শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

চট্টগ্রাম জিপিওতে মুনাফার টাকা তুলতেও ঘুষ!

| প্রকাশিতঃ ৬ অগাস্ট ২০২০ | ৩:৩৩ অপরাহ্ন


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : চট্টগ্রাম জিপিও (জেনারেল পোস্ট অফিস) এর সঞ্চয় শাখা থেকে সঞ্চয়পত্র কেনার পর মুনাফা পেতে ঘুষ দিতে হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের। ঘুষ না দিলে মুনাফার টাকা তুলতে পদে পদে হয়রানি করা হচ্ছে; এ নিয়ে ভুক্তভোগীরা কোন প্রতিকারও পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, ৩ বছর মেয়াদে ১ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রে মুনাফা পাওয়া যায় ২ হাজার ৪৮০ টাকা করে, যা উত্তোলন করা যায় ৩ মাস অন্তর অন্তর। এভাবে বিভিন্ন অংকের সঞ্চয়পত্র কিনে তিন মাস অন্তর নির্দিষ্ট অংকের মুনাফা গ্রহণ করা যায়।

কিন্তু মুনাফা উত্তোলন করতে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয় উত্তোলনকারীদের। কিন্তু তাতেও বিরক্ত হন না তারা। অসন্তুষ্ট হন তখনই যখন শুনতে হয় মুনাফার টাকা নিতে ঘুষ দিতে হবে। না হলে সিরিয়াল যাবে সবার শেষে, ঘুরতে হবে ঘন্টার পর ঘন্টা। আর এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হয় গ্রাহকদের। সঞ্চয়পত্র কিনতে আসাসহ প্রতিটি কাজের জন্য এখানে গ্রাহকদের পড়তে হয় এ রকম নানা হয়রানিতে। আর এ হয়রানি এখানে নিত্যদিন।

মুনাফা উত্তোলন করতে প্রতিজন থেকে ২০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত নিয়ে ফেলছে চট্টগ্রাম জিপিও’র কর্মীরা। টাকা দিলে ভেতরে নিয়ে সবার আগে দিয়ে ফেলে মুনাফা, আর না দিলে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ২-৩ ঘন্টা। এমনকি গ্রাহকদের সাথে করা হচ্ছে খারাপ ব্যবহার, এমনটাই অভিযোগ করেছেন মুনাফা ভিত্তিক সঞ্চয়ের টাকা তুলতে যাওয়া বেশ কয়েকজন গ্রাহক।

এসব কাজে পিও অপারেটর মো. জামাল, অভ্যর্থনা কক্ষের পিও অপারেটর নুরুল হক জড়িত বলে অভিযোগ। এছাড়া সাধারণ সঞ্চয় শাখায় পিও অপারেটর মো. হাসান, নৈশ ডাকঘর সঞ্চয় শাখায় সহকারী পোস্টমাস্টার নজরুল ইসলাম গ্রাহকদের হয়রানি করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় চট্টগ্রাম জিপিও অফিসে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে। বুধবার (৫ আগস্ট) সকাল ১১ টা থেকে ৩ টা পর্যন্ত জিপিও চট্টগ্রামের সঞ্চয় ব্যাংক পরিদর্শন করে একুশে পত্রিকা। পূর্বে চারটি কাউন্টার থাকলেও একটি বন্ধ রয়েছে। ফলে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে গ্রাহকদের। হিসাব শাখার কর্মকর্তাদেরও দেখা গেছে ইচ্ছে করেই ধীর গতিতে কাজ করতে। গ্রাহক নিজের অসুবিধার কথা জানিয়ে দ্রুত কাজ করার কথা বলাতে হিসাব শাখার কর্মকর্তা শুনিয়ে দিচ্ছেন দু’চার কথা। ফলে বিরক্ত হয়ে টাকা দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন গ্রাহকেরা।

ঘড়ির কাঁটায় সময় তখন ১২ টা। প্রতিবেদককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একজন লোক জিজ্ঞেস করেন, টাকা তুলতে এসেছেন? প্রতিবেদক হ্যাঁ বলাতে লোকটি বলেন, ৩০০ টাকা দিলে ১০ মিনিটের মধ্যে আপনার সমস্ত হিসেব বুঝিয়ে দিবো। প্রতিবেদক নিজের পরিচয় দিয়ে বিষয়টির বিস্তারিত জানতে চাওয়ার সাথে সাথেই ঘটনাস্থল থেকে সরে যায় লোকটি।

ঘন্টাখানেক পর সেই লোকটিকে আবার দেখা যায় জিপিও অফিসে। নাম প্রকাশ না করার কথা দিয়েই তার কাছে জানতে চাওয়া হয় এই বিষয়ে। তিনি বলেন, আপনাকে স্যারদের নাম বলতে পারবো না। তবে টাকা নিয়ে যাদের কাজ করে দেই, সেখান থেকে ৫০-৬০ টাকা জনপ্রতি আমরা পাই। বাকিটা স্যারদের পকেটে যায়।

জিপিও চট্টগ্রামের সঞ্চয় ব্যাংকে ৩ মাস অন্তর মুনাফা ভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে মূল টাকা এবং মুনাফার টাকা নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তির কথা জানান বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আবির। একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, মায়ের কেনা সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়েছে আজ। মাকে নিয়ে তাই এসেছি মুনাফাসহ মূল টাকা তুলতে। বয়স্ক মা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন না, তাই নিজেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকি সিরিয়ালের। সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়েও পাইনি স্লিপের সিরিয়াল, উল্টো অফিসাররা বলেছেন যা তা। তাই বাধ্য হয়েই দালালের মাধ্যমে টাকা তুলেছি। এজন্য দিতে হয়েছে ২০০ টাকা।

মুনাফার টাকা তুলতে আসা আরেক ভুক্তভোগী সীমান্ত বড়ুয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘জিপিও অফিসের দরজার বাইরে লিখা আছে বিভাগীয়দের অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু সেখানে বহু দালাল ঘুরাফেরা করে। যারা গ্রাহকদের কাছে এসে সঞ্চয়পত্রের স্লিপ নিয়ে টাকা উত্তোলনের কাজ করে দেয়। বিনিময়ে দিতে হয় ঘুষ। আদর করে এর নাম দেয়া হয়েছে বকশিস। মূলত এই কাজটা করে ওদের বেশ ভাল রকমের একটা ইনকাম হয়। তাই লাইনের বাইরের লোকদের তারা টাকা খেয়ে সুবিধাটা দিয়ে যায়। এটা সবসময়ের দৃশ্য, যখনই সঞ্চয় ব্যাংকে যাই তখনই এই ভোগান্তির সম্মুখীন হই।’

অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম জিপিও’র পোস্টমাস্টার (সঞ্চয়) নিপুল তপস বড়ুয়া একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আসলে দুর্ব্যবহার যে করা হচ্ছে না তা নয়। যখন গ্রাহকেরা অফিসারদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেন তখন তারাও তাদের দু-এক কথা শুনিয়ে দেন। এরকম অভিযোগ পাওয়াতে গত সপ্তাহেও ৩ জনকে ট্রান্সফার করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, কর্মকর্তারা যে টাকা নিচ্ছেন না, তা আমি বলবো না। তবে তা সংখ্যায় খুবই কম, প্রতি ১’শ জনের মধ্যে দুই-একজনের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে। তবে এই বিষয়টি আমি নিজে দেখছি। বেশকিছু নিয়মও পরিবর্তন করেছি। আশা করছি, ভবিষ্যতে গ্রাহকরা এ ধরণের কোনো সমস্যার সম্মুখীন ববেন না।

সঞ্চয় শাখায় গ্রাহক হয়রানির বিষয়ে কথা চট্টগ্রাম জিপিও’র সিনিয়র পোস্টমাস্টার নিজাম উদ্দিন বলেন, আমরা লিখিত অভিযোগ পেলে এসব অনিয়মের ব্যাপারে গুরুত্ব সহকারে সাথে সাথে ব্যবস্থা নিচ্ছি। কেউ হয়রানির শিকার হয়ে সঞ্চয়পত্রের নাম-নাম্বার সহ অভিযোগ করলে সাথে সাথেই ব্যবস্থা নেব। ইতিপূর্বে এরকম অভিযোগ যারা করেছেন আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।