শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

অনিয়ম-দুর্নীতিতে অভিযুক্তরা করবেন দুর্নীতি প্রতিরোধ!

প্রকাশিতঃ বুধবার, নভেম্বর ১৮, ২০২০, ৭:৫৫ অপরাহ্ণ

শরীফুল রুকন : অনিয়ম-দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহযোগী সংস্থা চট্টগ্রাম মহানগর দুর্নীতি-প্রতিরোধ কমিটিতে স্থান পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রাম মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইন্ট্রাকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মনোয়ারা হাকিম আলী। অথচ ইন্ট্রাকো গ্রুপের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতিতে যুক্ত থাকার বেশকিছু অভিযোগ আছে।

২০১৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির মধ্যে ছিল ইন্ট্রাকো গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইন্ট্রাকো সিএনজি; এর মালিকানায় আছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মনোয়ারা হাকিম আলী ও তার স্বামী এম এম হাকিম আলী।

অথচ দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির গঠনতন্ত্র ও কার্য-নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ঋণখেলাপি হলে কেউ দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটিতে সদস্য হতে পারবেন না। ফৌজধারী অপরাধে অভিযুক্ত হলে, সততা ও সুনামের অধিকারী না হলে তিনিও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটিতে স্থান পাবেন না।’

এদিকে ইন্ট্রাকো সিএনজির কাছ থেকে ১৯ কোটি টাকা পাওনা আছে খেলাপি ঋণের কারণে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে না পারায় অবসায়ন (লিকুইডেশন) প্রক্রিয়ায় থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড। জালিয়াতি করে পিপলস লিজিং থেকে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করে প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত করছে দুদক।

ইন্ট্রাকো গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে বিমা আইন অনুসারে সরকারি বন্ড ও অনান্য সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ সংক্রান্ত নির্দেশনা না মানার অভিযোগ আছে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে।

এদিকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো থেকে গ্যাস নিলে স্বাভাবিকভাবে সাথে সাথে বিল পরিশোধ করতে হয়। গ্রাহকের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক টাকা নিলেও ইন্ট্রাকো গ্রুপের সিএনজি স্টেশনগুলো কর্ণফুলী গ্যাস ও তিতাস গ্যাস কোম্পানীকে নিয়মিত বিল পরিশোধ করে না বলে অভিযোগ আছে। ২১ কোটি টাকা বকেয়া বিল থাকায় ২০১৮ সালে চট্টগ্রামে ইন্ট্রাকো গ্রুপের তিনটি সিএনজি স্টেশনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইন্ট্রাকোর সিএনজি স্টেশনগুলো থেকে ২ কোটি ২০ লাখ টাকা পাওনা ছিল তিতাস গ্যাস।

এছাড়া হালনাগাদ লাইসেন্স, বিস্ফোরক পরিদপ্তরের অনাপত্তি কিংবা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) অনুমোদন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে ইন্ট্রাকো সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন। আরপিজিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (সিএনজি) মহম্মদ আলী বিশ্বাসের বরাত দিয়ে গত ৫ অক্টোবর এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে একটি জাতীয় দৈনিক।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানার জন্য চট্টগ্রাম মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও ইন্ট্রাকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মনোয়ারা হাকিম আলীর গ্রামীণ নাম্বারটিতে আজ যোগাযোগ করা হলে সেটি আর ব্যবহৃত হচ্ছে না বলে জানানো হয়। পরে তার স্বামী ইন্ট্রাকো গ্রুপের চেয়ারম্যান এইচএম হাকিম আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির বিষয়ে বক্তব্য জানতে মনোয়ারা হাকিম আলীর নাম্বার চাইলে এইচএম হাকিম আলী বলেন, ‘আমাকে ফোন করেছেন কেন? মনোয়ারা হাকিম তো সেপারেট।’ আপনি মনোয়ারা হাকিম আলীর স্বামী, সেজন্য জানতে চাওয়া- বলার পর হাকিম আলী বলেন, ‘উনার স্বামী আমি, এটা ঠিক আছে। উনার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’ বলেই সংযোগ কেটে দেন তিনি।

এদিকে ওয়েল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম কমুকে চট্টগ্রাম মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। প্রায় ১০ বছর সিডিএ চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করা আবদুচ ছালামের ছোট ভাই তিনি। আবদুচ ছালামের দায়িত্ব পালনকালে সিডিএ’র বিভিন্ন প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগ, প্লট বরাদ্দ, জমি অধিগ্রহণে একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।

গত ১০ বছরে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে বলে দাবি করেন বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ইন্দু নন্দন দত্ত। তিনি সিডিএ’র বিদায়ী চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম ও তার স্বজনদের ব্যাংক একাউন্ট যাচাইয়েরও আহ্বান জানান। ২০১৯ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে ‘চট্টগ্রাম নাগরিক উদ্যোগ’ আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশে অংশ নিয়ে ১৪ দলীয় জোটের নেতা ইন্দু নন্দন দত্ত এ দাবি জানান।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও ওয়েল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম কমু একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘এই পদে কে থাকবেন সেটা তো সরকার নির্ধারণ করে, এখানে আমার হাত নেই। আমাকে প্রথমে তিন বছরের জন্য (দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদে) দিয়েছে, এখন আবার তিন বছরের জন্য দিয়েছে। বছরখানেক আগে সর্বশেষ কমিটি অনুমোদিত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সিডিএ’র সাথে আমার কিসের সম্পর্ক। আমাদেরটা হচ্ছে প্রতিরোধ কমিটি। আমাদের কাজ হচ্ছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমাজে সচেতন করা। এটার সাথে দুদকের কাজের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা দুর্নীতি দমনের কোনো কাজ করি না।’

সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম কমু বলেন, ‘নীতিমালায় কী আছে আমি জানি না। যেহেতু আমি নিজে থেকে আবেদন করিনি। নীতিমালায় কী আছে সেটা দেখা উচিত। আমি যতটুকু জানি, সমাজের আলোকিত মানুষদেরকে নিয়ে প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হবে। দেখতে হবে, সমাজের আলোকিত মানুষ কিনা। আমি যদি সমাজের আলোকিত মানুষ না হই আমি কেন ওই কমিটিতে থাকবো। সরকারই আমাকে বানাবে কেন? আমরা তো কেউ নিজে সেখানে যাইনি। সরকারই সিলেক্ট করে দিয়েছে। সেখানে নিজে যাওয়ার তো কোনও সুযোগ নেই।’

‘আমার মনে হচ্ছে, কোথাও ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। কারণ আমাদেরকে কমিটিতে রাখার সময় সব গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট নেওয়া হয়েছে। বাকিটা সরকার কেন করেছে, সেটা সরকার জানবে। মনোয়ারা হাকিম আলী যদি নীতিমালায় না আসে, আসবে না। আমি যদি নীতিমালায় না আসি তাহলে আমিও আসবো না। সমস্যা তো নেই।’ যোগ করেন চট্টগ্রাম মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও ওয়েল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম কমু।

দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির গঠনতন্ত্র ও কার্য-নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সরকারি বেতনভুক্ত কর্মচারীরা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটিতে থাকতে পারবেন না।’ দুদকের ওয়েবসাইটে ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সর্বশষ হালনাগাদ করা অংশে যে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট চট্টগ্রাম মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেখানে সহ সভাপতি পদে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতারের নাম আছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ রুহুল আমিনের নাম সেখানে সদস্য হিসেবে উল্লেখ আছে।

তবে চট্টগ্রাম মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম কমু একুশে পত্রিকাকে জানান, বছরখানেক আগে নতুন করে গঠন করা মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি থেকে ভিসি অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার ও অধ্যাপক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বাদ পড়েছেন।

চট্টগ্রাম মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটিতে সদস্য হিসেবে স্থান পেয়েছেন পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা কল্যাণ সমিতির সেক্রেটারি আবু সাঈদ সেলিমও। ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট পাঁচলাইশ থানায় ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদের চারবছর পূর্তি উপলক্ষে ওয়েল গ্রুপের মালিকানাধীন ওয়েল পার্ক হোটেলে কেককাটা ও নাচ-গানের আয়োজনে কয়েক লাখ টাকা খরচ করেন আবু সাঈদ সেলিম। বিষয়টি তখন গণমাধ্যমের কাছে তিনি স্বীকার করেন। শোকের মাসে এ ধরনের আনন্দ আয়োজন করায় তখন পুলিশ ও সাধারণের মাঝে আলোচনা-সমালোচনা হয়।

এদিকে চট্টগ্রাম মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটিতে থাকা ১৩ জনের মধ্যে ৭ জন ব্যবসায়ী, চারজন শিক্ষাবিদ, একজন ক্রীড়াসংগঠক ও একজন সাংস্কৃতিক সংগঠক। কমিটিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা কেউ নেই। কমিটির ৫০ শতাংশ সদস্যের বয়স ৫০ বছরের বেশি হতে পারবে না বলে নীতিমালায় থাকলেও সেটা মানা হয়নি বলে অভিযোগ আছে।

দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণসচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে দুদক। এরই ধারাবাহিকতায় সারাদেশে মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়। কাউকে কমিটির সদস্য করতে হলে তার বিষয়ে পুলিশের মাধ্যমে গোপনীয়ভাবে যাছাই করার বিধান আছে। বিতর্কিতরা কীভাবে কমিটিতে স্থান পেয়েছেন সেটা আমি জানি না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদেরকেই যদি নিয়ম-নীতি ভঙ্গ করে কমিটিতে নেওয়া হয়, তাহলে তারা কী দুর্নীতি প্রতিরোধ করবেন? বিধি অনুযায়ী যাদের কমিটিতে থাকাটা অ্যালাউ করে না, তাদের উচিত সসম্মানে বেরিয়ে যাওয়া।’

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে দুদক চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক মাহমুদ হাসান এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১ এর উপ-পরিচালক লুৎফুল কবির চন্দনের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতিসহ বিভিন্ন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে দুদক উপ-পরিচালক লুৎফুল কবির চন্দন একুশে পত্রিকাকে বলেন, ‘মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির মেয়াদ শেষ। নতুন করে কমিটি গঠন করা হবে।’

যদিও মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম কমু একুশে পত্রিকাকে জানিয়েছেন তিন বছর মেয়াদী নতুন কমিটি গঠিত হয়েছে বছরখানেক আগে। এছাড়া দুদকের ওয়েবসাইটে ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সর্বশষ হালনাগাদ করা অংশে তিন বছরের জন্য ১৩ সদস্য বিশিষ্ট চট্টগ্রাম মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ঋণ খেলাপি হওয়ার পরও চট্টগ্রাম মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি পদে মনোয়ারা হাকিম আলীর স্থান পাওয়া প্রসঙ্গে দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-১ এর উপ-পরিচালক লুৎফুল কবির চন্দন বলেন, ‘এটা তো আমি জানি না।’

‘নতুন কমিটির সদস্যদের বিষয়ে ঢাকা (দুদক প্রধান কার্যালয়) থেকে যাছাই করা হবে, এ বিষয়ে তারাই বলতে পারবেন। নিশ্চয় ঢাকা ভেরিফাই করে ফাইনাল করবে। এ বিষয়ে আমাদের করার কিছু থাকে না।’ বলেন দুদক কর্মকর্তা লুৎফুল কবির চন্দন।