বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৮ আশ্বিন ১৪২৭

বায়েজিদে জনপ্রতিনিধি-প্রভাবশালী মিলে গিলে খাচ্ছে পাহাড়!

প্রকাশিতঃ মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২০, ৪:৪৫ অপরাহ্ণ


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : আইনে পাহাড় কর্তন ও মোচনের জন্য কঠোর নির্দেশনা থাকলেও নগরের বায়েজিদ রৌফাবাদ এলাকায় নির্বিচারে পাহাড় কাটার মহোৎসব চলছে।

থানা পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন জনসাধারণ। রাজনৈতিক দাপট, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে নগরের চট্টগ্রামের বায়েজিদ রৌফাবাদ এলাকায় অবাধে পাহাড় ও পাহাড়ি টিলা কেটে সাবাড় কপ্রা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, পাহাড় ও পাহাড়ি টিলা কেটে প্রভাবশালীরা রাস্তা এবং স্থাপনা তৈরি করছেন।

অভিযোগ আছে, স্থানীয় সেলিম, আমির হােসেন, সিরাজুল ইসলাম ও মােহাম্মদ ইউসুফ আলীর নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করা ছাড়াও খালি হওয়া জায়গায় আবাসিক প্লট করে তা বিক্রি এবং ভাড়া দিচ্ছে। প্লট দেয়ার নামে স্থানীয়দের কাছে থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেও এখনো কাউকে প্লট বুঝিয়ে দিতে পারেনি তারা।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এই সিন্ডিকেট স্ক্যাভেটর দিয়ে পাহাড়ের মাটি কেটে ঘরবাড়ি নির্মাণ করছে।

গত সোমবার সরেজমিনে বায়েজিদ থানাধীন পশ্চিম ষোলশহর মৌজার স্টারশিপ কারখানার পিছনে রৌফাবাদ মিয়া পাহাড় পরিদর্শনে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা মিলে। দেখা যায়, পাহাড় কেটে ১৮টি সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। আর এই ঘরে বেশ কিছু ভাড়াটিয়াও ভাড়া দেয়া হয়েছে। ঢালু পাহাড়ি টিলা কেটে করা হয়েছে রাস্তা। পাহাড়টির প্রায় অর্ধেকের বেশি জায়গা ইতোমধ্যে কাটা শেষ করছে সিন্ডিকেটটি। শতাধিক শ্রমিকের পাশাপাশি স্ক্যাভেটর দিয়েও কাটা হচ্ছে পাহাড়ের মাটি।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী পাহাড় কাটা সম্পর্কে বিধি-নিষেধ রয়েছে। আইননুসারে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কতৃর্ক সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করা যাবে না।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছে, পরিবেশের আইন উপেক্ষা করে পাহাড় কাটা, বালু বিক্রি থেকে শুরু করে প্লট বিক্রি ও ভাড়া দিতে বেপোয়ারা হয়ে উঠেছে সিন্ডিকেটটি। রাতের অন্ধকারে ড্রেজার মেশিন লাগিয়ে কাটা হয় পাহাড়। এছাড়া পাহাড় কাটার সময় পাহারায় থাকে তাদের নিজস্ববাহিনী। এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর একবারও দেখা মেলেনি। ধারণা করা হচ্ছে উনারাও ম্যানেজ হয়ে গেছেন।

তাছাড়া ভয়ে তাদের সাথে কেউ কথা বলে না। শুধু বায়েজিদ কেন, চট্টগ্রামের যে পাহাড়গুলো রাতারাতি কেটে বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে আছে তাদের কাগজপত্র যাচাই করলে দেখা যাবে বানানো, সৃজিত। তা না হলে সে কীভাবে পাহাড়ের মধ্যে বহুতল ভবন নির্মাণের আনুমোদন পায়। প্রশাসন কী করে? শুধু আপনি/আমি অভিযোগ দিলে ওনাদের ঘুম ভাঙবে। এছাড়া ওনাদের নিজ দায়িত্ববলে কিছুই নেই? ইত্যকার নানা প্রশ্ন স্থানীয় সচেতনজনদের।

বায়েজিদ রৌফাবাদ এলাকার বাসিন্দা ওয়াহিদ জামাল পাহাড় কাটার ঘটনায় ক্ষোভ নিয়ে একুশে পত্রিকাকে বলেন, বেশ কয়েকবছর ধরে তারা এই পাহাড় কাটছে। শুধু যে পাহাড় কাটছে তা নয়, বড় বড় গাছও নিধন করা হচ্ছে নির্বিচারে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে বেশ কয়েকবার অভিযোগ করা হয়েছিল এই বিষয়ে। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখিনি। তাহলে অভিযোগ করে কী লাভ? যারা অভিভাবক ওনারাই তো ম্যানেজ! এক্ষেত্রে আপনি/আমি অভিযোগ করতে গেলে হবো ‘বলির পাঠা’।

অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পাহাড় কাটা ও দখলের কথা স্বীকার করে আমির-সেলিম সিন্ডিকেটের সদস্যরা জানান, পাহাড় কাটার কথা জানতে পেরে বিষয়টি প্রশাসনকে জানানোর ভয় দেখিয়ে ফায়দা লুটেছেন ৭ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. মোবারক আলী। তিনি প্রায় ১৮ কাঠা প্লট করে নিয়েছেন বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ সোসাইটির নামে।

অভিযুক্ত ভূমি মালিক আমির হোসেনের একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘জনৈকা কানিজ ফাতেমা বিবির কাছ থেকে ১১ বছর আগে আমরা ৪ কানি জায়গা ক্রয় করেছি। এর বাইরে কিছু জায়গা আমরা দখলও করেছি। যার মধ্যে কিছু অংশ পাহাড় এবং পাহাড়ি টিলা পড়েছে। আমরা যারা মালিক আছি তাদের মধ্যে এই জায়গা ভাগ করে নিয়েছি।’

সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ করে তিনি বলেন, এই সংবাদ প্রকাশ করলে তাদের ক্ষতি হবে, তাই আপনার কাছে আমার অনুরোধ থাকবে এই সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য। প্রয়োজনে আপনার সাথে বসে এই বিষয়ে একটা মিটমাট আমরা করবো।

সিন্ডিকেটের আরেক অভিযুক্ত মো. সেলিম একুশে পত্রিকাকে বলেন, আসলে এই জায়গা আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিক্রি করতে চাচ্ছিলাম কিন্তু নানা কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। তাই নিজেদের মধ্যে এই জায়গা ভাগ করে আমরা নিজ নিজ অংশে ঘর নির্মাণ করছি।

পাহাড় ও পাহাড়ি টিলা কাটার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, আমাদের পাহাড় কাটার কথা জানতে পেরে বিষয়টি প্রশাসনকে জানানোর ভয় দেখিয়ে ফায়দা লুটেছেন ৭ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. মোবারক আলী। প্রায় ১৮ কাঠা প্লট করে নিয়েছেন বাংলাদেশ কো অপারেটিভ সোসাইটির নামে। যার ফলে আমরা জায়গা সল্পতার কারণে পাহাড় কাটতে বাধ্য হয়েছি।

ভয়ভীতি প্রদর্শন করে পাহাড় কাটায় সম্মতি প্রদান ও জায়গা দখলের অভিযোগের বিষয়ে ৭ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. মোবারক আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘পাহাড় কাটার মত অবৈধ কর্মকাণ্ডে আমার সম্মতি দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। আর তাদের কথা অনুযায়ী আমি তাদের কাছ থেকে জায়গা দাবি করলেই কি তারা দিয়ে দিবে?’

তিনি বলেন, ‘এই জায়গার মালিকানা নিয়ে কানিজ ফাতেমা বিবির সাথে বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ সোসাইটি একটি মামলা চলছিল যেখানে আদালত কানিজ ফাতেমা বিবি গংকে নির্দেশ দেয় সোসাইটির জায়গায় যেন সোসাইটিকে দিয়ে দেয়া হয়। আমি জনপ্রতিনিধি হিসেবে এর মীমাংসা করে দিয়েছি মাত্র।’

বায়েজিদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রিটন সরকারের সাথে এই বিষয়ে কথা হলে একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে। তবে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে যেকোনো সংস্থা যদি আমাদের সহায়তা চায় আমরা নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে সহায়তার চেষ্টা করবো।’

পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক মােহাম্মদ নুরুল্লাহ নুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি এই বিষয়ে চাঁন্দগাও এসি ল্যান্ড অভিযান পরিচালনা করে তাদেরকে জরিমানা করেছিল। এরপর তারা পাহাড় না কাটার অঙ্গিকার করেছিল। কিন্তু এখনও যে তারা পাহাড় কাটছে সেটা আমার জানা ছিল না। আমাদেরকে এই বিষয়ে ভুক্তভোগী বা এলাকাবাসী লিখিত অভিযোগ করলে অবশ্যই এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

পাহাড় কাটার বিষয়টি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেনের সাথে কথা হলে একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘এই ধরনের কোনো অভিযোগ আমার কাছে আসেনি। আমি এই বিষয়ে তদন্ত করে দেখবো। অভিযোগ সত্য হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’