শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ৯ কার্তিক ১৪২৭

করোনার মাঝেও বাড়তি ফি, অনাদায়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাসবঞ্চিত করছে সাইডার!

প্রকাশিতঃ শনিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২০, ৭:৪৭ অপরাহ্ণ


জোবায়েদ ইবনে শাহাদাত : নগরের ইংরেজী মাধ্যমে পরিচালিত “সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল” কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত টিউশন ফি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

শিক্ষার্থীদের পূর্বের বেতনের উপর আইন বহির্ভূতভাবে ১২% অতিরিক্ত বেতন দাবি করছে স্কুলটি। আর অন্যায়কে বৈধতা দিতে ছলনার আশ্রয় নিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ১২ শতাংশ বাড়িয়ে তার থেকে ১০ শতাংশ মওকুফের কথা ঘােষণা করে তারা। ফলে লোকদেখানো ওয়েভার দিলেও তা মূল বেতনের চেয়ে ২ শতাংশ বেশি থেকে যায়।

শুধু তাই নয়, ম্যানেজিং কমিটি গঠন না করেই সরকারী গেজেট অমান্য করে আইনবহির্ভূতভাবে টিউশন ফি ও অন্যান্য খরচ একতরফাভাবে নির্ধারণ করে আসছে সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কর্তৃপক্ষ। অতিরিক্ত টিউশন ফি দিতে না পারা শিক্ষার্থীদের স্কুলের চলমান অনলাইন ক্লাস থেকে বের করে দেয়ারও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকেরা।

অভিভাবকদের মতে, অন্যান্য সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে হারে টিউশন ফি আদায় করা হতো, করোনাকালে অনলাইন ক্লাসের জন্য সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল তার চেয়ে বেশি টিউশন ফি আদায় করছে। ফলে এপ্রিল মাস থেকে স্কুলের বেতন পরিশােধ করতে অক্ষম হয়ে বেকায়দায় পড়েছেন অভিভাবকেরা।

সাইডার স্কুল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের সরকারি আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ পেয়ে অনুসন্ধানে নামে একুশে পত্রিকার অনুসন্ধানী টিম। অভিভাবকদের পক্ষ থেকে অধ্যক্ষকে পাঠানো চিঠি আসে একুশে পত্রিকার হতে।

অধ্যক্ষকে পাঠানো সেই চিঠিতে, অভিভাবকেরা মাসিক বেতনের উপর আংশিক মওকুফ অথবা টিউশন ফি প্রদান করতে অক্ষম অভিভাবকদের সমস্ত বকেয়া কিস্তিতে প্রদানের সুবিধা দিতে এবং নির্বাচিত ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের আগ পর্যন্ত শিক্ষাবর্ষের নতুন অধিবেশনের টিউশন ফি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত স্থগিতের বিষয়গুলো উল্লেখ করেন।

চিঠি প্রেরণকারী অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সেসময় এই বিষয়ে কোনো সহায়তা করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছিলেন অধ্যক্ষ।

অভিভাবকেরা জানান, এ ঘটনার পর ৩ অক্টোবর অভিভাবকেরা একত্রিত হয়ে একটি সভা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সকলের সম্মতিতে একটি অভিভাবক ফোরাম গঠন করেন। ৭ অক্টোবর স্কুল এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে অভিভাবক ফোরাম থেকে এই বিষয়গুলো উল্লেখ করে একটি চিঠি পাঠানো হলেও স্কুল থেকে কোনও সাড়া পাননি তারা। উপরন্তু চিঠি প্রেরণকারী অভিভাবকের সন্তানসহ আরাে বেশ কয়েকজন অভিভাবকের সন্তানকে গত ১১ অক্টোবর স্কুলের গুগল ও জুম ক্লাস থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

স্কুল কর্তৃপক্ষের এমন আচরণকে অনাকাঙ্ক্ষিত, অমানবিক ও হিংসাত্মক বলে মনে করছেন সমাজের গুণীজন ও শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের সাথে আলােচনা না করে বা কোনও ধরনের নােটিশ প্রদান না করে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

এদিকে, ভুক্তভােগি অভিভাবকগণ ১২ অক্টোবর স্কুলের অধ্যক্ষকে ইমেইলের মাধ্যমে বিষয়টি জানিয়ে ক্লাসে অংশগ্রহণের অনুরােধ জানালেও তিনি কোনও উত্তর প্রদান করেননি। অভিভাবকদের পক্ষ থেকে পরবর্তিতে ১৩ অক্টোবর স্কুলে রেজিস্ট্রি ডাকযােগে চিঠি পাঠানো হলেও স্কুল কর্তৃপক্ষ থেকে কোনও সদুত্তর মিলেনি।

বাংলাদেশের ইংরেজী মাধ্যমে পরিচালিত স্কুলগুলাের ভারসাম্যহীন ও উচ্চহারে টিউশন ফি নিয়ন্ত্রণের আইনানুগ কাঠামাে নিশ্চিত করতে ২০১৭ সালে সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশী কারিক্যুলামে পরিচালিত বেসরকারি বিদ্যালয় নিবন্ধন বিধিমালা- ২০১৭ জারি করেন। এই বিধিমালার ধারা ৭ এ স্পষ্ট করে নির্দেশনা দেয়া আছে, একটি নির্বাচিত ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে স্কুলের বেতন, খরচ, শিক্ষক নিয়ােগ ও স্কুল পরিচালনার সমস্ত বিষয় নির্ধারিত হবে।

শুধু তাই নয়, সরকারি গেজেটে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, শিক্ষাব্যবস্থার অন্যান্য ব্যয় ও বিদ্যালয়ের অন্যান্য অপারেটিং ইস্যুগুলো একটি নির্বাচিত ম্যানেজিং কমিটি দ্বারা নির্ধারিত হবে এবং এই কমিটি গঠিত হবে অভিভাবকদের মধ্য থেকে দু’জন নির্বাচিত সদস্যের সমন্বয়ে।

সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ভুক্তভোগী অভিভাবকদের সাথে কথা হলে তাদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘করোনার কারণে সৃষ্ট আর্থিক অসঙ্গতিতে স্কুলের টিউশন ফি দিতে অক্ষম হয়ে পাড়ি। ফলে আমরা স্কুল কর্তৃপক্ষকে প্রথমে মাসিক বেতনের উপর আংশিক মওকুফের অনুরোধ করি। সেটা সম্ভব না হলে টিউশন ফি’র বকেয়া কিস্তিতে প্রদানের সুবিধা দেওয়ার অনুরোধ করি। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ সেগুলো না করে উল্টো ১২ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধি করে। স্কুল প্রতিষ্ঠাতা নাদের খানের সাথে এই বিষয়ে আমরা কথা বলতে গেলে তিনি আমাদের সাথে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করেন। আমরা এই বিষয়ে একটি সুরাহা চাই।’

সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অভিভাবক ফোরামের সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আফরােজা আক্তার একুশে পত্রিকাকে বলেন, ২০১৭ সরকারি গেজেটে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনও শিক্ষাব্যবস্থার অন্যান্য ব্যয় এবং বিদ্যালয়ের অন্যান্য অপারেটিং ইস্যুগুলি একজন নির্বাচিত ম্যানেজিং কমিটি দ্বারা নির্ধারিত হয় যা অভিভাবকদের কাছ থেকে নির্বাচিত দু’জন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হওয়া উচিত। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ এখনও ম্যানেজিং কমিটি গঠন না করে শিক্ষাব্যবস্থা এবং অন্যান্য ফি একতরফাভাবে বৃদ্ধি করে যাচ্ছে, যা আইনের প্রতি সুস্পষ্ট বৃদ্ধাঙ্গুলি।

তিনি আরো বলেন, আমরা বেশ কয়েকবার স্কুলের অধ্যক্ষ ও চেয়ারম্যান নাদের খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি জানিয়ে সুরাহা করার অনুরোধ জানালেও স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের কথা কর্ণপাত করেনি। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ৩০ অক্টোবরের মধ্যে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে আমরা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।’

এদিকে, উদ্ভুত পরিস্থিতিতে এই বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বাের্ড (মাউশি) চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. গাজী গোলাম মাওলার সাথে ১৫ অক্টোবর সরাসরি দেখা করেন ভুক্তভোগী অভিভাবকেরা। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাঅধিকার থেকে বেআইনিভাবে বঞ্চিত করার প্রতিকারের আবেদন জানিয়ে একটি চিঠিও দেয়া হয় তাকে। সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আনিত এসব অভিযোগ তদন্ত করে সমাধানের কথাও অভিভাবকদের জানান তিনি।

জানতে চাইলে মাউশি চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. গাজী গোলাম মাওলা একুশে পত্রিকাকে বলেন, ইংরেজী মাধ্যমে পরিচালিত যে স্কুলগুলো আছে তারা বাংলাদেশের শিক্ষা কারিক্যুলাম অনুসরণ করে না। আর আমাদের পক্ষ থেকে তাদের কোনো বেতন ভাতাও দেয়া হয় না। শিক্ষা অধিদপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার অনুযায়ী আমরা এসব স্কুলকে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দিতে পারি মাত্র। এধরনের স্কুলকে কোনও ধরনের নির্দেশনা দেয়া বা কর্তৃত্ব করার কাজ আমরা করতে পারি না।

তিনি বলেন, যেহেতু অভিভাবকদের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ আমি পেয়েছি এবং তাদের কথাগুলো মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমার অন্তর ছুঁয়েছে তাই আমি তাদের বলেছিলাম স্কুলের চেয়ারম্যান নাদের খানের সাথে আমি ব্যক্তিগতভাবে এই বিষয়ে কথা বলে একটি সমাধানের অনুরোধে করবো।

এই অনিয়মের প্রতিকার চেয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজনের সাথেও দেখা করেন ভুক্তভোগী অভিভাবকেরা। সেসময় সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের চেয়ারম্যান নাদের খানকে ফোনে এ বিষয়ে দৃষ্টিপাত করে দ্রুত সমাধানের অনুরোধও জানান প্রশাসক সুজন।

এবিষয়ে চসিক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার কাছে সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের কয়েকজন অভিভাবক কিছুদিন আগে এসেছিলেন। আমি তাদের অভিযোগ শুনে বুঝতে পেরেছি টিউশন ফি দিতে না পারায় স্কুল কর্তৃপক্ষ অন্যায়ভাবে শিক্ষার্থীদের অনলাইন কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত করেছে। আমি স্কুলের চেয়ারম্যান নাদের খানের সাথেও এই বিষয়ে কথা বলেছি। তাকে অনুরোধ করেছিলাম অভিভাবকদের এসব যৌক্তিক দাবি বিবেচনা করে একটি সুরাহা করার। তিনি আমাকে বলেছিলেন অভিভাবকেরা যেন স্কুলের অধ্যক্ষকে বিষয়টি জানান। পরে জানলাম, অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার চিঠি পাঠানো হলেও অধ্যক্ষ কোনো সাড়া দেননি।’

প্রশাসক বলেন, ‘করোনাকালে দেশের প্রায় মানুষের আয় সংকুচিত হয়েছে, এই বিষয়টি স্কুল কর্তৃপক্ষের বোঝা উচিত। আর বর্তমানে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মত আচরণ করছে। বেতন দিতে না পারলে শিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে পারবে না, এই সিদ্ধান্ত তো মেনে নেয়া যায় না। আমি দু-একদিনের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীকে চিঠি পাঠিয়ে এই বিষয়ে সমাধানের অনুরোধ করবো।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের চেয়ারম্যান নাদের খান একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার স্কুলটি একটি নন প্রফিটেবল স্কুল। এই স্কুলে ২শ ২৫ জন স্টাফ আছে, তাদের বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচ আমার ঠিকই দিতে হচ্ছে। অভিভাবকেরা যদি টিউশন ফি না দেন তাহলে আমি কীভাবে এই খরচগুলো সামলাবো? এই স্কুলের খরচ বাবদ ব্যাংকে ইতোমধ্যে আমার ১৮ কোটি টাকা লোন আছে।- যোগ করেন তিনি।

টিউশন ফি দিতে পারা শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস থেকে বঞ্চিত করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টিউশন ফি দিতে না পারলে আমি ক্লাসে শিক্ষার্থীকে কেন অনুমতি দিব? প্রয়োজনে আমি স্কুল বন্ধ করে দিবো, তারপরও টিউশন ফি পরিশোধ না করলে অনলাইন ও রেগুলার ক্লাসে তাদের সুযোগ দেয়া হবে না। বেতন না দিয়ে শিক্ষাবর্ষ শেষ করার জন্য অভিভাবকেরা এই ফন্দি করছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এসময় তিনি এই অভিভাবকদের ইডিয়ট বলে গালমন্দ করেন।

করোনাকালে ১২ শতাংশ টিউশন ফি বাড়ানো বিষয়ে জানতে চাইলে নাদের খান কোনো সদুত্তর না দিয়ে এবিষয়ে স্কুলের অধ্যক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।

পরে সাইডার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অধ্যক্ষ ভারতীয় নাগরিক জে সি ত্রিপাঠির মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার কল করা হলেও কোনওভাবেই তার নাম্বারে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।