বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৮ আশ্বিন ১৪২৭

খাল দখল করে বহুতল ভবন

প্রকাশিতঃ শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২০, ৯:২৯ অপরাহ্ণ


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী কোনাে পুকুর-জলাশয়, নদী-খাল ইত্যাদি ভরাট ও এর উপর স্থাপন নির্মাণ বেআইনি। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-২০১০ অনুযায়ী, জাতীয় অপরিহার্য স্বার্থ ছাড়া কোনাে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারি বা আধা সরকারি, এমনকি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুর বা জলাধার ভরাট করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

কিন্তু এসব আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া ওয়ার্ডের সৈয়দ শাহ সড়ক সংলগ্ন চরচাক্তাই খাল দখল করে ১৯৯৭ সাল থেকে দাঁড়িয়ে আছে আজিজ মঞ্জিল (হোল্ডিং নং ১৫০৯) নামে একটি বহুতল ভবন। বিএস খতিয়ানে খাল হিসেবে চিহ্নিত থাকলেও এর উপর নির্মিত ভবনটির একপাশে হেলে পড়ার ঘটনায় উৎকন্ঠিত এলাকাবাসী।

এই ভবন নির্মাণে অনুমোদন কীভাবে এবং কারা দিলেন সে উত্তর মিলছে না কিছুতেই। কেবল প্রশ্নই থেকে যাচ্ছে! নিয়ম অনুসারে ভবন তৈরির আগে নির্মিত ভবনের মাটি পরীক্ষা (সয়েল টেস্ট) করাতে হয়। পরে নকশা পাস করিয়ে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করতে হয়।

ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ভবন থেকে সর্বনিম্ন একহাত নালা বা ড্রেনের জন্য ছাড় দিয়ে ভবন বানাতে হবে। যা নকশার মধ্যে দেখানো হয়। কিন্ত ভবন নির্মাণের সময় কোনো নালা বা ড্রেনের জায়গা না রেখেই তৈরি করা হয়েছে এই ভবন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবকাঠামো তৈরির দুই দফতরকে ম্যানেজ করে এ সকল নকশা পাস করা হয়ে থাকে। নকশা জমা দেয়ার পর ওই জায়গাগুলোতে সার্ভেয়ার পাঠানো হলেও ভবন নির্মাণের পর নকশা অনুযায়ী হয়েছে কিনা তা আর তদারকি করা হয় না। যার ফলে শহরের প্রান্তিক এলাকায় এই একটাই নয়, ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন।

জানা গেছে, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে খাল-খেকোদের প্রভাবে বেদখল হয়ে যাচ্ছে নগরের খালগুলো। খালখেকো ও অসাধু ভবন মালিকরা অবৈধভাবে অনুমোদনের বাইরে গিয়ে স্থাপনার কাজ করে নির্মাণ করছে বহুতল ভবনও। যে কোনো স্থাপনা নির্মাণে নিয়মানুযায়ী সিডিএ থেকে আট স্তরে অনুমোদন নিতে হলেও এ নিয়মকে উপেক্ষা করে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে স্থাপনা। নকশা ও ভবন নির্মাণ নীতি না মেনে নির্মিত এসব ভবনে থেকে যাচ্ছে ঝুঁকি। যার কারণে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় রকমের দুর্ঘটনা।

সিডিএ সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে নগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, নির্মাণ অনুমোদন, নির্মাণকাজ শুরু অবহিতকরণ ও কারিগরি ব্যক্তিদের সম্মতিপত্র, ভবনের ভিত্তিস্তম্ভ পর্যন্ত কাজ সম্পর্কে কারিগরি ব্যক্তিদের প্রতিবেদন, ভবনের নির্মাণকাজ সমাপ্তি অবহিতকরণপত্র, কারিগরি ব্যক্তিদের প্রত্যয়নপত্র, ব্যবহার সনদ ও পাঁচ বছর পর ব্যবহার সনদ নবায়ন) প্রণয়ন করার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধলক্ষ ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে সিডিএ। নকশা অনুমোদন নেওয়া ভবনের নির্মাণ শেষে সিডিএ থেকে ব্যবহার সনদ নেওয়া কথা থাওলেও আজ পর্যন্ত কোনো ভবনের মালিক ব্যবহার সনদ নেননি। ব্যবহার সনদ পাওয়ার আগ পর্যন্ত ভবনের মালিক ভবন ব্যবহার করতে পারার কথা নয়।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে সৈয়দ শাহ সড়কসংলগ্ন চরচাক্তাই খাল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, খালের উপর নির্মিত আজিজ মঞ্জিলের নিচের তলায় দোকান এবং ২য় থেকে ৫ম তলা পর্যন্ত বসবাসের জন্য ভাড়া দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, আজিজ মঞ্জিলের মালিক মো. আব্দুল আজিজ নিজ বিল্ডিংয়ের একটি তালায় ‘আজিজিয়া দারুল আরক্বাম তাহফিজুল কুরআন’ নামে একটি মাদ্রাসাও পরিচালনা করছেন। তবে খাল দখলে পরিবেশ ঝুঁকির চেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ভবনটি খালের দিকে হেলে পড়ায়।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্পের নামে খাল ড্রেজিংয়ের সময় সিডিএ এই ভবন দুটির আগ পর্যন্ত খনন করে। কিন্তু খালের উপর নির্মিত ভবনের কারণে ড্রেজিং করতে না পরলেও এই বিষয়ে তারা নিশ্চুপ রয়েছে বছরের পর বছর। সিডিএকে ভবন দুটি নিয়ে বেশ কয়েকবার অভিযোগ করলেও মিলেনি সুরাহা, নেয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ। যার কারণে অভিযোগের আঙুল উঠছে সিডিএ’র দিকে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সবকিছু যথানিয়মে হলেই কেবল
কর্তৃপক্ষ ব্যবহার সনদ দেওয়ার কথা। ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা অনুসরণ না করায় ভবন মালিকরা ব্যবহার সনদ নেন না। আর এ সনদ না নিলে ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী নকশা বাতিল ও ভবন উচ্ছেদের নিয়ম রয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে,, একটি খালের উপর কীভাবে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়। আর যদি সিডিএ’র অনুমোদন না দেয় তাহলে কীভাবে তাদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এতো বছর ধরে ভবনগুলো টিকে আছে?

পশ্চিম বাকলিয়া সৈয়দশাহ্ রোডের বসিন্দা মো. মামুন খাল দখল করে অবৈধভাবে গড়ে উঠা স্থাপনার বিষয়ে একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের এই খালের উপর নির্মিত ভবন দুটি নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করলেও কোন সুরাহা আমরা পাইনি। আর এই ভবন পর্যন্ত গেলেই খালটির ড্রেজিং কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ভবনটির পরের দিকে ড্রেজিং না করায় ঐ জায়গায় আবর্জনার স্তূপ জমে পানি যেতে পারে না। ফলে পানি রাস্তায় ওঠে এসে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়’। মৃতপ্রায় এই খালটিকে বাঁচাতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চান তিনি।

অভিযুক্ত ভবন মালিক মো. আব্দুল আজিজ এবং তার ছেলে মো. আব্দুল্লাহর সাথে যোগাযোগ করা হয় এই বিষয়ে। ভাবন মালিক মো. আব্দুল আজিজের ছেলে মো. আব্দুল্লাহ প্রথমে সিডিএ’র অনুমোদন নিয়ে ভবন নির্মাণ হয়েছে দাবি করেন। কিন্তু সেই অনুমোদনের স্বপক্ষে কাগজপত্র দেখাতে বললে তিনি এই বিষয়ে বিস্তারিত জানেন না জানিয়ে তার পিতার সাথে কথা বলতে বলেন।

পরে আজিজ মঞ্জিলের মালিক মো. আব্দুল আজিজের সাথে কথা হলে আনিত অভিযোগগুলো মিথ্যা দাবি করলেও সিডিএর অনুমোদন ছাড়পত্র দেখাতে পারেননি তিনি। শুধু তাই নয়, একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানী টিমকে বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করারও চেষ্টা করেন তিনি।

দায়িত্বহীনতা ও গাফিলতির কারণেই অবৈধভাবে খালের উপর ভবন নির্মাণ করতে সাহস পাচ্ছেন খালখেকোরা-এমন মন্তব্য করে নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান একুশে পত্রিকাকে তবলেন,’যদি আরএস-বিএস খতিয়ানে এটি খাল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকে তাহলে সেই খালের উপর ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়ার কোনো এখতিয়ার সিডিএ বা পরিবেশ অধিদপ্তরের নেই। এখন কীভাবে খালের গতিপথে ভরাট করে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করতে পেরেছে তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। সিডিএ’র উচিত এই বিষয়টি সঠিক অনুসন্ধান করে বেআইনি ভবনটি অপসারণ করা।’

এই বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক মােহাম্মদ নুরুল্লাহ নুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এই বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে সিডিএ’র উপর বর্তায়। খালের উপর ভবন নির্মাণে কীভাবে তারা সিডিএ’র অনুমোদন পায় তা সত্যিই আশ্চর্যের। আর যদি সিডিএ’র অনুমোদন না নিয়েই খালের উপর ভবন নির্মাণ করা হয় তাহলে সিডিএ’র অনেক আগেই ভবনটি উচ্ছেদ করা উচিত ছিল।’

এই বিষয়ে সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামসকে মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল করলেও পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম শহররে জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে প্রাথমিক পর্যায়ের আওতায় কর্ণফুলীর নদীর সাথে সংযুক্ত ১৬ টি খাল এবং এসব খালে সংযুক্ত আরো ২০টি খালসহ মোট ৩৬টি খালের পরিকল্পিত পুনঃখনন, সম্প্রসারণ ও উন্নয়নে ৫ হাজার কোটি টাকার মেগাপ্রজেক্ট গ্রহণ করা হয়েছে সিডিএর মাধ্যমে।

এই প্রকল্পের পরিচালক আহমেদ মাঈনুদ্দীনের কাছে খালের উপর ভবন বিষয়ে জানতে চাইলে একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘চরচাক্তাই খাল আমাদের প্রকল্পের আওতায় আছে কিনা সেটা এই মূহূর্তে ঠিক বলতে পারছি না। যদি এই প্রকল্পে খালটি নাও থাকে তারপরও এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে আমি আমার উর্ধতন কর্মকর্তাদের অবহিত করবো।’

পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলে কীভাবে খালের উপর ভবন নির্মাণে সিডিএ অনুমোদন দিয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘যেহেতু দীর্ঘ ১০ বছর আগে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে তখন কীভাবে সিডিএ এর অনুমোদন দিয়েছে তা আমার জানা নেই। খালের উপর ভবন নির্মাণের অনুমোদন কোনোভাবেই দেয়া যায় না। তবে আমি এই বিষয়ে খবর নিয়ে দেখবো। যদি আসলেই বেআইনিভাবে ভবনটি নির্মাণ করা হয়ে থাকে এমন প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’