শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ৯ কার্তিক ১৪২৭

নালার ওপর ভবন নির্মাণে সিডিএ’র অনুমতি!

প্রকাশিতঃ রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২০, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ


জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : চট্টগ্রাম নগরে ড্রেন বা নালা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন। এতে বর্ষায় জলাবদ্ধতা ও শুষ্ক মৌসুমে দুর্গন্ধ নগরবাসীর ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ভবন মালিকের দাবি, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অনুমোদন নিয়ে ড্রেনের জায়গায় ভবন নির্মাণ করেছেন তিনি।

প্রায় ৪ বছর আগে নগরের বায়েজিদ বােস্তামী থানাধীন পাঁচলাইশ ৩ নম্বর ওয়ার্ডের হাজীপাড়া সড়ক সংলগ্ন পানি চলাচলের একমাত্র নালার ওপর বহুতল ভবনটি নির্মাণ করেন মো. আকতার। ওই এলাকায় ৮-১০ হাজার মানুষ বসবাস করছেন। নালা ভরাট করে ভবন নির্মাণের কারণে ময়লা পানি রাস্তার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ নিয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে সিডিএ এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে অভিযোগের পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ভবন নির্মাণে সিডিএ থেকে আট স্তরে অনুমোদন নিতে হয়। সকল শর্ত মানা হলে কর্তৃপক্ষ সনদ দেন। তবুও নিয়মকে উপেক্ষা করে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। নকশা ও ভবন নির্মাণ নীতি না মেনে নির্মিত এসব ভবন বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করছে এলাকাবাসী ও পরিবেশের জন্য।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, পানি চলাচলের সচল নালা দখল করে অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে ভবনটি। নালা ভরাট করে ভবনটি নির্মাণ করার কারণে বর্ষায় পানি রাস্তায় ও ঘরে পানি উঠে আসে। এ বিষয়ে ভবনের মালিকের সাথে কথাও বলা যায় না। কথা বললেই ভবনের মালিক মো. আকতার বলে, সিডিএ অনুমোদন দিয়েছে বিধায় আমি ভবন তৈরি করেছি। এতে আমার দোষের কী আছে। অনুমোদন না দিলে কিংবা সিডিএর জায়গায় আমার ভবন হলে সিডিএ তা ভেঙে ফেলতো। পরে বিষয়টি তৎকালীন বিষয়ে সিডিএর চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামকে অবগত করা হলে তিনি ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েও কোনো পদক্ষেপ নেননি।

নালার ওপর ভবন নির্মাণে অনুমোদন দেয়া এবং এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়েও সিডিএ কেন পদক্ষেপ নিচ্ছে না? এমন প্রশ্নের জবাবে সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমি বিষয়টি অবগত ছিলাম না। আপনার কাছ থেকে তথ্য যেহেতু পেয়েছি সেহেতু বিষয়টি আমি অথরাইজড অফিসারকে জানাচ্ছি। উনি আগামীকাল সরেজমিনে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন। আমি নিজে বিষয়টি দেখবো।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে হাজীপাড়া এলাকার উক্ত ভবন পরিদর্শনে গিয়ে মিলেছে, নালা ভরাট করে ভবন তৈরির সত্যতাও। দেখা যায়, সড়ক সংলগ্ন আড়াই ফুট নালার জায়গায় গড়ে উঠেছে ভবনটির একটি অংশ। নালার উপর ভবনটি নির্মাণের কারণে পানি চলাচলের কোনো পথ না থাকায় পানি রাস্তায় উঠে যাচ্ছে।

নালা দখল করে নির্মিত অবৈধ এই ভবনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ভবনের দেয়ালে অঙ্কন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। আবার ভবনে কোনো ধরনের হোল্ডিং নাম্বার বা নাম দেয়া হয়নি।

হাজী পাড়া এলাকার বাসিন্দা এমরান ফেরদৌস একুশে পত্রিকাকে বলেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিটি কর্পোরেশন রাস্তা পরিমাপ করে এবং অবৈধ দখলকৃত অংশ লাল দাগ দিয়ে নালার জায়গা ছেড়ে দিতে বলে। কিন্তু ভবনের মালিক বিষয়টি কর্ণপাত না করে নালা দখল করে রাখছেন। আমরা হাজীপাড়া এলাকাবাসী এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ চাই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ভবন থেকে সর্বনিম্ন এক হাত নালা বা ড্রেনের জন্য ছাড় দিয়ে ভবন বানাতে হয়, যা নকশার মধ্যে দেখানো হয়। কিন্ত ভবন নির্মাণের সময় কোনো নালা বা ড্রেনের জায়গা না রেখেই ম্যানেজ করে নকশা পাস করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, নকশা জমা দেয়ার পর তা পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করতে পরিদর্শন সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে প্রতিনিধি পাঠানো হলেও ভবন নির্মাণের পর নকশা অনুযায়ী হয়েছে কি না তা আর তদারকি করা হয় না।

এলাকার একমাত্র নর্দমা দখল করে ভবন নির্মাণের ঘটনায় অভিযুক্ত ভবন মালিক মো. আকতারের সাথে যোগাযোগ করতে তার বাসায় যাওয়া হলে তিনি বাসায় নেই বলে জানান গৃহকর্মী। পরে মুঠোফোনে তার সাথে কথা হলে অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে তিনি একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমি যখন এই ভবনটি নির্মাণ করেছিলাম তখন এই জায়গায় নালা ছিল না। যদি আমি অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ করে থাকি তাহলে সিডিএ আমাকে অনুমোদন কীভাবে দিলো।

ভবন নির্মাণে সিডিএ’র অনুমোদনপত্র দেখাতে বললে তিনি বলেন, ‘আমি খুব অসুস্থ, বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছি।’ সিডিএ’র অনুমোদনপত্র এই মুহূর্তে দেখাতে পারবেন না জানিয়ে পরে কোনো এক সময় তার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।

এ বিষয়ে সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘নিয়ম বহির্ভূতভাবে নগরীতে যে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে তা অস্বীকার করা যাবে না। তবে আমরা অভিযোগ পেলেই তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।’

তিনি বলেন, ‘আমি বিষয়টি ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের অবহিত করবো। যেহেতু এই বিষয়ে পূর্বের অভিযোগ আছে তাই আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে কোনো বিলম্ব হবে না বলে আশা করছি।’

নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সিডিএ’র নীতিমালা অনেকেই মানছেন না। সিডিএ ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে জরিমানাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই বিষয়ে আরো কঠোর হতে হবে তাদের।