বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৮ আশ্বিন ১৪২৭

ওসি প্রদীপনামা

প্রকাশিতঃ শুক্রবার, আগস্ট ৭, ২০২০, ৯:৩৭ অপরাহ্ণ


জসিম উদ্দীন, কক্সবাজার : প্রায় দুই বছর ধরে টেকনাফে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আদায়, কথিক বন্দুকযুদ্ধের নামে দরিদ্র ইয়াবা পাচারকারী ও নিরীহ মানুষকে হত্যা করে বড় মাদক কারবারিদের রেহাইয়ের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।

মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানি, নির্যাতন ও লুটপাটের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে রয়েছে থানায় আটকে রেখে নারীদের ধর্ষণের অভিযোগও। বন্দুকযুদ্ধের নামে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে ধামাচাপা দিয়েছেন সে সব অভিযোগের পাহাড়।

তিনি টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ; সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে গুলি করে হত্যার মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গতকাল বৃহস্পতিবার সাত দিনের জন্য র‌্যাব হেফাজতে পাঠিয়েছে আদালত।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের পর ওসি প্রদীপ কুমার দাশের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন ভুক্তভোগীরা। অথচ কয়েকদিন আগেও ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত ভাইয়ের লাশ কাঁধে নিয়েও কান্নার পরিবর্তে ওসি প্রদীপের পক্ষে সাফাই গাইতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছেন তারা। এখন সে সব ঘটনার প্রতিকার পেতে আদালতের শরণাপন্ন হতে চান ভুক্তভোগীরা।

গতকাল বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) ওসি প্রদীপকে আটকের খবরে টেকনাফ থানার সামনে জড়ো হয় শত শত মানুষ।সেখানে উপস্থিত হন শতাধিক ভুক্তভোগী। তারা ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা আদায় ও ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে মামলা করার কথাও জানান তারা।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, টেকনাফ হোয়াইক্যং এলাকার আনোয়ার নামের এক ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে গিয়ে অর্ধকোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন ওসি প্রদীপ। টাকা দিতে না পারায় তিনদিন পর কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে তাকে হত্যা করা হয়।

এ বিষয়ে প্রতিকার পেতে নিহতের মেয়ে এবং বোন কক্সবাজার আদালতে যান। খবর পেয়ে ওই দুই নারীকে তুলে নিয়ে ওসি প্রদীপের লোকজন। তাদের থানায় আটকে রেখে টানা ৫ দিন গণধর্ষণের পর ইয়াবা দিয়ে চালান দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিষয়টি নিয়ে ‘কক্সবাজার বাণী’ পত্রিকার সম্পাদক ফরিদুল মোস্তাফা প্রতিবেদন প্রকাশ করায় তাকে ঢাকার বাসা থেকে ধরে নিয়ে এসে নির্মম নির্যাতনের পর অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজি মামলা দিয়ে জেলে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে। সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তাফা এখনো কারাগারে রয়েছেন।

এদিকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, টেকনাফ নাজির পাড়ার নূর মোহাম্মদকে ধরে নিয়ে গিয়ে ৪৫ লাখ টাকা দাবি করেন ওসি প্রদীপ। নগদ ৩ লাখ টাকা, ব্যবহারের স্বর্ণালংকার নিয়ে নুর মোহাম্মদের স্ত্রী স্বামীকে ছাড়িয়ে আনতে থানায় যান।

স্বামীকে ছেড়ে দেয়ার কথা বলে গৃহবধূকে তিনদিন আটকে রেখে ওসি প্রদীপসহ কয়েকজন মিলে টানা ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, তিনদিন পর স্বামীকে ছেড়ে দেয়া হবে বলে গৃহবধূকে বাড়ি চলে যেতে বলা হয়।পরদিন তার স্বামীর গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। সে সময় ধর্ষণের বিষয়ে মুখ খুললে পরিবারের সবাইকে হত্যার হুমকি দেন ওসি প্রদীপ। ভুক্তভোগী গৃহবধূ নিজেই মর্মান্তিক এ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন একুশে পত্রিকার কাছে।

টেকনাফ থানায় আটকে নারীদের ধর্ষণের বিষয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন হ্নীলা মৌলভী বাজার এলাকার দুবাই প্রবাসী এক ব্যক্তি। অভিযোগ উঠেছে, ওসি প্রদীপ পুলিশ পাঠিয়ে ইয়াবা উদ্ধারের নামে ওই প্রবাসীর বাড়িতে লুটপাট চালান এবং বাড়ি গুঁড়িয়ে দেন। একই ভাবে ফেসবুকে লেখার কারণে আরেক প্রবাসী পরিবার থেকে ২২ লাখ টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন, প্রদীপের সমালোচনার করায় টেকনাফ সদরের নাজির পাড়ার হতদরিদ্র কামালকে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে হত্যা করা হয়। এখন ছেলেকে হত্যার প্রতিকার চাইতে তার তার হতভাগী মা আদালতে যাবেন বলে জানিয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, বড় ইয়াবা কারবারিদের সঙ্গে ওসি প্রদীপের ঘনিষ্ঠতা ছিল। ওসি প্রদীপ টেকনাফে যোগদান করার পর প্রথম দিকে তার কর্মকাণ্ডের সমালোচনাকারীদের শনাক্ত করেন। এরপর তাদের মধ্যে বেছে বেছে অন্তত ১৫ জনকে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাম দিয়ে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ। হত্যার পর ইয়াবা উদ্ধার করে মাদক কারবারি প্রচার করে দায়মুক্তিও পেতেন ওসি প্রদীপ। সমালোচনাকারীদের এ পরিণতি দেখে সাধারণ মানুষজন ভয় পেয়ে যান। ফলে ওসি প্রদীপের সব অপকর্মকে তারা ভালো বলতে বাধ্য হয়েছেন অথবা চুপ থেকেছেন।

টেকনাফে ওসি প্রদীপের আমলে কথিত বন্দুকযুদ্ধে অন্তত ১৬১ জন নিহত হন। স্থানীয়দের দাবি, নিহতদের মধ্যে মাত্র কয়েকজন ছিলেন শীর্ষ ইয়াবা কারবারি। নিহত বেশিরভাগই ছোট ইয়াবা কারবারি অথবা সামান্য টাকার জন্য পাচারে লিপ্ত ব্যক্তি। নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নিরীহ ব্যক্তিও রয়েছেন।

টেকনাফের হোয়াইক্যং সাতঘরিয়া পাড়ায় গত বছরের ২১ জুলাই ওসি প্রদীপের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন মো. হোসেন ও মো. কাশেম নামের দুই ভাই। ওই সময় ওসি প্রদীপ সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছিলেন, নিহতরা ইয়াবার গডফাদার, তাদের কোটি টাকা ও আলিশান বাড়িও আছে। অথচ ময়নাতদন্ত শেষে দাফন করার জন্য দুই ভাইয়ের লাশ এলাকায় নিয়ে যেতে পরিবহন খরচ ও কাফন-দাফনের খরচের টাকাও ছিল না পরিবারটির। পরে স্বজনেরা মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলে তাদের দাফনের ব্যবস্থা করেন।

স্থানীয়রা বলছেন, টাকার জন্য উন্মাদ ছিলেন ওসি প্রদীপ। ওসির ক্ষমতা পেয়ে তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন। গত বছরের ২৪ জুন টেকনাফের ঝিমংখালীর এলাকার ৭০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে মাদক মামলা আছে বলে ধরে নিয়ে যায় টেকনাফ থানা পুলিশ।

অভিযোগ উঠেছে, ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে ৩ লাখ টাকা আদায় করে তাকে একটি মাদক মামলায় চালান দেয়া হয়। যে মাদক মামলাটিতে বৃদ্ধ শিক্ষককে চালান দেয় হয়, ওই মামলাটি রেকর্ড করার সময় তিনি সৌদি আরবে হজ পালন করছিলেন। আদালত পাসপোর্ট ও ভিসা রেখে মানুষ গড়ার এ কারিগরকে জামিন দেন। কিন্তু আদালত থেকে জামিন নিয়ে বাড়ি যেতে না যেতেই পুলিশ তাকে আবার আটক করে ১ লাখ ৮০ হাজার ইয়াবা দিয়ে চালান দেয়ার হুমকি দিয়ে ফের ৩ লাখ টাকা আদায় করে। এতেও ক্ষান্ত না হয়ে মাদক মামলায় পুণরায় তাকে আদালতে চালান দেয়া হয়। পরে আদালত প্রবীণ ওই শিক্ষককে জামিন দেন।

অন্যদিকে গত বুধবার যৌথ তদন্ত দল টেকনাফে গেলে থানায় বাইরে শত শত মানুষ জড়ো হয় অভিযোগ করতে। তদন্ত দলের কাছে বক্তব্য দিতে না পেরে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে ‘ক্রসফায়ারের’ ভয় দেখিয়ে শত শত মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আদায় করার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। তাদের মধ্যে ভুক্তভোগী অর্ধশতাধিক ব্যক্তির নাম পাওয়া গেছে।

তারা অভিযোগ করেছেন, ওসি প্রদীপ কুমার দাশের সময়ে টেকনাফ থানা পুলিশ আওয়ামী লীগ নেতা হাম জালালের কাছ থেকে ৬ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা, রাজার ছড়ার মৌ আব্দুল হামিদের কাছ থেকে ১৬ লক্ষ টাকা, মাঠ পাড়ার মোহাম্মদ হোসেনের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা, নিহত জোবাইরের কাছ থেকে ৬০ লক্ষ টাকা, পল্লান পাড়ার আবদু শুক্কুর বিএ এর কাছ থেকে ৪ লক্ষ টাকা, উত্তর লম্বরীর মুফতি জাফরের কাছ থেকে ৫ লক্ষ টাকা, মিঠাপানির ছড়ার দুবাই প্রবাসী মীর আহামদ খলিফার ছেলে মীর সরওয়ারের কাছ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা, ওমর হাকিম মেম্বারের কাছ থেকে ১০ লক্ষ টাকা, ছোট হাবির পাড়ার আবু তাহেরের ছেলে দুবাই প্রবাসী মহিউদ্দীনের কাছ থেকে ৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, ছাত্রলীগ নেতা জুয়েলের কাছ থেকে ৪ লক্ষ টাকা, ইসলামাবাদের আবদু সবুর সওদাগরের ছেলে নেজামের কাছ থেকে দুই দফায় ৭ লক্ষ টাকা, অলিয়াবাদের ওবাইদুল্লাহ কাছ থেকে ৪ লক্ষ টাকা, মিঠা পানির ছড়ার মো. তৈয়ুবের কাছ থেকে ৭ লক্ষ টাকা, উত্তর লম্বরী ফেরুজ মিয়া প্রাইভেট (ভুট্টোর) কাছ থেকে ৪ লক্ষ টাকা, উত্তর লম্বরী শামসুর ছেলে জামালের কাছ থেকে ৪ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা, উত্তর লম্বরী, সৈয়দ মিয়ার কাছ থেকে ৫ লক্ষ টাকা আদায় করেছে।

এ ছাড়াও দক্ষিণ লেঙ্গুবিল এনামের কাছ থেকে ৫ লক্ষ টাকা, দক্ষিণ লম্বরী ফেরুজ মিয়ার কাছ থেকে ৬ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, টেকনাফ সদরের চেয়ারম্যান শাহজাহানের কাছ থেকে ১৯ লক্ষ টাকা, দক্ষিণ লম্বরি আব্দুল্লাহ কাছ থেকে ৫ লক্ষ টাকা, ওমর হাকিম মেম্বারের ভাই হারুনের কাছ থেকে তিন লক্ষ টাকা, লেংগুর বিল এর ইউনুছ এর কাছ থেকে ৪ লক্ষ টাকা ও তোফাইল আহমদের কাছ থেকে ৬ লক্ষ টাকা, নিহত মোহাম্মদ আলম কাছ থেকে ১০ লক্ষ টাকা, দমদমিয়ার তাজুল ইসলাম কাছ থেকে ৫ লক্ষ টাকা, দক্ষিণ লম্বরীর আব্দুল্লাহ কাছ থেকে ২ লক্ষ টাকা আদায় করার অভিযোগ উঠেছে ওসি প্রদীপ ও তার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে। তাদের বড় একটি অংশ এখন প্রদীপের বিরুদ্ধে মামলা করবেন বলে জানা যাচ্ছে।

টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর একুশে পত্রিকা বলেন, জীবনে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা দেখেছি। কিন্তু টাকার জন্য মরিয়া এমন কর্মকর্তা দেখিনি। ক্রসফায়ারের নামে মানুষ খুন করা ছিল ওসি প্রদীপের নেশা।

নুরুল বশর বলেন, ওসি প্রদীপের দালাল স্থানীয় শরিফ মেম্বার প্রকাশ শরিফ বলি ও ছৈয়দ মেম্বার। তাদের মাধ্যমে ঘুষের শত কোটি টাকা চট্টগ্রামে পাঠিয়েছে ওসি প্রদীপ।

স্থানীয় সাংবাদিক নুরুল আমিন ও রহমত উল্লাহ জানান, প্রদীপের বিরুদ্ধে শত শত ভুক্তভোগী মামলা করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। তবে তারা এখনো ভয়ে আছেন। তাদের অনেকের ধারণা ওসি প্রদীপের অনেক ক্ষমতা, তাকে জেলে আটকে রাখা যাবে না। এরপরও শতাধিক ভুক্তভোগী মামলা করবেন বলে জানা যাচ্ছে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের মামলা আদালত গ্রহণ করবে না বলে টেকনাফের গ্রামে গ্রামে প্রচার করা হচ্ছে। ওসি প্রদীপের কাছ থেকে সুবিধাভোগী এক শ্রেণির ব্যক্তি এ অপপ্রচারে জড়িত রয়েছে বলে স্থানীয়রা তথ্য দিয়েছেন। এতে কেউ কেউ মামলা করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও কক্সবাজার আইন কলেজের প্রভাষক ছৈয়দ মো. রেজাউল রহমান বলেন, হত্যার শিকার অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের পরিবারের মত ক্ষতিগ্রস্ত সবারই মামলা করার সমান অধিকার রয়েছে। চাইলে যে কেউ আদালতের মামলা করতে পারবেন। দেশে আইনের শাসন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগীদের নির্ভয়ে থানায় বা আদালতে মামলা করা উচিত।

র‍্যাব-১৫ কক্সবাজারের উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা চাইলে আদালতে মামলা করতে পারেন। এছাড়া এ বিষয়ে আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ করলে তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে।

এদিকে চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন থানায় কর্মরত থাকা অবস্থায় অপকর্মের কারণে সমালোচিত হন প্রদীপ। বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি থাকাকালে ২০১৫ সালের ৪ আগস্ট একটি বৈধ তেলবাহী লরি আটকে একজন শিল্পপতিকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা করেন তিনি। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটির সুপারিশে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

২০১২ সালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানার ওসি থাকাকালে আদালতের অনুমতি ছাড়া বন্দরে আসা একটি বিদেশি জাহাজকে তেল সরবরাহে বাধা, বার্জ আটক এবং ১৮ দিন পর বার্জ মালিকসহ ১২ জনের নামে মামলা দেন প্রদীপ কুমার দাশ। এ ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তর ও তিনটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে হয়রানি ও অনৈতিক সুবিধা আদায়ের প্রমাণ মিললে ওসি প্রদীপকে প্রত্যাহার করা হয়।

এরপর তাকে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার ওসি করা হলে সেখানেও ব্যবসায়ীদের হয়রানির অভিযোগ ওঠে। ২০১৩ সালের ২৪ জানুয়ারি একটি মামলার রিমান্ড আবেদনের বিরোধিতা করায় চট্টগ্রামের লালদীঘিরপাড় থেকে এক আইনজীবীকে ধরে নিয়ে রাতভর থানায় আটকে নির্যাতন করেন ওসি প্রদীপ। ২৯ জানুয়ারি ওই আইনজীবী ওসিসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সভায় ওসি প্রদীপের পক্ষে কোনো আইনজীবী মামলা পরিচালনা করবেন না বলে সিদ্ধান্ত হয়।

বাদুরতলা এলাকায় বোরকা পরা এক বৃদ্ধাকে রাস্তায় পিটিয়ে জখম করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন ওসি প্রদীপ। এসব অভিযোগের পর ২০১৩ সালের ২১ আগস্ট তাঁকে পাঁচলাইশ থেকে প্রত্যাহার করা হয়।

এদিকে ২০১৭ সালে কক্সবাজারের মহেশখালী থানার ওসি থাকাকালে ইয়াবা কারবারি ও জলদুস্যদের সঙ্গে গোপন আঁতাত করাসহ অনেক অভিযোগ ওঠে প্রদীপের বিরুদ্ধে। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে হেতালিয়া প্রজেক্টের লবণ চাষি আব্দুস সাত্তারকে ধরে পাহাড়ে নিয়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার অভিযোগ ওঠে।

মহেশখালী থানা এলাকার এক নারী ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেন ওই থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়, টাকা না পেয়ে ওসি প্রায় ১০ লাখ টাকার লবণ লুট করে নিয়ে গেছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পুলিশে যোগ দেয়ার পর থেকেই প্রদীপ কুমার দাশ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ঘুরে ফিরে ছিলেন। বৃহত্তর চট্টগ্রামের বাইরে তাকে যেতে হয়নি। তিনি চট্টগ্রাম নগরে থাকা অবস্থায় এলিট পেইন্টের মালিক সেলিম সাহেবকেও হয়রানি করেছিলেন টাকার জন্য। এ ঘটনায় সাসপেন্ডও হয়েছিলেন ওসি প্রদীপ।’

‘ওসি প্রদীপ সবসময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশীর্বাদপুষ্ট থাকেন। তাকে আশ্রয়-প্রশ্নয়, যত্ন করে আজকে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন করে ফেলেছে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের একটা অংশ। তারা তো আর শুধু শুধু করেনি, যেখানে নিশ্চয়ই বিশেষ কোন কারণ আছে। সেই কারণটির জোগান প্রদীপ কুমার দাশ দিতে পেরেছে বলেই, তাদেরকে সন্তুষ্ট করেছে বলেই, তার প্রতি ওরা সদয় ও সন্তুষ্ট ছিল। আর উপরে বিশেষ কিছু সরবরাহ করতে গিয়ে প্রদীপ বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনপদের মানুষকে হয়রানি করেছে, নির্যাতন করেছে, টাকা-সম্পদ কেড়ে নিয়েছে, মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দিয়েছে। যার কারণে পুলিশের প্রতি মানুষের বিরূপ ধারণা কাটছে না। এটার জন্য অনেকের সাথে প্রদীপ অন্যতম দায়ী।’ যোগ করেন অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী।

তিনি বলেন, ‘অপকর্ম করতে গিয়ে ওসি প্রদীপ বিশাল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। নিজের নামে, বেনামে, দেশে-বিদেশে ওসি প্রদীপ টাকা পাচার করেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। এখন আমাদের দাবি, দুদক ও এনবিআর ওসি প্রদীপের ক্ষেত্রে যেন বিশেষ তদন্ত করে।’

সুজন চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী আরও বলেন, ‘একজন ব্যক্তির অপরাধকর্মের দায় কোন প্রতিষ্ঠানের নেয়া উচিত নয়। তাতে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। অপরাধী যে বিভাগের যে পেশারই লোক হোন না কেন, অন্যায়-অনিয়ম করলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে নিজেরাই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে পারলে, সেক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠানের সুনাম বাড়বে, কমবে না। এতে দেশের মানুষের কাছে তাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে, মানুষের ভালোবাসা পাবে। কোন ব্যক্তির দায় প্রতিষ্ঠানের নেয়া কোনভাবেই উচিত নয়। একজন পুলিশেরও উচিত নয়, কোন অপরাধী সহকর্মীকে রক্ষা করা।’