সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২০, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

মগনামাঘাট এখন ইয়াবা পাচারের ট্রানজিট পয়েন্ট

প্রকাশিতঃ সোমবার, জুলাই ২৭, ২০২০, ১২:৫৯ অপরাহ্ণ


মোহাম্মদ হিজবুল্লাহ, পেকুয়া (কক্সবাজার) : পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়নটি উপকূলীয় এলাকা। কুতুবদিয়া পারাপারে মগনামাঘাটই বড় ভরসা। কিন্তু মানুষ পারাপারের এই ঘাট এখন ইয়াবা পাচারের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসাবে গড়ে তুলেছে স্থানীয় তিনটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

এই তিন সিন্ডিকেটে রয়েছে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাসহ প্রভাবশালীরা। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে ইয়াবাপাচার অব্যাহত রাখায় নদী পারাপারের ঘাটটি এখন ইয়াবা পাচারের ঘাট নামে পরিচিতি পাচ্ছে।

এ ঘাট দিয়ে অত্যন্ত নিরাপদে মায়ানমার থেকে নদীপথে ইয়াবা এনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। নৌপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি কম থাকায় ইয়াবার বড় মাপের চালানগুলো পাচার করতে সক্ষম হচ্ছেন ইয়াবা সিন্ডেকেটের সদস্যরা। এই ঘাট দিয়ে ইয়াবা পাচারে বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করছেন পাচারকারীরা। কখনও যাত্রী, কখনও ব্যবসায়ী, কখনো জেলের ছদ্মবেশ ধারণ করে এই পাচার কাজ সম্পাদন করছেন তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব সিন্ডিকেটের সদস্যরা তিন স্তরের বলয় তৈরি করে ইয়াবা পরিবহন করেন। যারা সরাসরি ইয়াবা বহন করেন, তারা থাকেন প্রথম স্তরে। প্রথম স্তরের সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাদের ছাড়িয়ে নিতে নগদ টাকা নিয়ে সংবাদকর্মী বা রাজনৈতিক নেতা পরিচয়ে কাজ করেন দ্বিতীয় স্তরের সদস্যরা। ১ম ও ২য় স্তরের সদস্যদের তদারকি করতে সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করেন সিন্ডিকেট প্রধানের বিশ্বস্থ ব্যক্তি। এই তিন সিন্ডিকেটে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন ইউনিয়নের প্রায় ২০-৩০জন ব্যক্তি।

মগনামা ঘাট এলাকায় বিগত তিনদিন (রাত-দিন) নিবিড় পর্যবেক্ষণে মিলেছে ইয়াবা পাচারের সত্যতা। পাচারকারীরা কৌশলী অবস্থান নিয়ে যাত্রীবাহী সিএনজি অটোরিকশা অথবা সামুদ্রিক মাছ বোঝাই ট্রাকে তুলে দেন ইয়াবা। গভীর রাতে (২টা-৩টার মধ্যে) করা হয় ইয়াবাবোঝাই। ভোরের আলো ফোটার আগেই যাত্রা শুরু করে গন্তব্যে। রাত ১২টার পর থেকে ঘাটে কারো দেখা না মিললেও ২টা থেকে আনাগোনা বাড়তে থাকে সিন্ডিকেট সদস্যদের। প্লাটফর্মে নির্দিষ্ট গাড়ি অপেক্ষারত থাকে তাদের জন্য। এসব গাড়িতে করে ইয়াবা চলে যায় চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। ভোররাতে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর চোখ ফাঁকি দেয়া সহজ। তাই খুব একটা বাধাগ্রস্ত হতে হয় না পাচারকারীদের।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে স্থানীয়রা জানান, মগনামা ঘাট এলাকাসহ পুরো মগনামায় কয়েকটি সিন্ডিকেটে ইয়াবা কারবারে যারা জড়িত, তারা হলেন ধইন্যার পাড়া এলাকার শফি আলমের ছেলে এখলাসুর রহমান, একাধিকবার পুলিশের জালে ধরা পড়া ফতে আলীমার পাড়া এলাকার উকিল আহমদের ছেলে নুরুল আলম, তার স্ত্রী ও চিহ্নিত ইয়াবা সাম্রাজ্ঞী শাহনাজ পারভিন, ঘাটমাঝির পাড়া এলাকার মঞ্জুর আলমের ছেলে মো. হাসেম প্রকাশ (বেন্ডিয়া), ফতে আলীমার পাড়া এলাকার মোজাম্মেল হকের ছেলে মো. ফারুক, নাপিত পাড়া এলাকার সুশান্ত শীলের ছেলে বিমল কান্তিশীল, বিমলের স্ত্রী খুকি রাণী শীল, বাজারপাড়া এলাকার মৃত জব্বারের ছেলে নুরুল আমিন, বাজারপাড়া এলাকার ছৈয়দ নুরের ছেলে আইয়ুব, বাজারপাড়া এলাকার আবুল হোছেনের ছেলে বদ, ফতে আলীমার পাড়া এলাকার মৃত নুরুল আমীনের ছেলে লিয়াকত আলী। বেশ কয়েকদিন আগে ইয়াবার বড় চালান নিয়ে চট্টগ্রামে পুলিশের হাতে আটক হন লিয়াকত আলী। মিয়াজী পাড়া এলাকার আব্দুন নবীর ছেলে আবু ছালেকসহ আরো ১০-১২জন সক্রিয় সদস্য।

এছাড়াও নুন্নার পাড়া এলাকার বিদেশফেরৎ কবির আহমদের ছেলে মোস্তাক মিয়ার বিরুদ্ধেও ইয়াবা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। তার নানামুখি ব্যবসার বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে একটি কিশোর গ্যাং, যে গ্যাং তার হাত ধরে গড়ে উঠেছে। সাগরে মোস্তাক মিয়অর কয়েকটি বোট রয়েছে, যা ইয়াবার আনা-নেওয়ায় ব্যবহৃত হয়ে বলে জানা গেছে।

পেকুয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কামরুল আজম বলেন, ‘ইয়াবার বিরুদ্ধে পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানে রয়েছে। মগনামাঘাটে নজরদারি বাড়ানো হবে। ইয়াবা ব্যবসায় যে বা যারাই জড়িত, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’