্বংসী ‘করোনা’ সবাইকে একই কাতারে দণ্ডায়মান করে সেই নৈতিকতা চর্চার এক বিশাল সম্ভার সবার অন্তরে ঠাঁই করে নিয়েছে। আমি নিজেও যে তার সহযাত্রী এতে কোনো দ্বিধা নেই!
‘করোনা’র উপর্যপুরি আঘাতে প্রযুক্তির সুপ্রসন্ন আশীর্বাদে এই ধরাতলের সকল স্তরের প্রতিটি মানুষের করুণ আর্তনাদের আহ্বান; দেখেছি বা শুনেছি! সবারই একই সূর-হে বিধাতা, আমাদের এই যাত্রায় রক্ষা করো! সেই সাথে যারা নামীদামী, যাদের বেশ নাম ডাক বা বিত্ত-ভৈবব আছে; তাদেরই কিছু সংখ্যক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসে নানান ফিরিস্তি দিয়ে চলেছেন। উপলক্ষ আর অজুহাত যাই হোক, নৈতিকতা আমাদের সবক্ষেত্রে থাকা জরুরি। এতে নিজ পরিবার, সমাজ, জাতি প্রত্যেকেই শুভ্রতায় প্রভাবিত। অসময়ের এই নিদ্রাহীন মুহূর্তে, আমাদের নৈতিক চর্চা অব্যাহত রাখা বাঞ্চনীয়!
মৃত্যুভয়ে কাতর নয় এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর (যদিও অনেকে সহমত পোষণে লজ্জায় রক্তিম হয়ে যায়)। জীবনকে সবাই সমভাবে ভালোবাসে বলেই- বেঁচে থাকার অবিরাম অভিলাষ দেদীপ্যমান! সুন্দরতা আর সততা সবসময় উজ্জ্বল ও আলোকময়! যা নৈতিক চরিতার্থ লালন আর পালনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়! তাই, আমাদের সৎ ও নৈতিক চেতনায় সজাগ থাকা নিতান্ত প্রয়োজন!
অশুভ শক্তির সমস্ত অপতৎপরতা অচিরেই দূরীভূত হোক, পুলকিত আলোয় আবার উদ্ভাসিত হোক আমাদের সেই চিরচেনা আদরের পৃথিবী-সে বিনম্র প্রার্থনা করছি।
বিপ্লব বড়ুয়া : কানাডা প্রবাসী