বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০, ৭ কার্তিক ১৪২৭

এবারের পুজোর স্লোগান হোক উৎসব নয়, মানুষের পুজো

প্রকাশিতঃ সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০, ১:৪০ অপরাহ্ণ


তাপস কুমার নন্দী : করোনাভাইরাসের সাঁড়াশি চাপে এবারে সার্বজনিক বা বারোয়ারি পুজোর ভাবনায় ছেদই পড়েছে মোটামুটি।
গত কয়েকদিনে বিভিন্ন পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের বক্তব্যে ‘‌পুজো হবে’‌ এই আশ্বাসবাণীতে পুজো আয়োজক বা উদ্যোক্তাদের আবার চাঙ্গা করেছে।

যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনেই পুজো পরিকল্পনায় আবার উঠেপড়ে লাগলেন বিশেয করে শহরের পুজো উদ্যোক্তারা। বহরে ছোট হলেও থিম পুজোর ভাবনা থেকে সরে এসেছে এঁরা। অনেকেই পূজোর নির্দেশিকা জমা করেছে স্হানীয় প্রশাসনের কাছে, সেই নিয়মাবলী মেনেই হবে এবারের পুজো।

‘‌উৎসব নয়, মানুষের পুজো’‌— আমার মতে এবারের পুজোর স্লোগান এটি হওয়া উচিত।

কোনও রকম জাঁকজমক নয়, তবে সাত্ত্বিকী পুজোর মধ্যে থাকতে হবে নান্দনিক ছোঁয়া। এমনই জানালেন জেলা পুজো উদযাপন পরিযদের সভাপতি শ্যামল পালিত।

খুব কম সংখ্যক লোক নিয়ে সামাজিক দূরত্ববিধি মেনেই তৈরি করা হবে প্রতিমা ও মণ্ডপ। তবে প্রতিটা কাজেই থাকবে একটি ভাবনা ও সুরুচির স্পর্শ। ডেকোরেটর, ইলেকট্রিশিয়ান, ঢাকি— সব পেশার কর্মীদেরই কাজে ডাকা হবে। এজন্য সবাইকে কাজ দিতে না পারলেও ঠকবেন না কেউ-জানালেন বিভিন্ন পুজো উদযাপন পরিযদের নেতৃবৃন্দ। তাহলে ঢাকিরা ঢাক বাজানোর সুযোগ না পেলেও পুরো পারিশ্রমিক পাবে কি?এমন প্রশ্ন অনেকেরই।

আমার মতে, এবছর পুজোর আড়ম্বর কমিয়ে মানুষের সেবা ও স্বাস্থ্যরক্ষাই হবে এবারের পূজোর প্রধান প্রয়াস। বাজেট নয়, পকেটমানি থেকেই চলতে হবে এবারের পুজোর খরচ।

চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিযদের সভাপতি এডভোকেট চন্দন তালুকদার জানালেন, গত ২০ বছর ধরে থিম পুজোর জয়জয়কার। প্রতিবার পুজো শেষ হতে না হতেই পরের বছরের থিমের পরিকল্পনা শুরু হয়ে যায়। এতসব পরিকল্পনা এবারে বানচাল করা হয়েছে। কিছুটা বাজেট কমিয়ে সাত্ত্বিকভাবে পুজো হবে এবার জে এম সেন হল পুজো মণ্ডপে। সম্পুর্ণ সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে হবে এবারের পুজোর আয়োজন।

গ্রামবাংলার কারিগররা বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ে পুজো কমিটির ডাক পাওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকে। পুজোর কাজটাই ওদের সারা বছরের রুটিরুজি। অভিজ্ঞদের মতে, লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রেখে ওই ‘দিন আনি দিন খাই’ কারিগরদের মুখে হাসি ফোটানোর কর্তব্যও থাকা দরকার মনে করে সকলে।

নগরীর ঐতিহ্যগত আগ্রাবাদ একতা গোষ্ঠীর এবছর পুজোর জাঁকজমক তেমন একটা হবে না ঠিকই, নিজেদের ভাবনায় ও পরিকল্পনায় মণ্ডপ সেজে উঠবে। প্রতিমা বেশি বড় হবে না। মণ্ডপের প্রবেশপথ ও প্রশস্ত হবে সরকারের নির্দেশ মেনেই। আলোর কারিকুরি কম হবে। যাতে দিনের বেলায়ও মণ্ডপসজ্জা দেখতে দর্শকের অনাগ্রহ না হয়।

তাছাড়া এবার অনেক ক্লাবের নিজস্ব ওয়েবসাইট ও ফেসবুক লাইভ থেকে মণ্ডপসজ্জা দেখানো হবে। এতে মণ্ডপে ভিড়ের বহর কম হবে বলেই বিশ্বাস।

থিমপুজোকে ঘিরে প্রতিবছর যে‌সব প্রতিযোগিতা চলে দিনভর, এবছর সেসব চালানো সম্ভব কিনা সে বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তাও একটা নির্দিষ্ট ভাবনাকে অবলম্বন করেই দুর্গাপুজোর মণ্ডপ সজ্জায় আগ্রহী ঐতিহ্যগত হাজারী লেইনে সার্বজনীন পুজোমণ্ডপ।

আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডের সদ্য সাবেক কমিশনার জহরলাল হাজারীর কথায়, এক চতুর্থাংশ বাজেট নিয়ে পুজো হবে এবার। আলো, ঠাকুর, মণ্ডপ সবকিছুর দায়িত্বে শিল্পী ও অভিঞ্জজনেরা থাকবে। হবে না কোনও উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, বা বিজয়া সম্মিলনী।

তবে পুষ্পাঞ্জলি ও সন্ধিপূজা কীভাবে দূরত্ববিধি মেনে সম্ভব— সে বিষয়ে চিন্তিত সব কয়টি পুজো উদ্যোক্তাই।
পুজোমণ্ডপে ভিড়ের কারণে যাতে সংক্রমণ না বাড়ে সেটাই প্রধান বিবেচ্য।

টেরিবাজার পূজা উদযাপন পরিষদ জানালেন, থিম পুজো একেবারে বাদ দেওয়ার পক্ষপাতি তারা। অতিমারীর আবহে ঘরবন্দি মানুষ, বিশেষ করে ছোটরা খুব মনমরা। এদের মনে একটু আনন্দ দিতে ও পুজোমণ্ডপ একটু চিত্তাকর্ষক হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন পূজার্থীরা।

দেওয়ানজী পুকুরপাড়ের পূজার্থীরা নিজেরাই চাঁদা তুলে পুজোর আয়োজনে উদ্যোগী হয়েছেন। বড় কোনও বিজ্ঞাপন বা পৃষ্ঠপোষক পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। রহমতগঞ্জ পুজো উদযাপন পরিযদের সদস্যরা এবার পুজোর খরচ অনেক কমিয়ে আনবে। তাদের কথায়, ছোট বাজেটের মধ্যেই পুজো সারা হবে।

ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পুজো উদযাপন পরিযদের আয়োজনে এবারের পুজো হবে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে। এরমধ্যেই থাকবে ছোট করে থিমের ছোঁয়া। কারিগরদের পারিশ্রমিক দিতে ও পুজো সরঞ্জাম কিনতেই যা খরচ। বাকি টাকা করোনা রোগীদের সেবায় খরচ করা হবে। রোজগারহারাদের স্বাবলম্বনের ব্যবস্থা হবে।

চট্টগ্রামের গ্রাম-গঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পুজোগুলোর মধ্যে বাশঁখালীর সাধনপুর পল্লী মঙ্গল সমিতির আয়োজনে সার্বজনীন দুর্গাউৎসব সরকারের নির্ধারিত নির্দেশ মোতাবেক সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে অনুষ্ঠিত হবে। পুজোর কিছুটা বাজেট সামাজিক উন্নয়ন কাজে ব্যয় করা হবে। পুজোর বাজেট থেকে এর মধ্যে দুর্গা মন্দিরের নতূন রঙ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিদ্যুৎ কুমার নন্দী।

কর্পোরেট সংস্থার বিজ্ঞাপন থেকেই শহরের পুজো কমিটিগুলো ১০–‌২০ শতাংশ টাকা তোলে। এবার সেই বিজ্ঞাপনের সুযোগ নেই বললেই চলে। তবুও পুজার্থীরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সাত্ত্বিকী পুজোর আয়োজন করবে বলে অনেকেই মনে করেন। মোট কথায়, এবারের পুজো হবে-উৎসব নয়, মানুষের পুজো।