শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭

করোনার ধাক্কা, মটর সাইকেলের হাতলে শিক্ষকের হাত!

প্রকাশিতঃ রবিবার, জুলাই ২৬, ২০২০, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ


রকিব কামাল : করোনা সংক্রমণ ঝুঁকিতে যেখানে প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বেরোতে নিষেধ, সেখানে মহামারির মাঝেও পেটের দায়ে রাস্তায় নেমেছেন অনেকে। সৃষ্ট সংকটে টিকে থাকার নিরান্তর চেষ্টায় বহু মানুষের আয় ও কর্ম দুটোই বন্ধ হওয়ায় বদল হয়েছে পেশা।

চট্টগ্রামের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের অংশীদারদের একজন চক-ডাস্টারের কথা বেমালুম ভুলে মোটসাইকেলের হাতলে রেখেছেন হাত। সর্বশেষ দুমাস ধরে এ মোটরসাইকেলের চাকায় যে আয় হচ্ছে, তাই দিয়ে পার করছেন দিন।

শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে মধ্যবয়সী ওই ব্যক্তির সাথে কথা হয় নগরের দুনম্বর গেইট এলাকায়। মোটরসাইকেলে বসে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। মোটরসাইকেলের পেছনে যাত্রীর জন্য রেখেছেন হেলমেট।

কথা বলতে গিয়ে বেশ অস্বস্থিবোধ করছিলেন তিনি। জানতে চাইলে একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, কয়েকজন বন্ধু মিলে শিশুদের বিদ্যালয় চালু করেছিলাম। কিন্তু করোনা তো সব শেষ করে দিল। সরকারি সিদ্ধান্তের সাথে আমাদের প্রতিষ্ঠানও বন্ধ করে দেই। সীমিত পরিসরে অফিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খুললেও, আমাদের স্কুল বন্ধ রয়েছে। কবে খুলবে তাও জানি না। দিন দিন পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে পড়ে গত মাসের শুরু থেকে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন জানিয়ে স্কুলের এবং নিজের নাম প্রকাশে অপরাগতা প্রকাশ করেন তিনি। জানান, বেশ কয়েক মাস আগেও স্কুল চালিয়ে আনুষঙ্গিক খরচ মিটিয়ে ভালোই চলছিল তাঁর। স্ত্রী, দুই সন্তান আর মা-বাবা নিয়ে নগরের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। স্কুল চালিয়ে জমানো কিছু টাকা দিয়ে চললেও, ভবিষ্যতে বিপদের কথা ভেবে সড়কে নেমেছেন।

তাঁর মতো বেশ কয়েকজন যুবকের দেখা মিলবে নগরের ব্যস্ততম অক্সিজেন, মুরাদপুর, জিইসি, দেওয়ানহাট মোড়, নিউ মার্কেট, আগ্রাবাদ মোড়, নতুন ব্রিজ এলাকায়। দরদাম ঠিক হলে তারা পৌঁছে দেন যাত্রী। আর অন্য সময়ে অ্যাপভিত্তিক রাইডে চলাচল করা যাত্রীরাই তাদের মূল লক্ষ্য।

করোনার প্রকোপ বৃদ্ধির পর থেকেই জনসমাগম এড়িয়ে চলাসহ দূরত্ব বজায় রাখতে নির্দেশনা দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। মাস্ক পরাসহ কমপক্ষে তিন ফিট দূরত্বের বিষয়ে বলা হয়। অথচ মোটরসাইকেলে যাত্রী উঠালে শরীর ঘেঁষেই বসতে হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কিনা তা খালি চোখে বোঝার উপায় থাকছে না।

আগ্রাবাদ মোড় এলাকায় প্রতিদিন মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করেন সুজন। যখন কোনো যাত্রী দেখছেন জিজ্ঞেস করছেন কোথায় যাবেন ভাই? দূরত্বের সাথে দামের দরদাম হলে তুলে নেন যাত্রী। পুরোটা দিন মোটরসাইকেল নিয়ে নগরে এদিক সেদিক যাত্রী পার করেন।

সুজন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ভয়তো কাজ করে, চেষ্টা করি যতটুকু পারি সুরক্ষা বজায় রেখে কাজ করতে। হাতে টাকা-পয়সা নেই, কোথাও কাজ পাচ্ছি না। মোটরসাইকেল চালিয়ে যা পাই, তা দিয়ে কোনোভাবে পরিবারে সহায়তা করছি।

এখন কেমন আয় হচ্ছে-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দিনে ৫০০-৫৫০ টাকা পেতাম। কিন্তু কয়েকদিন টানা বৃষ্টিতে যাত্রী পাইনি। আর যাত্রী ম্যানেজ করার সিস্টেমটা ঠিক জানা নেই। দিনের খরচটাই তুলতে পারিনি।

তাঁর মতোই মহামারীতে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে পেশা বদলিয়েছেন মো. নুরুল হক নামে এক যুবক। নগরীর একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করতেন। করোনায় বেচা-বিক্রি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মালিক বিপাকে পড়েছেন। বেতন নিয়মিত না হওয়ায়, উপায়ন্তর না দেখে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন কয়েক মাস ধরে।

এই বাইক রাইডার একুশে পত্রিকাকে জানান, প্রতিদিন বেশ কয়েকজনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে হচ্ছে। ঝুঁকিও জেনেও অনিশ্চয়তার কথা ভেবে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন। পাশাপাশি অন্য চাকরির জন্য চেষ্টা করছেন বলেও জানান তিনি।