শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

পানিভাতের ব্রত : চট্টগ্রামের লোকাচার

প্রকাশিতঃ রবিবার, অক্টোবর ১৮, ২০২০, ৬:০৬ অপরাহ্ণ


জ্যোতির্ময় নন্দী : “আশ্বিনে রাঁধে, কার্তিকে খায়/যে বর মাগে, সে বর পায়।”

চট্টগ্রাম অঞ্চলে এটা একটা বহু উচ্চারিত ও শ্রুত লোকছড়া। ছড়াটার উপলক্ষ হলো চট্টগ্রামী হিন্দুদের মধ্যে বহুলপ্রচলিত একটি ব্রতপুজো, যার নাম ‘অশ্বিনীকুমার ব্রত’। কিন্তু কোনো লোকদেবতা বা উপদেবতা নয়, খাস বৈদিক দেবতা ‘অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের’ উদ্দেশ্যে এ ব্রতের আয়োজন করা হয়।
চট্টগ্রামের লোকমুখে এ ব্রত ‘পান্তাভাতের ব্রত’ (পানিভাতর বত্’) নামেও পরিচিত। আরেকটা মজার ব্যাপার হলো, চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের উচ্চারণে অশ্বিনীকুমারের লিঙ্গান্তর হয়ে ‘আশ্বিনকুমারী’ হয়ে গেছে!

‘অশ্বিনীকুমারদ্বয়’-কে বেদে ও পুরাণে ‘অশ্বিন’, ‘অশ্বিনৌ’, ‘নাসত্য-দস্রা’, ‘নাসত্যদ্বয়’ ইত্যাদি বহু নামে উল্লেখ করা হয়েছে। ঋগ্বেদে বহু শ্লোক বা ঋক্ এই দেবতাদ্বয়ের উদ্দেশ্যে উৎসর্গিত। পুরাণমতে, তাঁরা সূর্য এবং তাঁর অশ্বীরূপধারিণী স্ত্রী সংজ্ঞার সন্তান। কারো মতে, তাঁরা সবসময় অশ্বপৃষ্ঠে বা অশ্বচালিত রথে চলাচল করেন বলেই তাঁরা অশ্বিন বা দ্বিবচনে অশ্বিনৌ নামে পরিচিত। কারো মতে তাঁদের দেহ মানুষের, কিন্তু মুণ্ড ঘোড়ার। তাঁরা স্বর্গবৈদ্য, অর্থাৎ দেবচিকিৎসক, ত্রিভুবনের সব বৈদ্য বা চিকিৎসকের আরাধ্য দেবতা, চিরযৌবন ও চিরায়ুর প্রতীক।

এই বৈদিক দেবতা চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রধানত অবৈদিক, অর্থাৎ লোকায়ত ঘরানার এক ব্রতের আরাধ্য হলেন, তা ব্যাপক গবেষণার দাবি রাখে।

এ ব্রতে কোনো তিথিনিয়ম মানা হয় না, কোনো প্রতিমা বানাতেও কাউকে দেখিনি। আশ্বিন মাসের শেষদি বা আচারভেদে তার আগের দিন শুদ্ধ-পবিত্রভাবে আতপচালের ভাত রান্না করে, তাতে জল, বট-অশ্বত্থ ও জবাফুলের কুঁড়ি, পাটকাঠি, খোসাসুদ্দু পাকা কলা, নারকোলের ফালি ইত্যাদি দিয়ে হাঁড়ির মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়। এ যেন কোনো ঔষধী বানানোর প্রক্রিয়া।

এদিকে বাংলা আশ্বিন মাসের শেষ তারিখে ঘট স্থাপন করে অশ্বিনীকুমার ব্রতারম্ভের পূজা করা হয়। কার্তিকের প্রথম দিন হাঁড়ির মুখ খোলা হয়। হাঁড়ির মুখ যতক্ষণ বন্ধ থাকবে, অর্থাৎ প্রথাভেদে একরাত-একবেলা অথবা একরাত, পুরো একদিন-একরাত আর আরো একবেলা মূল ব্রতী বা ব্রতীদের, অর্থাৎ যাঁদের নামে পুজো হচ্ছে, তাঁদের আহার গ্রহণ নিষিদ্ধ। আজকাল অনেকে অবশ্য এত দীর্ঘ উপবাস করে উঠতে পারেন না।

কার্তিকের পয়লা তারিখ সকালে ব্রতসমাপনী পূজাশেষে হাঁড়ির মুখ খোলার পর ব্রতীরা, পরিবারের অন্যান্যেরা, অতিথি- অভ্যগতরা এই অন্নপ্রসাদ, অর্থাৎ পান্তাভাত গ্রহণ করে। এ ভাতের সঙ্গে নুন বা রান্না করা তরিতরকারি খাওয়া নিষিদ্ধ, যদিও অনেকে আজকাল এ নিষেধাজ্ঞা মানতে চান না। এই ‘পানিভাত’ নারকেল, আখের গুড়, গুড় দিয়ে বানানো নারকেলের পুর, পাকা কলা ইত্যাদি দিয়ে খাওয়াটাই প্রচলিত সাধারণ নিয়মের মধ্যে পড়ে।

বিশ্বাস করা হয়, ঔষধিযুক্ত এ পান্তাভাত সর্বরোগ নিরাময়কারী। হিন্দুরা তো এ কথা বিশ্বাস করেই, পড়শি সম্প্রদায়গুলোর সদস্যরাও এ অন্নের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রাখেন, এটা আজীবন পদে পদে দেখেছি। লোকবিশ্বাসের কোন্ গভীরে এ বিশ্বাসের মূল প্রোথিত, তা অনুসন্ধান করা যেতে পারে।

অশ্বিনীকুমারদ্বয় এবং তাঁদের নামাঙ্কিত এই ব্রত সম্পর্কে ভবিষ্যতে আরো বিস্তারিত বলার ইচ্ছে রইলো।

জ্যোতির্ময় নন্দী : লেখক-কবি-সাংবাদিক-অনুবাদক