শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সিডিএ’র ৪৫ কোটি টাকার মাল্টিস্টোরেড কমার্শিয়াল বিল্ডিং অচল-অযোগ্য!

প্রকাশিতঃ রবিবার, অক্টোবর ১৮, ২০২০, ৪:৫০ অপরাহ্ণ

জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : সিডিএ’র তত্ত্বাবধানে ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর উদ্বোধন করা হয় মাল্টিস্টোরেড কমার্শিয়াল বিল্ডিং বিপণী বিতান (বি ব্লক)। তবে বিপণী বিতানের (নিউ মার্কেট) পেছনে এই বাণিজ্যিক ভবনের নির্মাণ কাজ পুরোপুরি শেষ হয় ২০১৪ সালের জুন মাসে।

শুরুতে ভবন নির্মাণের প্রাক্কলিত ব্যয় ২১ কোটি ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা ধরা হলেও ৩ ধাপে তা দ্বিগুণের বেশি (২৪ কোটি ৩১ লাখ ৫৪ হাজার) বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত সংশোধিত সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় ৪৫ কোটি ৩৩ লাখ ৭৯ হাজার টাকা।

নগরের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক চাহিদার সাথে সমন্বয় করে দোকান/মার্কেটের ব্যবস্থা করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এই মাল্টিস্টোরেড কমার্শিয়াল বিল্ডিং নির্মাণ করা হলেও বর্তমানে এই মার্কেটটি পড়ে আছে অনেকটা অকেজো হয়ে।
দোকানিরা বলছেন, প্রায় দোকানের সামনে বিগত ৩-৪ বছর ধরে ঝুলছে ‘ভাড়া দেয়া হবে’ মর্মে সাইনবোর্ড। নগরের অন্যান্য মার্কেটের মত জমজমাট থাকার কথা থাকলেও সিডিএ’র সিদ্ধান্তে ও তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই মার্কেটে জমজমাট শুধুমাত্র পার্কিংটাই।

দোকানিরা বলছেন, উপরের তলায় দোকানগুলো খালি থাকায় এতে জনসমাগম একদমই থাকে না। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীরা নিজেদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে বেছে নিয়েছে ভবনটিকে। এমনটাই অভিযোগ দোকানিদের।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর ৯ তলার একটি বন্ধ দোকানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। দোকানটি বন্ধ ও পরিত্যক্ত হওয়ায় কোনও ক্ষয়ক্ষতি না হলেও দোকানিদের ধারণা মাদকসেবিদের ছুঁড়ে ফেলা আগুনের ফুলকি থেকে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত।

পাহাড় ঘেঁষে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা ব্যয়ে এই কমার্শিয়াল বিল্ডিং নির্মাণ করা হলেও এতে দেওয়া হয়নি কোনো ধরনের রিটার্নিং ওয়াল। ফলে বর্ষাকালে পাহাড় বেয়ে পানির ঢল সরাসরি ঢুকে পড়ে ভবনে। এসময় ভবনের নিচতলা ও দোতলার প্রত্যেকটি দোকান পানিতে নিমজ্জিত থাকে। আর একারণে দোকান ভাড়া নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না দোকানিরা। উপরন্তু দোকান ছেড়ে চলে গেছেন অনেকেই, এমনটাই বলছেন বিপণী বিতান ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি সংশ্লিষ্টরা।

গত ৮ অক্টোবর বিপণী বিতানে (বি ব্লক) সরেজমিনে প্রবেশ করতে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশমুখে গ্লাসডোরটি পড়ে আছে ভাঙাচোরা অবস্থায়। আর এই ডোরের জায়গায় কোনো রকমের টিন দিয়ে ঘেরাও দিয়ে রাখা হয়েছে। এছাড়াও নোংরা পানি এবং শ্যাওলায় স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে আছে নিচতলার মেঝে। ২য় তলায় দেখা মেলে একই দৃশ্যের। ১০ তলা ভবনটি ঘুরে ২য় তলার ২৫টি দোকান ছাড়া বাকি তলার অন্যান্য দোকানগুলো বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। অধিকাংশ দোকানের সামনে ঝুলতে দেখা গেছে টু-লেট।

শুধু তাই নয়, ভবনের অভ্যন্তরে আধুনিক সিভিল ওয়ার্কের মাধ্যমে এস্কেলেটর ও সাবস্টেশন নির্মাণ করা হলেও এগুলো পড়ে রয়েছে অকার্যকর হয়ে। এছাড়া লিফট ও ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে জেনারেটর রাখা হলেও জ্বালানি খরচের অভাবে বেশ কয়েক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে সেই জেনারেটরও।

সিডিএ থেকে পুরো ভবনের নিরাপত্তার জন্য ৭ জন সিকিউরিটি গার্ড থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে আছেন শুধু ১ জন। এই মাল্টিস্টোরেড কমার্শিয়াল বিল্ডিং সিডিএ’র তত্ত্বাবধানে থাকলেও তদারকির অভাবে তা রয়েছে বেহাল দশায়।

বিপণী বিতান (বি ব্লক) দ্বিতীয় তলায় দোকান ভাড়া নিয়ে ৫ বছর ধরে ইলেকট্রনিকসের ব্যবসা করে আসছেন সাগর কান্তি দাস।

একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, এই মার্কেটে দোকান ভাড়া নিয়ে গত ৫ বছর ধরে বিশাল লোকসানে আছি। বিল্ডিংয়ের পেছন দিয়ে প্রায় সময়ই পানি ঢুকে। আমার ইলেকট্রনিকস মালামাল এই পানির কারণে নষ্টও হয়েছে অনেকবার। বেশিরভাগ সময়ই মার্কেট পানিতে নিমজ্জিত থাকায় ক্রেতারাও তেমন একটা আসেন না। এছাড়া মাদকসেবিদের ভয়ে রাত না হতেই আমাদের দোকান বন্ধ করে দিতে হয়।

অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণ ও তদারকির অভাবে ভবনটির ৯০ শতাংশই অব্যবহৃত রয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিপণী বিতান ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ সাগির।

একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, এই বিপণী বিতান বি ব্লকের পেছনে পাহাড় থাকায় সেই পাহাড় বেয়ে প্রায় দোকানে পানি প্রবেশ করে। বর্ষাকালে তো দোকানগুলো পানিতে নিমজ্জিত থাকে, এছাড়া এমনিতেও পাহাড় ঘেমে পানি প্রবেশ করে। আর যেখানে প্রায় সময়ই পানি থাকে সেখানে দোকানিরা কীভাবে ব্যবসা করবে?

সিডিএ’র অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘নগরের উন্নয়ন করার দায়িত্ব সিডিএ’র কাধে থাকলেও তারা উন্নয়ন না করে বর্তমানে ব্যবসা করছে। তাদের এই অব্যবস্থাপনার তদারকি যদি না করা হয় তাহলে সরকারি টাকা খরচ করে সিডিএ একের পর এক লস প্রজেক্ট করেই যাবে। ফলে আমাদের উন্নতি তো নয়ই, বরং অবনতি ঘটবে।’

অপরিকল্পিতভাবে প্রকল্প গ্রহণ ও দায়িত্ব পালনে গাফিলতির বিষয়ে সিডিএ’কে দুষছেন নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান।

একুশে পত্রিকাকে তিনি বলেন, বিপণী বিতান বি ব্লক ভবন নির্মাণে সিডিএ’র পক্ষ থেকে যারা কনসালটেন্ট ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ছিল তাদের গাফিলতির এবং অসচেতনতার কারণেই আজ এই ভবনটি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে আছে। পাহাড় ঘেঁষে কোনো ভবন নির্মাণের পূর্বে অবশ্যই রিটার্নিং ওয়াল দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই ভবনটি নির্মাণে তা মানা হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘সিডিএ নগরের ভবন নির্মাণের নকশা ও অনুমতি দেয়। কোনো ত্রুটি থাকলে সেগুলো দেখিয়ে তা শুধরে দেওয়ার কাজ করে। কিন্তু সিডিএ যখন কোনো ভবন নির্মাণ করে এবং সেটাতে যখন ত্রুটি থাকে তখন তার দায়িত্ব কে নিবে? সরকারি টাকা খরচ করে এতো বড় ভবন নির্মাণ করছে কিন্তু এর নকশায় ত্রুটি থাকার কারণে নির্মিত এই ভবন ব্যবহার করা যাচ্ছে না।’

এই বিষয়ে সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুস সালাম একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এই ভবনের ডিজাইন ও নির্মাণ কাজের সাথে আমি সম্পৃক্ত নই। আমি শুধুমাত্র এর বরাদ্দ দিয়েছিলাম। ভবনের সেইফটির জন্য যে ওয়ালটি নির্মাণ করা হয়েছিল তা ত্রুটিপূর্ণ ছিল। তখন আমি বিপণী বিতান ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতিকে বলেছিলাম, এই ত্রুটির সমাধান করা হয়েছে কিনা তা আমাকে লিখিতভাবে জানাতে। তাদের রিপোর্টের উপর নির্ভর করে আমি ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করবো বলেও জানিয়েছিলাম।

যদি তারা বলতো এর সমাধান হয়নি তাহলে আমি এর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করতাম না। তারা আমাকে তখন কিছু জানায়নি। কিন্তু এখন যদি বিপণী বিতান ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি এই কথা বলে তাহলে কী বা করার থাকে? আমি সেসময় চেষ্টা করছি এই সমস্যার সমাধান করার।’

সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এই বিষয়ে বিপণী বিতান ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে আমরা গত সপ্তাহে তাদের সাথে বৈঠক করেছি। তারা তাদের সমস্যাগুলো আমাদের জানিয়েছে, আমরা সেই অনুযায়ী একটা পরিকল্পনা করেছি।’

তিনি বলেন, ‘ভবনে পানি প্রবেশের সমস্যার সমাধান করতে আমরা রিটার্নিং ওয়াল এবং পানি নির্গমনের জন্য একটি প্রশস্থ নর্দমা নির্মাণ করার পরিকল্পনা করেছি। খুব শীঘ্রই এর টেন্ডার আহ্বান করা হবে।’

এই বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম দোভাষ একুশে পত্রিকাকে বলেন, আমরা এই বিষয়ে সুরাহা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আপনাদের জানিয়ে রাখি খুব তাড়াতাড়ি বিপণী বিতানের সমস্যার সমাধান করে দেয়া হবে। তবে এরপর ভবনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বিপণী বিতান ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতিকে পালন করতে হবে।’