চট্টগ্রাম : সেই বিতর্কিত বৌদ্ধভিক্ষু শরণংকর থের’র ইন্ধনে ইসলাম ধর্ম ও মহানবী হযরত মোহাম্মদ (স.) নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবমাননাকর ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন।
রাঙ্গুনিযার পদুয়া ইউনিয়নের ফলাহারিয়া জ্ঞানশরণ মহারণ্য বিহারের দুই শ্রমণই ‘রুমন হিমু’ ও ‘রানা সাধু’ নামে দুটি ফেইক আইডি থেকে পবিত্র ধর্ম ইসলাম ও রাসূলকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মীয় উসকানিমূলক মন্তব্য করেছেন। আর এতে ইন্ধন ও সাহস জুগিয়েছেন ওই বিহারের অধ্যক্ষ শরণংকর ভান্তে নিজেই। মূলত এর মধ্যদিয়ে রাঙ্গুনিয়ায় বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টি করে প্রকারান্তরে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা করেছিলেন শরণংকর থের।
রোববার (১২ জুলাই) দিনভর তদন্ত ও অনুসন্ধান শেষে এমন তথ্য পাওয়া একটি গোয়েন্দা সংস্থার চট্টগ্রামের শীর্ষ কর্মকর্তা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে ওই ভিক্ষু অনিয়মতান্ত্রিকভাবে গড়ে তোলা নিজের সাম্রাজ্য ধরে রাখার ভয়ঙ্কর চেষ্টায় মেতেছিলেন। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে সেটি ভেস্তে গেছে।’
এক্ষেত্রে বিতর্কিত সেই বৌদ্ধ ভিক্ষুকে আইনের আওতায় আনা হবে কিনা জানতে চাইলে গোয়েন্দা সংস্থার ওই কর্মকর্তা জানান, আইনের আওতায় না আসার কোনো কারণ নেই। ওই দুই ফেইক আইডির নেপথ্য ব্যক্তিদ্বয় যে কোনো মুহূর্তে গ্রেপ্তার হতে পারেন। সেই সাথে আইনের আওতায় আসতে পারেন তাদের গুরু বিতর্কিত ভিক্ষু শরণংকর থের। এক্ষেত্রে উপর মহল থেকেও সিগন্যাল আছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, রাঙ্গুনিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহবুব মিল্কি রোববার রাতে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মামলাটির অগ্রগতি আছে। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম ও রাসূলের অবমাননার সাথে ফেইক আইডির আড়ালে কারা জড়িত সে ব্যাপারে মোটামুটিভাবে একটা ধারণা পাওয়া গেছে। যে কোনো মূহূর্তে আমরা মামলার বিষয়ে আরো ভালো খবর দিতে পারবো বলে আশা করছি।’
এদিকে, নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়টি পুলিশ ও গোয়েন্দা তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বুঝতে পেরে শরণংকর থের আতঙ্কে ভুগছেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে তিনি রাউজানের এক বৌদ্ধ বিহারে আশ্রয় নিয়েছেন।
সূত্র মতে, রোববার (১২ জুলাই) দুপুরে তিনি রাউজানের সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর কাছে ফোন করে নিরাপত্তা ও রাউজানে বসবাসের অনুমতি চেয়েছেন। এমপি ফজলে করিম চৌধুরী আশ্রিত বৌদ্ধ বিহার থেকে বের না হওয়ার শর্তে আপাতত থাকতে বলেছেন। তবে ধর্মের নামে কটূক্তি, অবমাননা সংক্রান্ত উদ্ভুত পরিস্থিতির দায় নিতে পারবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন এমপি ফজলে করিম।
শনিবার (১১ জুলাই) সন্ধ্যায় ইসলাম ধর্ম ও রাসূলকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের দায়ে সংশ্লিষ্ট দুই আইডি-‘রুমন হিমু’ ও ‘রানা সাধু’র বিরুদ্ধে রাঙ্গুনিয়া থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন উপজেলা ছাত্রলীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক রাসেল রাসু।
এর আগে শুক্রবার রাতে শরণংকর থের নিজের ফেইসবুক পেইজে ১৪ মিনিটের একটি ভিডিওবার্তা পোস্ট দেন। সেই ভিডিওবার্তায় চলতে-ফিরতে স্থানীয় লোকজনের হাতে তার সহকর্মীরা বিভিন্ন ধরনের নির্য়াতনের শিকার হচ্ছেন মর্মে অভিযোগের পাশাপাশি তিনি সাম্প্রদায়িক অভিযোগের তীর ছোঁড়েন খোদ রাষ্ট্রযন্ত্র ও সরকারের বিরুদ্ধে।
এই অভিযোগের সুত্র ধরে শনিবার সকালে একুশে পত্রিকার একটি টিম রাঙ্গুনিয়ার দুর্গম এলাকা পদুয়ার ফলাহারিয়ায় অবস্থিত জ্ঞানশরণ মহারণ্য বিহারে যান এবং বিহার-অধ্যক্ষ শরণংকর থের’র সাথে কথা বলেন। কথা বলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীসহ স্থানীয় নানা ধর্মের লোকজন এবং ভুক্তভোগীদের সাথে।
নিয়ম-কানুনের কোনও তোয়াক্কা না করে, সরকারি মামলা, পুলিশ, প্রশাসন সবকিছুকে থোরাই কেয়ার করে একের পর এক বনভূমি দখল এবং সেখানে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরিসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানে।
এরপর শনিবার রাতে সাড়ে ১১টায় ‘বনভূমি দখলের নেশায় উন্মত্ত এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর গল্প’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর তোলপাড় শুরু হয় সংশ্লিষ্ট মহলে। সেইসাথে টনক নড়ে পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থাসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের উচ্চমহলে। মূলত এরপর থেকেই সেই শরণংকর থের’র বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে পুলিশের পাশাপাশি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।