রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১০ কার্তিক ১৪২৭

উত্তরাধিকার-রাজনীতি, চট্টগ্রাম স্টাইল

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, আগস্ট ৬, ২০২০, ৪:৪৯ অপরাহ্ণ


চট্টগ্রাম : প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় সরকারি দলের হুইপ নিযুক্ত হওয়ার পর গত বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে চট্টগ্রামের পটিয়া থেকে তিন তিনবারের নির্বাচিত সাংসদ সামশুল হক চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে টেলিফোনে এক সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন।

‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই পতাকা আমাকে নয়, পটিয়াবাসীকে উপহার দিয়েছেন’ শিরোনামে সেই টেলিফোন-সাক্ষাৎকারে হুইপ সামশুল হক চৌধুরী তুলে ধরেছিলেন ঘাম ঝরিয়ে, কাটখড় পুড়িয়ে আজকের অবস্থানে আসার নেপথ্যগল্প।

আক্ষেপ করে বলেছিলেন ‘মাত্র ১৫ বছর আগে আমি যখন ‘পটিয়া আমার, আমি পটিয়ার’ শীর্ষক পোস্টার সাঁটি পটিয়ায়, তখন অনেকে হাসাহাসি করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘পুরাতন পাগলের ভাত জোটে না, নতুন পাগল এসে হাজির হয়েছে’। খুব বেশি সময় লাগেনি, মাত্র ৩-৪ বছরের ব্যবধানে এমপি হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর আনুকূল্যে পটিয়াকে পাল্টে দেওয়ার মধ্যদিয়ে আমি প্রমাণ করেছি আসলেই পটিয়া আমার, আমি পটিয়ার। আমি কখনো ভাবিনী আমাকে দিয়ে পটিয়ার এত উন্নয়ন হবে। রাজনীতিতে স্থান করার পাশাপাশি পটিয়ার মানুষের অন্তরে স্থান করে নিতে আমাকে অনেক কষ্টসহিষ্ণু পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, যে পথ আমার সন্তানকে আর পাড়ি দিতে হবে না। আমার সন্তান (শারুন চৌধুরী) রাজনীতি করতে চাইলে তাকে আর কষ্ট করতে হবে না। কষ্ট যা করার আমিই করে ফেলেছি।’

রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, হুইপ সামশুল হক চৌধুরী মোটেও বাড়িয়ে বলেননি। কারণ এটাই এখন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সত্যকথন। পৈত্রিক রাজনীতি বা উত্তরাধিকার রাজনীতির হাত ধরে চট্টগ্রামেও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ‘উত্তরাধিকার রাজনীতি’। জীবনে কখনো রাজনীতি না করেও বাবার কল্যাণে মন্ত্রী-এমপি এবং দলের শীর্ষস্থানীয় পদে আসীন হয়েছেন চট্টগ্রামে এমন সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরাধিকারের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার এই প্রবণতা উত্তরাধিকারের তকমা ছাড়া তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক নেতাদের রাজনীতিকে দিনদিন কঠিন করে তুলছে। সুষ্ঠু, সুস্থ রাজনীতির জন্য এই সংস্কৃতি কখনো সুখকর নয়। দুর্দিন-দুঃসময়ে খেয়ে-না খেয়ে দলের হাল ধরেছেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক প্রশ্নে জীবনের ঝুঁকি নিতেও কুণ্ঠা করেননি, তাদের অনেকেই উত্তরাধিকার রাজনীতির যাঁতাকলে আজ নিষ্পেষিত, রাজনীতিবিমুখ।

চট্টগ্রামের রাজনীতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, উত্তরাধিকার তকমায়, পিতার কল্যাণে অনেকেই রাজনীতিতে পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে এসেছেন। মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন, জীবনে কখনও রাজনীতি না করে পেয়েছেন দলের বড় বড় পদ-পদবী।

চট্টগ্রামে আওয়ামী রাজনীতির পুরোধা ব্যক্তিত্ব, আওয়ামী লীগের দুর্দিন-দুঃসময়ের কাণ্ডারি আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু মারা যাওয়ার পর তার শূন্য আসনে ২০১৩ সালের শুরুর দিকে এমপি হয়ে আসেন তার জ্যেষ্ঠপুত্র চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। বাবার কল্যাণে এমপি হয়েছেন তা শুধু নয়, কিছুদিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ফের দলের মনোনয়নে দ্বিতীয়বার এমপি হয়েই ভূমি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন জাবেদ। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে তৃতীয়বার এমপি হয়ে পদোন্নতি পেয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হন জাবেদ।

একইভাবে উত্তরাধিকার রাজনীতির তকমা গায়ে মেখে পরপর দুইবার এমপি হন আওয়ামী লীগের প্রয়াত প্রেসিডিয়াম সদস্য আতাউর রহমান খান কায়সার ও চট্টগ্রাম মহিলা আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি নিলুফার কায়সারের জ্যেষ্ঠ কন্যা ওয়াশেকা আয়েশা খান।

জনশ্রুতি আছে, ব্যাংকের উচ্চ পদে চাকরি করা ওয়াশেকাকে জীবদ্দশাতেই সংরক্ষিত আসনের এমপি করতে চেয়েছিলেন বাবা আতাউর রহমান খান কায়সার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন সায় না দিলেও পরবর্তীতে এই রাজনীতিবিদ দম্পতির সন্তান ওয়াশেকা আয়েশা খানকে পরপর দুইবার সংরক্ষিত আসনের এমপি করেন প্রধানমন্ত্রী। শুধু তাই নয়, গত বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সম্মেলনে এমপি ওয়াশেকা আয়েশা খানকে কেন্ত্রীয় আওয়ামী লীগের অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক করেন আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা।

চট্টলবীর খ্যাত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সন্তান ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও পৈত্রিক সূত্রে অল্পদিনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবী পান একের পর এক। পিতার জীবদ্দশাতেই প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা এক লাফেই ৩৩ বছর বয়সে নওফেলকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক করেন। এর দুইবছরের মাথায় ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে চট্টগ্রামের সবচেয়ে প্রেস্টিজিয়াস আসন চট্টগ্রাম-৯ থেকে দলীয় টিকিটে এমপি নির্বাচিত করেই থেমে থাকেননি, নওফেলকে শিক্ষা উপমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রীসভায় ঠাঁই দেন প্রধানমন্ত্রী। অবশ্য মন্ত্রীপরিষদের কনিষ্ঠ সদস্য ও এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও গত সম্মেলনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়েন নওফেল।

চট্টগ্রামের রাজনীতির জীবন্ত কিংবদন্তি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তিল তিল করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন রাজনীতির বটবৃক্ষ হিসেবে। নেতা বানানোর কারিগর বলা হয় তাকে। রাজনীতিতে অনেক নেতা তৈরি করেছেন তিনি। তাঁর উর্বর রাজনৈতিক হাত ধরে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সেই অনুযায়ী নিজের কোনো সন্তানকে রাজনীতিতে খুব একটা প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি মোশাররফ হোসেন। দ্বিতীয় পুত্র মাহবুবুর রহমান রুহেলকে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সদ্য বিদায়ী কমিটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদদের পদে বসালেও রুহেলের রাজনৈতিক তৎপরতা খুব বেশি চোখে পড়ছে না। অনেকের মতে. সম্ভাবনা এবং রাজনীতির প্রতি আগ্রহ না থাকলে জোর করে পদপদবী চাপিয়ে দিয়ে কাউকে রাজনীতিবিদ বানানো যায় না।

সন্দ্বীপের মাহফুজুর রহমান মিতা বাবার পরিচয়ে আজ সন্দ্বীপ থেকে দুদুবারের এমপি। বাবা দ্বীপবন্ধু শিল্পোদ্যোক্তা মোস্তাফিজুর রহমান আওয়ামী লীগের দুর্দিন-দুঃসময়ের নেতা। ‘৯১ সালে এমপি নির্বাচিত হন নৌকা প্রতীকে। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে মিতার রাজনৈতিক অভিষেক ঘটে উত্তরাধিকার তকমায়।

রফিকুল আনোয়ার ছিলেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো ফটিকছড়ি থেকে নৌকা প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন রফিকুল আনোয়ার। একইভাবে ২০০১ সালে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের ভরাডুবির সময় যে দুটি আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী নির্বাচিত হন, তার একটি রফিকুল আনোয়ারের ফটিকছড়ি আসন।

রফিকুল আনোয়ার প্রয়াত হওয়ার পর তার মেয়ে খাদিজাতুল আনোয়ার সনিকে মাত্র ২৫ বছর বয়সে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সরাসরি আসনে দলের মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়া হয়। যদিও জোটবদ্ধ নির্বাচনের স্বার্থে সেই আসন তাকে ছাড়তে হয়। এর আগে তাকে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে স্থান দেওয়া হয়। এরপর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ৩২ বছর বয়সে সংরক্ষিত আসনের এমপি হন রফিককুল আনোয়ার কন্যা খাদিজাতুল আনোয়ার সনি।

জনশ্রুতি আছে, আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের আশীর্বাদে জীবনে ন্যূনতম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত না থেকেও আওয়ামী লীগের জেলা নেত্রী অতঃপর সংসদ সদস্য পর্যন্ত হয়েছেন খাদিজাতুল আনোয়ার সনি। কেবল তা নয়, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সদ্য প্রস্তাবিত কমিটিতে সনির নাম দেওয়া হয়েছে ১ নং সাংগঠনিক সম্পাদক পদে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বি.এসসির জ্যেষ্ঠ সন্তান মুজিবুর রহমানও বাবার পরিচয়ে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় আছেন। দলের উল্লেখযোগ্য পদ-পদবীতে না থাকলেও গেল সংসদ নির্বাচনে অন্যতম মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন।

পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের বিরোধী দলীয় নেতা এবিএম ফজলুল কবির চৌধুরীর সন্তান এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর আওয়ামী রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রামের রাউজান আসনে দলীয় মনোনয়ন লাভের মাধ্যমে্। প্রথমবার বিএনপি প্রার্থী গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর কাছে অল্প ভোটে পরাজিত হলেও ২০০১ সালে বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হন ফজলে করিম চৌধুরী।

বলাবাহুল্য, সেবার চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ মাত্র দুটি আসন পেয়েছিল। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে। ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ সালে পরপর চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ফজলে করিম চৌধুরী। দায়িত্ব পালন করেছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটর সভাপতি হিসেবে। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন কিছুদিন।

বাবার পথ ধরে একমাত্র সন্তান ফায়াজ করিম চৌধুরী এখন বেশ সরব। রাজনীতিতে দৃশ্যমান বড় কোনো পদে না থাকলেও নিজ ফ্ল্যাটফরম থেকে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে রাউজানে বিভিন্ন গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রয়েছেন। নিজস্ব কিছু কনসেপ্ট নিয়ে রাউজানের ঘরে ঘরে পৌঁছার চেষ্টা করছেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, এসব গঠনমূলক কর্মসূচির মধ্যদিয়ে পিতার অবর্তমানে রাউজানের হাল ধরতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন ফারাজ করিম চৌধুরী।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর আব্দুল্লাহ আল হারুন চৌধুরী। ছিলেন বঙ্গবন্ধু আমলের এমপি ও সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য। প্রয়াত হয়েছেন ২০০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। তার কন্যা শামীমা হারুন লুবনা দীর্ঘদিন নিজ কর্মক্ষেত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও রাজনীতির সাথে যুক্ত হননি। সম্পৃক্ত ছিলেন রোটারি ক্লাবে। কিন্তু উত্তরাধিকার রাজনীতির সংস্কৃতি ক্রমশ গুরুত্ব পাওয়ায় বছর দুয়েক আগে হঠাৎই তিনি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। এসেই দক্ষিণ জেলা মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। গেলবার সংরক্ষিত আসনের এমপি হতে মাঠ-ঘাট চষে বেড়ালেও চট্টগ্রাম থেকে এমপি হন উত্তরাধিকারের দুই কন্যা যথাক্রমে ওয়াশেকা আয়েশা খান ও খাদিজাতুল আনোয়ার সনি। বরাবরের মতো বঞ্চিত হন তৃণমূল থেকে উঠে আসা কর্মীরা।

এছাড়াও বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী জহুর আহমেদ চৌধুরীর সন্তান মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর এম এ আজিজের সন্তান সাইফুদ্দিন খালেদ বাহার মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ মান্নানের জ্যেষ্ঠ পুত্র আবদুল লতিফ টিপু চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে নির্বাচিত দুইবারের সাংসদ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রয়াত সভাপতি আবুল কাশেম মাস্টারের জ্যেষ্ঠ সন্তান এস এম আল মামুন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবলীগের সভাপতি ও সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
উত্তরাধিকার তকমা থাকলেও উল্লিখিত সবাই তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে উঠে এসেছেন। কেউ কেউ ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে রাজনীতি করেছেন। সীতাকুণ্ড থেকে নির্বাচিত হয়েছেন দুবার উপজেলা চেয়ারম্যান।

অন্যদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও মেয়র মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন রাজনীতিতে তার জ্যেষ্ঠ সন্তান মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। পেশায় আইনজীবী ব্যারিস্টার হেলাল উত্তরাধিকার সূত্রে কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য হলেও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পারিচালনায় নিজের যোগ্যতা ও মেধার প্রমাণ রাখছেন। বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের যোগ্য সন্তান সাঈদ নোমান। কিন্তু রাজনীতিতে তার অভিষেক ঘটাননি নোমান। বাবার গড়া প্রতিষ্ঠান ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন নোমান-তনয় সাঈদ।

এছাড়া সাবেক সরকারদলীয় হুইপ ও বিএনপির প্রয়াত নেতা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের কন্যা ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা বাবার হাত ধরে বিএনপি রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চেয়েছিলেন। হাটহাজারী থেকে দলের অন্যতম মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন গেল নির্বাচনে। কিন্তু জঙ্গী-কানেকশন সংক্রান্ত মামলায় জড়িয়ে খুব বেশি আগাতে পারেননি তিনি। একপর্যায়ে লন্ডনে পাড়ি জমান। বর্তমানে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে সেখানেই বসবাস করছেন শাকিলা।

এদিকে সাবেক ডেপুটি মেয়র ও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক দস্তগীর চৌধুরীর সন্তান ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর চৌধুরীও রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন। বড় কোনো পদে না থাকলেও বাবার তকমা গায়ে মেখে গেল সংসদ নির্বাচনে ডবলমুরিং আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন ব্যারিস্টার ফয়সাল।

এছাড়া বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক এমপি গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সন্তান, ক্রীড়া সংগঠক সামির কাদের চৌধুরীও বিএনপি থেকে বাপ-দাদার পরিচয়ে মনোনয়ন চেয়েছিলেন গত নির্বাচনে।

এর অংশ হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও যুদ্ধাপরাধের দায়ে বড় চাচা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি হওয়া, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জীবননাশের হুমকির মামলায় বাবা গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সাজা অতপর নানা সংকটের মুখে আপাতত প্রকাশ্য না হলেও পরবর্তীতে সামির চৌধুরী রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন তা অনেকটাই নিশ্চিত।

উত্তরাধিকার রাজনীতি প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘রাজনীতিতে প্রথমে সমর্থক, পরে কর্মী, তারপর নেতৃত্বের জায়গায় যাবে- এটাই নিয়ম। এভাবে কেউ যখন একটা পদ পায়, এর পেছনে রাজনীতির প্রতি তার ঐকান্তিকতা, তার দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস, জনগণের ও দেশের প্রতি ভালোবাসা থাকে।’

‘কিন্তু এখন রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন যেমন হয়েছে, তেমনি উত্তরাধিকায়নও হয়েছে। গণতন্ত্রের কোন ফর্মে এ বিষয়টা অ্যালাউ করে না একেবারে। এটা রাজতন্ত্রের বিষয়- রাজার ছেলে রাজা হবে। রাজার ছেলে রাজা হওয়ার এই ধারণাটা পৃথিবীতে ভেঙে গেছে, যেখানেই আছে আলংকারিক অর্থেই আছে।’

তিনি বলেন, ‘নেতার ছেলে নেতা হবে- এমনটা উন্নত বিশ্বে নেই, থাকার কথাও না। গণতান্ত্রিক চর্চা কিংবা সুশাসন যেখানে আছে সেখানে নেতার ছেলে নেতা হবে, এটা কোন ক্রাইটেরিয়া না। নেতার ছেলে নেতা হতে পারে, কিন্তু সেটা ব্যতিক্রম। সে যদি ওই জায়গাটা অর্জন করতে পারে, তার মেধা, প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, লড়াই সংগ্রাম, চর্চা, সাধনার মধ্য দিয়ে যেতে পারে।’

সুজন চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘এখন বড় দলে সবাই ‘দলদাস’ হয়ে গেছে। এজন্য উত্তরাধিকারের রাজনীতি মেনে নেয়। রাজনীতি এখন ব্যবসায়ী, ঋণ খেলাপি, সন্ত্রাসী, দুর্বৃত্তের হাতে চলে গেছে। ফলশ্রুতিতে যা হওয়ার তাই হয়েছে। তাদের ছেলে নেতা হয়েছে, ভবিষ্যতে নাতি নেতা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজনীতির যে সুফল সেটা মানুষ পাচ্ছে না। দিন শেষে সমাজ, দেশ তো চালাবে রাজনীতিকরাই, সেই জায়গাটা কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উত্তরাধিকারের রাজনীতির জন্য।’