রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৫ আশ্বিন ১৪২৭

হালিশহরে পুলিশ-নেতার মদদে জুয়ার রমরমা

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৩, ২০২০, ৩:৩৫ অপরাহ্ণ


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের বিভিন্ন স্থানে জুয়ার আসর চলছে। এসব এলাকায় মাদক বেচাকেনা হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে এলাকার মানুষ উদ্বিগ্ন। কিন্তু অসহায় সবাই।

নগরীর হালিশহর আবাসিক এলাকার জি ব্লকের চট্টগ্রাম আবাহনীর ক্লাবে আগে রমরমা জুয়ার আসর বসতো। গত বছরের সেপ্টেম্বরে সেখানে অভিযান চালিয়ে জুয়া খেলার আলামতও পেয়েছিল র‌্যাব-পুলিশ।

এরপর থেকে আবাহনী ক্লাবে জুয়া বন্ধ রয়েছে। কিন্তু আবাহনীর সেই জুয়ার আসরের আয়োজকরা আশপাশের এলাকায় একের পর এক জুয়ার আখড়া স্থাপন করে আসছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

বর্তমানে হালিশহর আবাসিকের এ ব্লক, বি ব্লক, সবুজবাগ, গ্রীনভিউ ও শাপলা আবাসিকসহ বেশকিছু এলাকা জুড়ে জুয়ার আসর বসানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ বলছে, এসব এলাকায় অভিযান চালিয়ে জুয়ার আসর ভেঙে দেওয়ার পরও বসছে জুয়া।

এলাকাবাসী বলছে, এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের পরিচালনায় স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা থাকায় প্রতিবাদ করতে তারা সাহস পাচ্ছেন না। পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি জেনেও রয়েছে নিরব, নিচ্ছে না কোনো পদক্ষেপ। জুয়ার আসর ঘিরে প্রায় সময় মারামারি হওয়ায় এলাকায় বসবাসরত মানুষ আতঙ্কে দিন পার করছেন।

সর্বশেষ গত সোমবার (১০ আগস্ট) রাতে হালিশহর গ্রীনভিউ এলাকায় জুয়ার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। প্রথমে উভয় পক্ষ অস্ত্র নিয়ে অবস্থান করে এবং মহড়া দিতে থাকে। পরে ঘটে সংঘর্ষের ঘটনা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রীনভিউ এলাকার একজন মুদি দোকানদার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘সন্ধ্যা হলেই এলাকায় বেড়ে যায় জুয়াড়িদের আনাগোনা। রাত যত গভীর হয় ততই জমে উঠে এই জুয়ার আসর। হাজার থেকে লাখ টাকাও হাতবদল হয় জুয়ার টেবিলে। কেউ কেউ এই জুয়ার আসর থেকে টাকা কামিয়ে লাখপতি হলেও বেশিরভাগই হারিয়েছে সর্বস্ব।’

তিনি বলেন, ‘এই জুয়ার পুরো বিষয়টা নিয়ন্ত্রণ করছে যুবলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত অস্ত্রধারী প্রভাবশালীরা। জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে প্রায়ই ঘটে সংঘর্ষ। এই এলাকা নিরাপদ লাগে না, সবসময় ভয়ে থাকতে হয়। এই যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না।’

৮ বছর ধরে হালিশহর গ্রীনভিউ এলাকায় বসবাস করছেন ফরিদ আহমেদ। একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যার পর এলাকায় শুধু যে জুয়া খেলা হয় তা না, মাদক সেবনও চলে পুরোদমে। তাই সন্ধ্যায় আমরা ঘর থেকে তেমন একটা বের হই না।’

তিনি বলেন, ‘প্রায়ই দেখি মারামারি হয় এই জুয়াকে নিয়ে। চুপ করে থাকা ছাড়া তো কোনো উপায় নাই। দাগি আসামিরা যেভাবে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাতে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকি। প্রশাসন সব কিছু জেনেও চুপচাপ থাকে। তার মনে জুয়াড়িরা অবশ্যই তাদেরকে ম্যানেজ করেছে।’

এদিকে হালিশহরের জুয়ার আসরে নিয়মিত অংশগ্রহণ করা একজন জানান, জুয়ার প্রত্যেক বোর্ড শেষে প্রতি টেবিল থেকে আদায় করা হয় ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত। এই টাকা নেতা ও পুলিশের কাছে যায়।

জুয়া খেলার বিষয়ে তিনি জানান, এই জুয়া বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। ‘হাজারী’ খেলা, ‘তাস’ খেলার টেবিলে হয় সবচেয়ে বেশি ভিড়। ‘কাইট’ খেলা ও ‘নাইন কাটে’র মাধ্যমে চলে বড় অংকের টাকার জুয়া খেলা।

অভিযোগ রয়েছে, এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রক চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির একজন সদস্য। তার পক্ষে সরাসরি টাকা আদায়সহ দেখভাল করেন তারই অনুসারী হালিশহর থানার একাধিক মামলার আসামি মিল্টন। তাদের হয়ে মাদক মামলার আসামি পারভেজ, রিয়াদ ও সুমনসহ আরও কয়েকজনও জুয়ার আসর থেকে টাকা আদায় করেন। এছাড়া মামুন নামে হালিশহর থানা পুলিশের একজন কথিত সোর্সও জুয়ার আসর থেকে টাকা তোলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদিকে হালিশহরে জুয়ার আসর বসানোর জন্য নগর যুবলীগের যে নেতার দিকে স্থানীয়রা অভিযোগের আঙুল তুলছেন, তার মুঠোফোনে দুই দফায় বেশ কয়েকবার কল করা হলেও তিনি প্রত্যেকবারই কল কেটে দেন।

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক দিদারুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘হালিশহরে সংঘর্ষ হচ্ছে জুয়ার আসর নিয়ন্ত্রণ করা নিয়ে। সোজা কথায় বলতে গেলে জুয়ার টাকা ভাগ-বাটোয়ারা নিয়েই হয় সব ঝামেলা। আর প্রশাসন সব জেনে কেন চুপ থাকে, সেটা তো আমরা সবাই জানি, এটা এক প্রকার ওপেন সিক্রেট।’

তিনি বলেন, ‘এই জুয়ার টাকার ভাগ পুলিশের কাছে নিশ্চয়ই যাচ্ছে। যেটাকে মাসোয়ারা বলে তারা। এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এতো অভিযোগ পাওয়ার পরেও পুলিশের কোনো ভূমিকা চোখে পড়ছে না। তবে আমি এই বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহলে জানিয়েছি। এখন তাদের উচিত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।’

জুয়ার আসর পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ার অভিযোগের বিষয়ে হালিশহর থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম বুধবার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার জানা মতে ক্যাসিনো ঝামেলার পর থেকে আবাহনী ক্লাবে জুয়া খেলা হচ্ছে না। তবে ছোটখাটো যে জুয়া খেলা হয় সেখানে পুলিশ ও র‍্যাব অভিযান চালিয়েছে। এমনকি জুয়ার আসর পরিচালনা করায় আমরা গত পরশুদিন ও তার আগের দিন দুইটি মামলা দিয়েছি। দুই সপ্তাহ আগে সবুজবাগ এলাকায় জুয়ার আসরের খবর জানতে পেরে আমরা সেটা ভেঙে দিয়ে মামলা দিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এলাকাবাসী নিশ্চয়ই দেখছে কোথাও জুয়া খেলা হচ্ছে, তাই আপনাদের কাছে তারা এই অভিযোগ করেছে। তবে অভিযোগটা যদি আমাদের না জানানো হয় তাহলে আমরা কিভাবে জানবো বলুন? কোথাও জুয়া খেলা হচ্ছে এমন খবর পেলেই আমরা তাদের হাতেনাতে ধরে মামলা দিচ্ছি। এটা আমাদের চলমান প্রক্রিয়া।’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (পশ্চিম) মো. ফারুক উল হক বলেন, ‘স্থানীয় জনগণ, সংবাদকর্মী ও গোপন সূত্রে মাঝে মাঝে জুয়ার আসরের বিষয়ে খবর পাই। এ প্রেক্ষিতে হালিশহরসহ আমার জোনের বিভিন্ন অংশে অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা নিয়েছি। কয়েকদিন আগেও হালিশহর থানার ওসি আমাকে জানিয়েছেন, তার এলাকায় এখন এ ধরণের কোন কিছু হয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘হালিশহরে জুয়ার আসর বসার অভিযোগটি আমি খতিয়ে দেখবো। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আপনাদের (সাংবাদিক) প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে, এ ধরণের কোন তথ্য থাকলে যাতে পুলিশ প্রশাসনকে জানানো হয়। তাহলে আমরা আরো সহজে এসব সমস্যার সমাধান করতে পারবো।’