বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২০, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭

নাছির-রেজাউলের আইসোলেশন সেন্টারে ’সেবা’ না পাওয়ার অভিযোগ

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২০, ৩:২৬ অপরাহ্ণ

ইমরান এমি : স্থগিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী ও নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম রেজাউল করিম চৌধুরীর উদ্যোগে গত ২৭ জুন উদ্বোধন করা ‘মুক্তি আইসোলেশন সেন্টার’ এ ভর্তি হয়ে একদিনের মাথায় ফিরে এসেছেন দুই রোগী। উদ্বোধনের দিন শনিবার দুপুরে ভর্তি হয়েছিলেন তারা।

এদের একজন নগরীর চান্দঁগাও থানাধীন শমসেরপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. মহসীন (৩৮), যিনি রেজাউলের আইসোলেশন সেন্টারে (মুক্তি) সেবা না পেয়ে পরদিন (২৮ জুন) মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের আইসোলেশন সেন্টারে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানেও একই অবস্থা। সেবা না পাওয়ার অভিযোগ।

মহসীনের স্বজনদের অভিযোগ, মেয়র এবং মেয়রপ্রার্থীর আইসোলেশন সেন্টারে নেই কোনো চিকিৎসা, নেই কোনো সেবা। যে কারণে দুই সেন্টারে দুইদিন থাকার পর তাদের রোগীকে চলে আসতে হয়েছে। ওই রোগী এখন ভর্তি আছেন প্রিন্স অব চিটাগাংয়ে গড়ে ওঠা আরেকটি আইসোলেশন সেন্টারে।

মহসীনের ভাগিনা মো. ফরহাদ খান একুশে পত্রিকাকে অভিযোগ করেন, ২৭ জুন উদ্বোধনের দিন থেকে রোগী ভর্তি করা হবে মর্মে ফেসবুক ঘোষণা দেন স্বয়ং রেজাউল করিম সাহেব। সে কারণে আশাবাদী হয়ে আমরা সেখানে নিয়ে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা নেই সেখানে। দায়িত্বরত চিকিৎসকইফতেখারের কাছে টেলিফোনে বার বার ধর্না দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। সবার যেন গাছাড়াভাব।

‘এরপর তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে রোগীকে নিয়ে যাই মেয়র মহোদয়ের আইসোলেশন সেন্টারে। সেখানে একরাত রাখা হয়। অক্সিজেন সিচুরেশন কিছুটা কমে আসায় তারাও রাখতে রাজি হলো না। বিষয়টি নুরুল আজিম রনি ভাইকে জানালে তিনি বললেন হালিশহর আইসোলেশন সেন্টারে নিয়ে যেতে। পরদিন ২৯ জুন দুপুরে সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সাপোর্ট নিয়ে আমাদের রোগী এখন আগের চেয়ে আল্লাহর রহমতে ভালো আছে।-বলেন রোগীর ভাগিনা ফরহাদ।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে মুক্তি আইসোলেশন সেন্টারের উদ্যোক্তা এম রেজাউল করিম চৌধুরী বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, উদ্বোধনের দিনই আমরা দুইজন রোগী পেয়েছিলাম। একজন ছিল হার্টের রোগী, আরেকজন করোনা উপসর্গ নিয়ে এসেছিল। যেহেতু হার্টের রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ আমাদের নেই, সেই কারণে উনি ফিরে গেছেন, অন্যজন স্বেচ্ছায় বাড়ি ফিরে গেছেন। অন্য কোনো আইসোলেশন সেন্টারে ওই রোগী ভর্তি হয়নি দাবি করে রেজাউল করিম প্রতিবেদককে বলেন, এটি সত্য নয়, বরং আপনারাই বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন, মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আইসোলেশন সেন্টারটির উদ্যোক্তা মো. সাজ্জাত হোসেন একুশে পত্রিকাকে বলেন, হ্যাঁ, মুক্তি আইসোলেশন সেন্টারে ভর্তি হওয়া মহসীন নামে একজন রোগী আমাদের সেন্টারে ভর্তি হয়েছে। তবে কী কারণে তিনি সেন্টার বদল করেছেন তা আমাদের জানা নেই। ওই রোগীর শ্বাসকষ্ট আছে, অক্সিজেন দরকার। আমরা তাই দেওয়ার চেষ্টা করছি।

রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, আমরা প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস, লোকবল, ডাক্তার, নার্স সন্নিবেশ করে আগামী দুইদিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রূপে চালু করবো। এসব প্রস্তুতি ছাড়া উদ্বোধন করতে গেলে রোগীরা সেবা পাবে না তাই স্বাভাবিক, এরপরও উদ্বোধন করলেন কেনো-এমন প্রশ্নে রেজাউল বলেন, আমাদের একেবারে প্রস্তুতি নেই তা নয়। সীমিত প্রস্তুতির মধ্যেও যে দুইজন রোগী এসেছে, তাদেরকে আমরা সাধ্যমতো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আশা করি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির পর রোগীরা পরিপূর্ণ সেবা পাবে।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বুধবার রাতে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘যারাই যাচ্ছেন সেবা পাচ্ছেন। ওই ভদ্রলোক কেন সেবা পেলেন না, কিংবা কেনই বা তাকে চলে যেতে হলো আমার বোধগম্য নয়।’

চিকিৎসা না পাওয়া বলতে কী বোঝেন-প্রতিবেদকের কাছে পাল্টা জানতে চেয়ে মেয়র বলেন, আমরা তো বলিনি এটা চিকিৎসা সেন্টার। এখানে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেবো। এটা তো মূলত আইসোলেশন সেন্টার। করোনা-আক্রান্ত বা করোনা সাসপেক্টেড, যাদের ঘরে, বাসা-বাড়িতে আইসোলেশনে থাকার সুযোগ নেই তাদের জন্যই এই আইসোলেশন সেন্টার। সিরিয়াস কোনো রোগীর চিকিৎসা তো এই সেন্টারে করা সম্ভব নয়। কারো অক্সিজেন সিচুরেশন ৯২ এর নিচে নেমে এলে অবশ্যই তাকে সেই আঙ্গিকের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেক্ষেত্রে আইসোলেশন সেন্টারের তেমন কিছু করার থাকে না।

শ্বাসকষ্টের সেই রোগী বর্তমানে হালিশহর করোনা আইসোলেশন সেন্টারে ভর্তি আছে, সেটা জানানোর পর মেয়র প্রতিবেদককে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক ডা. সুশান্ত বড়ুয়ার সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।

এরপর ডা. সুশান্ত বড়ুয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এরকম কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে কেউ করেনি। আমাদের এখানে এখনো সিট অনেক ফাঁকা। আমরা চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য উম্মুখ হয়ে আছি। এ ধরনের অভিযোগ যদি কেউ করে থাকে, তাহলে সেটা ফেইক।’

অন্যদিকে, মুক্তি আইসোলেশেন সেন্টারের তত্ত্ববাধয়ক ইফতেখার কামাল খান একুশে পত্রিকা বলেন, আইসোলেশন সেন্টার উদ্বোধনের দিন দুইজন রোগী ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু এখানে যে ব্যবস্থা রয়েছে তা নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত নয়। যার কারণে চিকিৎসকদের পরামর্শে নতুন করে সাজাঁনো হচ্ছে। উদ্বোধনের দিন যে দুই জন পুরুষ রোগী আসছিলেন তাদের একজনের অক্সিজেন লেভেল কমে গিয়েছিল। যে কোন সময় তার আইসিইউ দরকার পড়তে পারে। যার কারণে তাকে অন্য কোথাও গিয়ে চিকি’সা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। অপর যে রোগী ছিল তার হার্টের সমস্যা ছিল, তিনি কোভিড পজেটিভ। তখন আমাদের আইসোলেশনে এক্সরে মেশিন ছিল না। যার কারণে তাকেও অন্যত্রে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে এবং আমাদের এখানে পূর্ণাঙ্গ যখন চালু হবে তখন তাদের আসার জন্য বলেছি।

তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের এখানে ৭০ শয্যা প্রস্তুত রয়েছে। আগের সিস্টেমের পরিবর্তন আনার জন্য এখন কাজ চলছে। এখন ওয়ার্ডগুলোর মধ্যে ব্যবধান রাখা হচ্ছে। ফার্মেসী ও আউটডোর বাইরে রাখা হচ্ছে, নন কোভিড রোগীরাও যেন এসে স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারে। এছাড়া এখানে খাবার, থাকা, নাশতাসহ যাবতীয় সবকিছু দিলেও ওষুধ আমরা দিতে পারছি না। যার কারণে বাইরের একজনকে এখানে ফার্মেসী বসানোর জন্য সুযোগ করে দিচ্ছি। যেন রোগীরা অন্য কোথাও গিয়ে ওষুধের জন্য হয়রানি না হয়। আমাদের কাজ চলছে, মেশিনারীও চলে এসেছে। আগামী শুক্রবার না হলেও শনিবার থেকে আবারো রোগী ভর্তি করা হবে।

তবে যে যাই বলুক ‘বিষয়টিকে’ ভালোভাবে দেখছেন না রাজনৈতিক বোদ্ধামহল ও সচেতনজনরা। সেবা নিয়েও কি তাহলে রাজনীতি শুরু হয়েছে? এমন প্রশ্নও করেছেন কেউ কেউ। মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীন ২৫০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার করলেন বলে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউলকেও তড়িগড়ি করে একটা আইসোলেশন সেন্টার করতে হবে? তাদের দেখাদেখিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনও ঘোষণা দিয়েছেন আইসোলেশন সেন্টার গড়ার!

অনেকের মতে, হোক একাধিক আইসোলেশন সেন্টার, তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু সেখানে তো প্রকৃত সেবার পরিবেশ থাকতে হবে। থাকতে হবে মানবিক স্পর্শ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আইসোলেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে সেবা, মানবিকতার পরিবর্তে আত্মপ্রচার, আত্মপ্রতিষ্ঠার রাজনীতিই মুখ্য হয়ে ওঠেছে।