শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

ধর্ষিতাকে ধর্ষকের হুমকি, একুশে পত্রিকাকে ‘ম্যাটার ক্লোজ’ এর প্রস্তাব!

প্রকাশিতঃ বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০২০, ৯:২৫ অপরাহ্ণ

জোবায়েদ ইবনে শাহাদত : সাম্প্রতিক সময়ে  একের পর এক ধর্ষণের ঘটনায় উত্তাল ছিল পুরো দেশ। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে ফেটে পড়েছিল দেশের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ। মৃত্যুদণ্ডের বিধান অনুমোদন হয়েছে মন্ত্রীসভায়। ধর্ষণ বন্ধ করার জন্য এতো চেষ্টা ও আইন প্রণয়নের পরও থেমে নেই ধর্ষণ।

সম্প্রতি একজন এনজিও ম্যানেজার কর্তৃক ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে রাঙ্গুনিয়ায়। ঘটনার ২৫ দিন পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ধর্ষককে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।  উল্টো ধর্ষক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো এলাকা। অভিযোগ উঠেছে, জনপ্রতিনিধি ও থানা পুলিশের আশ্রয়ে ভিকটিমকে হুমকিও দিচ্ছে ধর্ষক।

জানা যায়,  ‘আশার আলাে’ এনজিওর রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইছাখালী শাখার ম্যানেজার দেলােয়ার (২৭) এর কাছে দুই বছর আগে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন ভিকটিমের মা। কিস্তির টাকা আদায়ের বাহানায় দেলােয়ার গত ১১ অক্টোবর রাত ৯ টায় ভিকটিমের ঘরে আসে এবং ভয়-ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক ঋণগ্রহীতার কিশোরী কন্যাকে ধর্ষণ করে পালিয়ে যায়।

পরদিন ধর্ষিতা কিশোরীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হলে তাকে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়। পরীক্ষায় কর্তব্যরত চিকিৎসক ধর্ষণের আলামত পান।

এ ঘটনায় ধর্ষিতার মা বাদী হয়ে গত ১৩ অক্টোবর রাঙ্গুনিয়া মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩) এর ৯ (১) ধারায় ধর্ষক দেলােয়ারের বিরুদ্ধে মামলা (মামলা নং-১৭) দায়ের করেন।

এদিকে, ঘটনার ২৫ দিন অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত ধর্ষককে গ্রেফতার করতে পারেনি রাঙ্গুনিয়া থানা পুলিশ।ধর্ষকের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়ে কখনো থানায়, কখনো সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন ধর্ষিতার মা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মামলা দায়েরের পর দেলােয়ার তার সহযোগীদের (বখতেয়ার, মাে. ইসমাইল, আইয়ুব খান, দিলু আক্তার) দিয়ে বাদিকে মামলা তুলে নিতে উপর্যুপরি হুমকি দিতে থাকে। একপর্যায়ে গত ২০ অক্টোবর দেলোয়ার ও তার সহযোগীরা রাঙ্গুনিয়ার গােডাউন এলাকায় বাদি ও তার ভুক্তভোগী মেয়েকে জোরপূর্বক সিএনজিতে তুলে নিয়ে অপহরণ করার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বাদির অভিযোগ, মরিয়মনগর ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মাে. ইসমাইল তাকে ও ভিকটিমকে ঘটনার বিষয়ে মীমাংসা করার আশ্বাস দিয়ে ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক তাদের কাছ থেকে ননজুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আদায় করেছেন। মামলা প্রত্যাহার না করায় বর্তমানে স্ট্যাম্পকে গুরুত্বপূর্ণ দলিলে রূপান্তরিত করে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির হুমকি দিচ্ছে ধর্ষক দেলোয়ার ও তার সহযোগী ইসমাইল মেম্বার।

ধর্ষক ও তার সহযোগীর হুমকির বিষয়ে রাঙ্গুনিয়া থানায় অবহিত করলেও থানা কর্তৃপক্ষ কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ করেছেন ধর্ষিতার মা।

এ ব্যাপারে প্রতিকার চেয়ে গত ২৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি দরখাস্ত করেন তিনি।

ভিকটিমের মা জানান, ঘটনার আগেও তিন মাস আগে দেলােয়ার কিস্তির টাকা নিতে এসে ঘরে একা পেয়ে আমার মেয়েকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করে। আমি বাসায় চলে এলে দেলোয়ার কাউকে কিছু না জানানোর ভয় দেখিয়ে চলে যায়। পরে স্থানীয় মেম্বারকে নালিশ করেও এ ব্যাপারে কোনও প্রতিকার পাননি। বরং আশকারা পাওয়ায় ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটানোর সাহস পায় সে।

তবে ধর্ষক দেলোয়ারকে আশকারা দেওয়া বা এই ধরনের কোনো ঘটনায় সহযোগিতা করেননি বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত মরিয়মনগর ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. ইসমাইল। তার দাবি,  ভিকটিমের মা তাকে ধর্ষণের ঘটনা জানিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করলে সামাজিক দিক বিবেচনা করে ধর্ষকের সাথে ভিকটিমের বিয়ের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

মরিয়মনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মুজিবুল হক বলেন, ‘এই ঘটনা জানার পর আমি ভিকটিমদের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়েছি। ঘটনা তদন্ত করে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে আমি অনুরোধ জানাচ্ছি।’

এদিকে, একুশে পত্রিকার তৎপরতার বিষয়ে জানতে পেরে ধর্ষকের চাচাতো ভাই দিদার প্রতিবেদককে বিভিন্নভাবে সমঝোতার অনুরোধ করেন। সরাসরি দেখা করে ‘ম্যাটার ক্লোজ’ করার প্রস্তাবও দেন তিনি।

জানতে চাইলে রাঙ্গুনিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মাহবুব মিলকী একুশে পত্রিকাকে বলেন, এই মামলাটি নিয়ে আমরা খুবই সতর্ক ও তৎপর আছি। আমরা প্রতিনিয়ত আসামিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা আসামি দেলোয়ারকে আইনের আওতায় আনতে পারবো বলে আশা করছি।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এসএম রাশিদুল হক একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মামলাটির তদন্ত ও অগ্রগতির বিষয়ে আমি এখনই খবর নিচ্ছি। আপনাদের মাধ্যমে ভিকটিম ও তার পরিবারকে আশ্বস্থ করছি যে, অতি শীঘ্রই এর সুরাহা হবে। আমি নিজে বিষয়টি তদারকি করবো।’