শনিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩২

ভিসা ছাড়াই চট্টগ্রামে অবৈধভাবে শিক্ষকতা করছেন ব্রিটিশ নাগরিক!

| প্রকাশিতঃ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৯:৫১ অপরাহ্ন


শরীফুল রুকন : প্রায় দুই বছর ধরে ভিসা না নিয়ে অবৈধভাবে চট্টগ্রামে অবস্থান করে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার অভিযোগ উঠেছে মার্ক জেমস বার্থোলিমিও নামের একজন ব্রিটিশ নাগরিকের বিরুদ্ধে।

মার্ক জেমস বার্থোলিমিও চট্টগ্রামের বেসরকারি সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ এর ইংরেজি বিভাগের এডভাইজার হিসেবে কাজ করছেন গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়টির ইংরেজির বিভাগীয় প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পান তিনি।

এছাড়া নগরের মেহেদীবাগে সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চট্টগ্রাম ল্যাঙ্গুয়েজ ইন্সটিটিউটে (সিএলআই) ইংরেজি ভাষার পরিচালক হিসেবেও কাজ করছেন মার্ক জেমস বার্থোলিমিও। এর আগে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছিলেন।

বিনিয়োগ বোর্ড নীতিমালা ২০১১ এর ৫ (ক) অনুযায়ী, বাংলাদেশে যে কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে হলে প্রথমে বিডা থেকে বিদেশিদের ওয়ার্ক পারমিট নিতে হয়। পরে কাজের ধরন অনুযায়ী কাজের ভিসাও নিতে হয়।

তাছাড়া আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ৫৬ ধারা অনুযায়ী বিদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৩০ শতাংশ কর দিতে হয়। কিন্তু মার্ক জেমস বার্থোলিমিও তার ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন। ফলে তিনি যেমন অবৈধভাবে কাজ করছেন এদেশে, আবার রাজস্বও ফাঁকি দিচ্ছেন। এসব অপরাধের জন্য মামলা, জেল-জরিমানার বিধান আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ৫ মার্চ মেয়াদে ‘ই’ টাইপ ভিসায় বাংলাদেশে আসেন মার্ক জেমস বার্থোলিমিও। সর্বশেষ ‘ই’ টাইপ ভিসায় ২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানের অনুমতি পান তিনি।

এরপর থেকে আর বাংলাদেশের ভিসা নেননি মার্ক জেমস বার্থোলিমিও। দেশের প্রচলিত আইনকে তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে চট্টগ্রামে অবস্থান করে সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ বেতনে চাকরি করছেন তিনি।

ভিসা ছাড়াই ব্রিটিশ নাগরিক বার্থোলিমিও’র বাংলাদেশে অবস্থানের বিষয়টি আজ সোমবার একুশে পত্রিকাকে নিশ্চিত করেছেন বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস, চট্টগ্রাম এর পরিচালক মো. আবু সাইদ।

সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেয়া বার্থোলিমিও’র শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তিনি কিলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজতত্ত্বে দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেছেন ১৯৯৬ সালে। ডিপ্লোমা ইন ‘টিচিং ইংলিশ এজ ফরেন ল্যাংগুয়েজ টু এডাল্টস’ পাশ করেন ১৯৯১ সালে। পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন ‘এডুকেশনাল ম্যানেজমেন্ট’ পাশ করেন ২০০৩ সালে।

অথচ নিজেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী বলে বেড়ান মার্ক জেমস বার্থোলিমিও। সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রকাশনায় নিজের নামের আগে ‘ডক্টর’ লিখে আসছেন তিনি। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র না হয়েও সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাকে।

এদিকে ইউজিসি এবং একাডেমিক কাউন্সিলের অনুমোদন নেই এই রকম দুইটি বিষয়– সামাজিক বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান পড়ানোর জন্য সম্প্রতি অনলাইনে রুটিন প্রকাশ করেছে এই সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়; যা পড়াবেন ইংরেজি বিভাগের এডভাইজার মার্ক জেমস বার্থোলিমিও।

অন্যদিকে করোনায় আয় কমার অজুহাতে সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে ৭ জন প্রবীণ অধ্যাপককে বাধ্যতামূলক ছুটি ও অবসর প্রদান করেছে। এবং এপ্রিল থেকে অন্য শিক্ষকদেরকে ৫০ ভাগ বেতনও কমিয়ে দিয়েছে। অথচ বিদেশি এই অবৈধ শিক্ষক প্রতিমাসে কয়েক লাখ টাকা বেতন নিয়ে যাচ্ছেন।

সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক একুশে পত্রিকাকে অভিযোগ করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপকদের পর্যন্ত অপমানিত করেছেন মার্ক জেমস বার্থোলিমিও। তার ইন্ধনে ইংরেজি বিভাগের তিনজন অধ্যাপক ও দুইজন প্রভাষক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের একজন অধ্যাপক ও সাধারণ শিক্ষা বিভাগের দুইজন সহকারী অধ্যাপককে বাধ্যতামূলক ছুটি অথবা অবসরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। স্বেচ্ছাচারী এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সরওয়ার জাহান।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে গত বৃহস্পতিবার থেকে আজ সোমবার পর্যন্ত মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও সাড়া দেননি সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা, প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক সরওয়ার জাহান।

অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করা একজন ব্রিটিশ নাগরিককে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. মোজাম্মেল হক একুশে পত্রিকাকে বলেন, তিনি (বার্থোলিমিও) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন, পরে আমাদের এখানে গেস্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবে ছিলেন। এখন এডভাইজার হিসেবে কাজ করছেন, তিনি আমাদের ফুল টাইম এমপ্লয়ী না।

অনুমোদন নেই এই রকম দুইটি বিষয়ে বার্থোলিমিওকে পড়ানোর দায়িত্ব দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়টা আমাকে একটু দেখতে হবে। আমিও একজন শিক্ষক, রেজিস্ট্রারের চার্জে আছি। অফিসিয়াল বিষয়গুলো আমাকে একটু দেখে-শুনে বলতে হবে।

এদিকে অবৈধভাবে মার্ক জেমস বার্থোলিমিও’র বাংলাদেশে অবস্থান প্রসঙ্গে বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস, চট্টগ্রাম এর পরিচালক মো. আবু সাইদ একুশে পত্রিকাকে বলেন, ওই বিদেশি নাগরিক এখন যদি আমাদের কাছে ভিসার জন্য আসেন, তাহলে তাকে জরিমানা গুণতে হবে। এছাড়া আইন অনুযায়ী মামলাও হতে পারে। তবে এসব বিষয় দেখার দায়িত্ব পুলিশের বিশেষ শাখার।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) বিশেষ শাখার উপ-কমিশনার আবদুল ওয়ারিশ একুশে পত্রিকাকে বলেন, বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখে আইনগত পদক্ষেপ নেবো।

অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ব্রিটিশ নাগরিক মার্ক জেমস বার্থোলিমিও’র মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাড়া দেননি। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত বৃহস্পতিবার তার মুঠোফোনে খুদেবার্তা ও ইমেইল ঠিকানায় বার্তা পাঠানো হলেও আজ সোমবার রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জবাব দেননি বার্থোলিমিও।