শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

যেন পূজা করাই সর্বসার, সর্ব মঙ্গলের মঙ্গল!

প্রকাশিতঃ বুধবার, অক্টোবর ২১, ২০২০, ১১:৩৭ অপরাহ্ণ


সুরেশ কুমার দাশ : শারদীয় দুর্গাপূজা হচ্ছেই। হওয়ারই কথা। কিন্তু হবে তা কেমনতরো। প্রত্যেক বছর যেমন হয় প্রায় তেমনই সাজ সাজ রব। দেখে-শুনে মনে হচ্ছে। কিন্তু প্রত্যেক বছর যেমনই হয় তেমন হওয়াটা কি প্রত্যাশিত ছিল। তাহলে কেমন হতে হবে?

কেমন হতে হবে এই প্রশ্নে পূজারীরা উদ্বিগ্ন নয়। একটু অনাড়ম্বর করার কথা যাদের বলার ছিল- তারা কেউ সেভাবে বলছেন না। হয়তো পূজার একটা অর্থযোগ থাকতে পারে! না হলে তাদের কারোর মধ্যে উৎকণ্ঠা নেই কেন? উৎকণ্ঠিত হওয়ার কথা কাদের। যারা আয়োজনে নেতৃত্ব দেয় তাদের। যাদের কথা সকলে মানে। কিন্তু তারা কাউকে কিছু মানাতে চাইছেন না। যেন পূজা করাই সর্বসার। সর্ব মঙ্গলের মঙ্গল। এটাই বুঝে নিয়েছে সবাই।

তাই আয়োজনের তোড়জোড়। কিন্তু আমরা যদি গত ৭/৮ মাসের পরিস্থিতি বিবেচনা করি, বর্তমান অবস্থাও ভাবি যেখানে দাঁড়িয়ে করোনা মহামারির কোনো ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি না, সেখানে শারদীয় দুর্গাপূজা নিয়ে এত তোড়জোড় করছি কেন? কেন দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে?

পৃথিবীর বহু দেশ আবারও লকডাউন দিচ্ছে। সেই অর্থে কেন ঈদ হলো না, কোরবান হলো না, জন্মাষ্ঠমী হলো না, মুজিব শতবর্ষের অনুষ্ঠান হলো না- ইত্যাদি। তারা বলবেন- এখন পরিস্থিতি সেই পর্যায়ে নেই। পরিস্থিতি ভালোর দিকে। তারা যেটা ভালো দেখছেন-সেটা তাহলে কেন অন্যদের উদ্বিগ্ন করছে।

এ কারণেই দুর্গাপূজার ব্যাপারে প্রশাসনের কাছ থেকে একটি কঠোর নীতিমালা আসা দরকার ছিল। দেবিদুর্গা সর্বমঙ্গলের দেবি। দুর্গাপূজা করে যদি করোনা আক্রান্ত না হওয়ার ১০০ ভাগ নিশ্চয়তা দেয়া যায়, তাহলে কোনো সতর্কতা বা স্বাস্থ্যবিধি টিকা কিছুরই দরকার নেই। সকলেই দুর্গাপূজা করত। আর তা যদি না হয়, যারা পূজা আয়োজনকারী তাদের বোঝা উচিত কীভাবে দেবিদুর্গার আগমনে সার্বজনীন কল্যাণ নিশ্চিত করা যায়। পূজা সেভাবে করা। সেটা যদি অনাড়ম্বর পূজায় বেশি নিশ্চিত হয় সেটাই করা উচিত নয় কি?

কিন্তু তার আদৌ কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কোনো জনসম্প্রদায় বা গোষ্ঠির ভব্যতা, সচেতনতা ও সতর্কতার মাপকাঠি বিবেচনা করা হয়, বাস্তব পরিস্থিতিকে কতটা মোকাবিলা করতে পারে তার উপর। পরিস্থিতি মোকাবিলার মাত্রা হলো- সচেতন। হিন্দুরা পরিস্থিতিসচেতন মানুষ সেটা তারা বোঝাতে পারত যদি তারা পূজা করলেও তা আড়ম্বরহীন করত। শুধু ঘটপূজা বলতে যা বোঝায়। অথবা শুধু দেবিকে অঞ্জলি প্রদান।

আমরা যদি ভাবি সপ্তমীর দিন থেকে শুরু করে নবমী পর্যন্ত রাতের ২-৩ টা পর্যন্ত যে পরিমাণ ভিড় পূজামণ্ডপগুলোতে দেখা যায়, বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে তা ভাবলে গা শিউরে উঠার কথা। এটাকে সাধারণ অর্থে শুধু ভিড় বললে কম বলা হবে। পূজামণ্ডপের ভেতর পর্যন্ত যেতে যে পরিমাণ ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি- এক পা আগালে ভিড়ের মধ্যে ধাক্কায় আবার তিন হাত পিছিয়ে যাওয়া, তারপর আবার সামনের যাওয়ার চেষ্টা- তাহলে এমন করোনা পরিস্থিতিতে সেটা কতই না ভয়াবহ পরিস্থিতি।

তারা শুধু নিজেরা রোগাক্রান্ত হলে ক্ষতি নেই- বর্তমান পরিস্থিতি বাইরে যাওয়ার যেখানে কোনো নীতি নিয়ম মানুষ মানছে না, সেখানে তাদের কেউ আক্রান্ত হলে তারা অন্য যে কোনো মানুষের জন্য সংক্রমণের কারণ হতে পারে। ভিড়ের মধ্যে ঘেমে নেয়ে সিদ্ধ হওয়া পরিস্থিতিতে তারা কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিমাদর্শন বা আরতি দেখবে। তাহলে এমন করোনা পরিস্থিতিতে যে আয়োজন হচ্ছে- সেটা কতই না ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

গত কয়েকদিন আগে গণমাধ্যমে করোনা আক্রান্তদের একটা জরিপের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। সেখানে ঢাকা শহরের ৪৫℅ মানুষ করোনা আক্রান্ত বলে জানানো হয়। এটা যদি সত্য হয়, প্রতিমা দর্শনার্থিদের ভিড়ের কারণে আরও কী পরিমাণ করোনা-আক্রান্ত হতে পারে। যেখানে ধর্ম যার যার উৎসব সবার- এমন প্রচারণায় বিশ্বাসী মানুষও থাকবে প্রতিমা দর্শনে বা মানুষের উৎসবমুখরতা দর্শনে।

যে বিষয়টা আয়োজনকারীরা মানতে চিন্তা করছে না সেখানে সাধারণ দর্শক-পূজারি ও ভক্তদের কথা নাই বা বললাম।
তবে অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানাচ্ছেন তারা প্রতিমাদর্শনে বের হবে না। এই প্রচারটা যদি সকলে করত তাহলে অনেকেই সচেতন হয়ে প্রতিমাদর্শনে বের হত না।

পশ্চিমবঙ্গের বিষয়টা একটু বলি- বর্তমান পত্রিকা লিখেছে, পূজা উপলক্ষে ইতিমধ্যে তারা করোনার সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা করেছেন। যে কারণে কিছু হাসপাতালে আগে থেকেই শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এতই যদি আশঙ্কা -তাহলে জনগণ কেন কোনো দায়িত্ব নিবে না। পূজা আয়োজনকারী, ভক্ত, পুরোহিতদের সর্বাগ্রে এজন্য কথা বলা দরকার ছিল।

গতকাল চট্টগ্রামের একটি পূজা কমিটির সংবাদ পড়েছি। তারা জৌলুসপূর্ণ আলোকসজ্জা, মণ্ডপের সাজসজ্জা, থিম, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আরতি প্রতিযোগিতা, সাউন্ড সিস্টেম বর্জন করার কথা বলেছে। কিন্তু এই কথা কি শুধুই পূজা কমিটির নাকি যারা প্রত্যেকে শারদীয়া পূজা আয়োজন করছে সকলের।

যখন এমন দুর্দিন, করোনা মহামরির মত ভয়াবহ একটি রোগের বিস্তার থামেনি, সেখানে শোনা যাচ্ছে, পুলিশ এবারের পূজায় আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে না।

নিরাপত্তার কথা না হয় পরে বললাম। কিন্তু কোভিড মহামারির ভয়াবহতার মধ্যে শৃঙ্খলারক্ষার জন্য পুলিশের প্রয়োজনীয়তা বেশিই ছিল। কিন্তু হঠাৎ কী হলো- পুলিশ কেন নিরাপত্তার দায়িত্ব নিচ্ছে না বলে পূজাকমিটিগুলো প্রচার করছে। এর কারণে ভয়াবহ কিছু ঘটে গেলে প্রশাসন তো দায় এড়াতে পারবে না। যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা, নাশকতা যে ঘটবে না-এটার নিশ্চয়তা তো দেয়া যায় না।

পূজা যেহেতু হচ্ছে- সেখানে নিরাপত্তার বিষয়টি যেমন স্পর্শকাতর, তেমনি পূজার আড়ম্বর একটি মারাত্মক সঙ্কট তৈরি করতে পারে গোটা দেশে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে শারদীয় পূজায় রাতে প্রতিমাদর্শনের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ একান্ত জরুরি।

করোনার সবচেয়ে আতঙ্কজনক সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বড় বড় ধর্মীয় সমাবেশ নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়েছিল। যেখান থেকে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল বলে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়। ধর্মীয় আবেগের কারণে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যবিধি না মানায় শেষ পর্যন্ত তারা দেশ ও জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছিল।

সৌদি আরবের মত দেশে হজ্বব্রত পালনও থমকে পড়েছিল। সব ভেবেই শারদীয় দুর্গাপূজা মানে মানে সেরেই ফেলাই উত্তম। যারা দর্শনার্থি তাদের জন্যও এই বার্তা। আর যাই হোক রাতে ঘুরে ঘুরে প্রতিমা দর্শনের আশায় যেন বাধ দেয়া হয়।

সুরেশ কুমার দাশ : সাংবাদিক